অপার্থিব কিংবা অতিপ্রাকৃতঃ

তৌহিদুল ইসলাম ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার, ১১:০৩:৪২অপরাহ্ন গল্প ১৮ মন্তব্য

পৌষ মাসের তীব্র শীত ছিল সেদিন। কুয়াশায় ঢাকা চারিদিক, আবছা ধোঁয়া ধোঁয়া। বাঁশ বাগানের পাশে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম আমি আর বড় খালা। আমার এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ, ক’দিন পরে ইউনিভার্সিটি ভর্তি কোচিং শুরু করতে ঢাকায় যাব; তার আগে নানা নানিকে দেখতে বেড়াতে গিয়েছি গ্রামে। দু’তিন দিন থেকেই চলে আসবো এমন পরিকল্পনা নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু অতিপ্রাকৃত নাকি অপার্থিব ! এমন এক ঘটনাই সেদিন আমাকে আটকে দিয়েছিল পুরো সাত দিনের জন্য।

এই ঘটনার সূত্রপাত আজ থেকে প্রায় ঊনিশ বছর আগে। আমি আর খালা হাঁটছিলাম সেদিন সকালে, পরিকল্পনা ছিল আসার পথে গরম ভাপা পিঠা খাব। খালা বললেন যার বাসায় ভাঁপা বানায় সম্পর্কে তিনি খালার চাচী মানে আমার নানী হন। খালার ইচ্ছে ছিল নানির বাসায় বসেই গরম ভাপা পিঠা খাবেন। দু’জনের কথার মাঝখানে আমার মাথায় হঠাৎ করেই দুই তিন ফোঁটা শিশির গাছের পাতা থেকে টুপ করে ঝরে পড়ল, শরীরে যেন কাঁটা দিয়ে উঠলো প্রচন্ড ঠান্ডায়।

নানির বাসায় গেলাম দেখি তিনি চুলার পাশে বসে আছেন, ভাঁপা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার চারপাশে পিঠা বানানোর সরঞ্জাম- আটা, নারকোলের মালাই, গুড় সহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র।

নানি আসসালামু আলাইকুম। তিনি মৃদু হেসে আমার সালামের উত্তর দিলেন।
কিরে কত বড় হয়েছিস, এত দিন পর নানীরে মনে পড়ল?
চাচী পাঁচটা ভাপা বেশি করে গুড় দিয়ে বানিয়ে দিন তো -খালা বললেন।
নানা কই? জানতে চাইলাম।
উনি বললেন- তোর নানাকে আবারো দেও ভর করেছে গত রাত থেকে। গ্রামে জ্বীনে ধরাকে দেও ধরা বলে।
খালা বলল – আবার ?
হুম – নানী উত্তর দিলেন। এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন এবার যে কত দিন লাগে আল্লাহ জানেন।
আমি বললাম কত দিন লাগে মানে?
খালা আমাকে বললেন – যে জ্বীন নানার শরীরে ভর করে সে নিজে থেকেই দু-তিন দিন পর চলে যায়।

এটা শুনে আমার কেমন ভয় ভয় অনুভূত হলো। ধুর! এসব আজগুবি কথা। গ্রামের মানুষ একটু রংচঙ করে এসব বলে, এমনটা ভেবে আমি হেসে উড়িয়ে দিলাম। কিন্তু ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারিনি এই অবিশ্বাসের হাসিটাই দু’দিন পরে এক চরম ভয়ের অনুভুতি নিয়ে আসবে আমার জীবনে। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে বাস করেও অপার্থিব, অমিমাংসিত বলে যে কিছু আছে এবং আমাকে তা বিশ্বাস করতে হবে তা সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম।

আমরা চলে আসলাম পিঠা নিয়ে। ততক্ষনে চারপাশের মানুষজন দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের সেই নানির বাসা থেকে বের হতে দেখে কেউ কেউ খালাকে জিজ্ঞেস করলো নানার অবস্থা, ছোট বাচ্চারা নাকি ভয়ে সেদিকে যাচ্ছে না।

আমার নানা আলেম মানুষ, মসজীদের ইমাম। তার কাছে জানতে চাইতেই তিনি বললেন জ্বীনেরা মাঝেমধ্যেই পৃথিবীর কিছু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে যাকে ভর করা বলে। অনেকের ক্ষতি করে অনেকের উপকার করে। দোয়া দরুদ বা কিছু তদবিরের কথা বললেন যেগুলো করলে নাকি খারাপ জ্বীনেরা কিছু করতে পারে না। আমি অনেক কিছু বুঝলাম আবার বুঝলাম না। মনে মনে ভয় পেলাম প্রচন্ড, এমনও কি সম্ভব?

তার তিনদিন পর এক বিকেলে খালা আমাকে বললেন, চল জ্বীনে ভর করা দেখতে যাব।
কি! আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। আমাদেরও যদি ধরে?
ধুর! ভয় পাস না, চল যাই – খালা বললেন।

দুজনে আবার গেলাম সেই নানির বাসায়; দেখি একটা ঘরে কিছু মানুষজনের জটলা। আমরাও ঢুকলাম সেই ঘরে। চৌকির উপর নানা বসে রয়েছেন।

খালা সালাম দিলেন – শুভ্র দাড়ি, মাথায় টুপি ফতুয়া আর লুঙ্গি পরনে। খালার দিকে তাকিয়ে সালামের উত্তর দিলেন। আমাকে বললেন – কিরে নাতি আমাকে দেখে এত ভয় পাচ্ছিস কেন?
আমি আবার অবাক হলাম। মনে মনে ভাবলাম, তিনি কি করে জানলেন আমি ভয় পাচ্ছি? কিছু বললাম না, আসলেই আমি ভয় পেয়েছিলাম সেদিন খুব।

এই তোমরা সবাই বাইরে যাও, নানা হঠাৎ বলে উঠলেন। শুধু আমার নাতি আর ভাতিজি মানে আমাকে আর খালাকে থাকতে বলে বাকি সবাইকে ঘরের বাইরে যেতে বললেন।

নানীও নানার পাশে আছেন। তিনি হেসে আমাকে বললেন – ভয় পাসনা। তোর নানার এসব ঘটনা বহু বছর আগ থেকেই দেখছি, আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে নাতি ভাই ।

খালা বললেন- তেনারা বেয়াদবি একদম পছন্দ করেননা। কিছু জিজ্ঞেস করলে সুন্দরভাবে উত্তর দিবি।
খালাকে বললাম – তুমি এতকিছু জানো কিভাবে?
খালা বললেন, আমি কার মেয়ে তুই জানিসনা? হুম হুজুরের বেটি, বলেই মুচকি হাসলাম।

কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ নানার হাত পা কাঁপা শুরু হলো। সে কি কাঁপা! কি আর বলবো, চৌকিতে থপ্ থপ্ করে শব্দ করে কাঁপছে। দুই হাত দিয়ে চৌকিতে বারি মারার শব্দ হচ্ছে। নানী নানার গায়ে একটা সাদা চাদর জড়িয়ে দিলেন, মাথাটাও ঢেকে দিলেন। এদিকে আমার বুক ধড়পড় শুরু করে দিয়েছে।

আ স সা লা মু আ লা ই কু ম
আ স সা লা মু আ লা ই কু ম – নানা বলে উঠলেন।
খালা সালামের উত্তর দিলেন। বুঝলাম নানার শরীরে জ্বীন ভর করেছে।

খালা আমাকে বললেন, জ্বীন নানার মাধ্যমে আমাদের সাথে কথা বলছে। আমি অনুভব করছি চারিদিকে এক নিস্তব্ধ নীরবতা। একটু আগেও কিচিরমিচির শব্দ পাচ্ছিলাম যে পাখিদের, তাদের কলকাকলি যেন থেমে গেছে। গাছের পাতাগুলোও বাতাসে আর কাঁপছেনা। সে সময় এক অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে ছেয়ে ধরেছে, সেটা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব।

আপনারা কেমন আছেন নানা বললেন?
জ্বী আমরা ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন? – খালা জিজ্ঞেস করলেন।
তিনি বললেন- আলহামদুলিল্লাহ। তার মাথা নীচু হয়ে আছে, একটু করে দুলছেন। পুরো শরীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত চাদর দিয়ে ঢাকা।

নানি কে বললেন মা আপনার খুব অসুবিধা হয় আমি বুঝি, কিন্তু কি করবো; আপনার স্বামীর শরীরে আমি মাঝে মধ্যেই আসি। তিনি কামেল মানুষ আর দশজনের মত সাধারন নন, আমরা অনেকেই তার কাছে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত শুনতে আসি।

এখন কতজন এসেছেন? -খালা বললেন। আপনাদের পাশে আরও ছয় জন বসে আছেন। আমরা সাধারণত মানুষের সামনে আসিনা, সেদিন সকালে আপনারা যখন এসেছিলেন তখনও আমরা ছিলাম। আপনারা ভালো মনের মানুষ। কিন্তু ইনি সেদিন আমার দিকে ইশারা করে বললেন- ইনি আমাদের কথা বিশ্বাস করেননি, তাই আসলাম।

আমার হাত পা কাঁপছে, বুকের মধ্যে যেন কেউ ড্রাম বাজাচ্ছে। বিশ্বাস করতে পারছিনা আমার পাশে অশরীরী জ্বীনেরা বসে আছে!

বাবাজি ভয় পেয়েছেন নাকি? ভয় পাবেন না, আপনার কোন ক্ষতি হবেনা। আমরাও আল্লাহর সৃষ্টি। আপনার তো পরীক্ষা শেষ হলো, ফল ভালো হবে ইনশাল্লাহ! চিন্তা করবেন না।
আমি অবাক হলাম, পরীক্ষার কথা সে জানলো কেমন করে?

সে আবার বললো- আপনার ছোট ভাইয়ের একটা বড় অসুখ আছে, দূর দেশে তার চিকিৎসা হবে। ভালো হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ! চিন্তা করবেন না।
খালাকে বললেন- মাগো বেশি করে নামাজ পড়বেন, আপনাকে যে যেতে হবে!
খালা বললেন- কোথায়? এর কোন উত্তর দিলেন না তিনি।

খালা আবার জিজ্ঞেস করলেন আমার ছোট ভাইয়ের কথা, কি অসুখ ভালো কি মন্দ। আবার সব চুপচাপ, এ কথাটারও আর কোন উত্তর দিলেন না।

হঠাৎ আবার আমাকে বললেন – বাবাজি আপনি আগুন, পানি এ দুটো জিনিস থেকে সাবধান থাকবেন ; তাহলে সারা জীবন ভালো থাকবেন ইনশাআল্লাহ। আপনার মাথা বেশি গরম ; রাগ বেশি তাই বেশি করে নামাজ পড়বেন। আমি সেদিন কিছু না বুঝলেও পরে জেনেছি আগুন আর পানি বলতে তিনি কি বুঝিয়েছেন?

খালা বললেন আমাদের একটু দোয়া করে দেন। তিনি চুপচাপ বসেই আছেন। একটু পরে বললেন করেছি। তবে আপনারা এমন এক পরিবারের সন্তান ; তিনি আল্লাহর অনেক প্রিয় বান্দা, তার দিকে খেয়াল রাখবেন।
আমি বললাম – কে তিনি? আবার চুপচাপ। একটু পর বললেন – আপনার নানা।

আমার স্বামীকে ছেড়ে দিলে হয়না? – নানী বললেন। আবার চুপচাপ। মাঝেমধ্যে এই চুপচাপ থাকাটা এক অসহ্য নীরবতার মত মনে হচ্ছে।
একটু পর বললেন – আমারও তো দু’শত বছর বয়স পার হয়ে গেল, আর বেশি দিন হয়তো নাই।

চৌকিতে হঠাৎ আবার থপ্ থপ্ শব্দ হচ্ছে, হাত দিয়ে মানুষটা শব্দ করছে।
আচ্ছা আসি, নামাজের সময় যে হয়ে এলো!

আমি হাত ঘড়িতে তাকালাম, প্রায় এক ঘণ্টার মতো পার হয়ে গিয়েছে এর মধ্যে। তিনি আবার বললেন, বাবাজি আপনি কাল বাড়িতে যেতে পারবেন না। মাছ ধরার সময় সাবধানে থাকবেন, বাসায় পরশু যাবেন ইনশাল্লাহ। আমার আমার জন্য দোয়া করবেন।
আসসালামুআলাইকুম – বলে আমি সালাম দিলাম। তিনি থেমে থেমে উত্তর দিলেন – ও য়া লা ই কু ম আ স সা লা ম ও য়া রা হ মা তু ল্লা হ।

সালামের উত্তর দেয়ার সাথে সাথে নানা বসা অবস্থা থেকে পিছনে বালিশে ধপ করে শুয়ে পড়লেন। মনে হল কেউ যেন তাকে ধাক্কা দিয়ে শুইয়ে দিল। নানী তার শরীর থেকে চাদরটা সরিয়ে দিলেন। দেখলাম নানার পুরো শরীর ঘামে ভিজে জপ জপ করছে, জোরে শ্বাস নিচ্ছেন। নানি পানির গেলাস তার মুখে এগিয়ে দিলেন। পুরোটাই ঢকঢক করে খেয়ে নিলেন তিনি।

আমার ভয় তখনো কাটেনি, যেনো এক ঘোরের মধ্যে আছি। আমি কি বাস্তবে আছি নাকি অন্যকোথাও তাই ভাবছি।

নানী সাদা চাদর কেন? একথা জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন- প্রথম যেদিন তোর নানার শরীরের জ্বীন ভর করেছিল সেদিনই তাকে বলেছে, তারা যখন আসবে পরিষ্কার সাদা চাদর দিয়ে যেন শরীর ঢেকে দেওয়া হয়। যারা আসেন তারা পবিত্র, পর্দানশীন।

আপনার ভয় করে না?
নারে নাতি, আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
খালাকে একটু চিন্তিত দেখলাম, আমাকে বললেন চল যাই। চাচী আসি, বাসায় আইসো পরে।

আমরা চলে আসার পথে খালাকে বললাম, কি তুমিও ভয় পেয়েছ নাকি আমার মত?
খালা বললেন – আজকের এসব কোনকিছু তোর মাকে বা বাসার কাউকে বলিস না। আমি বললাম -কেন?
আর কিছু বললেন না তিনি, গোটা রাস্তায় চুপচাপ ছিলেন সেদিন। আমিও কথা বাড়ালাম না। বুঝতে পারছিলাম খালার মনে এখন নানান প্রশ্নের খেলা চলছে, যার উত্তর তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।

পরের দিন আমি চলে আসবো। আমাদের বাসায় মাছ পাঠাবে বলে সকালে নাস্তার পরে মামা গিয়েছে পুকুরে মাছ ধরতে, সাথে আমিও আছি। গত রাতে ভাল ঘুম হয়নি। সেই নানার বাসা থেকে আসার পরে আমিও চুপচাপ হয়ে গিয়েছি। মনের ভয় তখনো কাটেনি, পুরো রাত কাটা কাটা ঘুম হয়েছে। তাই ভাবলাম পুকুরপাড়ে গেলে হয়তো ভালো লাগবে। গতকালের কথা ভাবছি আনমনে।

হঠাৎ মামা উহ্ শব্দ করে উঠলেন। তাকিয়ে দেখি পা দিয়ে রক্ত ঝরছে।
বললাম কি হয়েছে? সাঁপে কামড়েছে, দৌড়ে গিয়ে বাসা থেকে দড়ি নিয়ে আয় বলেই মামা মাটিতে বসে পড়লেন।
আমি চিৎকার করতে করতে বাসায় এলাম। দড়ি দাও! দড়ি দাও! মামাকে সাঁপে কামড়েছে।
বাসার পাশেই পুকুরঘাট, মামী দড়ি নিয়ে দৌড় দিলেন সেদিকে। গিয়েই তিনি মামার পায়ে হাঁটুর নিচের মাংসপেশীতে দড়ি বেঁধে দিলেন যাতে বিষ শরীরের উপরে উঠতে না পারে। সবাই ধরাধরি করে মামাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। গ্রাম্য ডাক্তার এসে সেই জায়গা ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে ওষুধ দিলেন। বললেন, পানির সাপ বিষ নেই আল্লাহ বাঁচিয়েছেন।

সেদিনের এই অবস্থায় আর আমার বাসায় ফেরা হলো না। নানী বললেন, বাবা আজ থেকে যা। আমার হঠাৎ গতকালের কথা খেয়াল হলো। নানার শরীরে ভরা সেই জ্বীন বলেছিল, আজ বাসায় যেতে পারবো না। মাছ ধরার সময় সাবধানে থাকতে বলেছিলেন আমাকে!!

পরদিন আমি বাসায় চলে আসলাম। সেদিনের ঘটনা আবছামত ভুলতে বসেছিলাম। এরপরে যেদিন আমার পরীক্ষার ফল দিবে সেদিন টেনশনে অস্থির হয়ে উঠলাম। তখন সে নানার কথা মনে পড়লো। তিনিতো বলেছিলেন ফল ভালো হবে! মনে একটু আশার সঞ্চার হলো। আমার পরীক্ষার ফল অসম্ভব ভালো হয়েছিলো সত্যি সত্যিই। তাহলেকি জ্বীনেরা আগে থেকেই সব জানে? হবে হয়তো!

এর তিন বছর পর সত্যি সত্যি আমার ছোট ভাইয়ের হার্টে ফুটো ধরা পড়েছিল, ইন্ডিয়াতে অপারেশন করা হয়েছিল। এখন ভালো আছে ও। যেদিন অপারেশন হয় সেদিনও আমার জ্বীনে ভর করা সেই নানার কথা কথা মনে হয়েছিলো। আমার ছোট ভাইয়ের অসুখ নিয়ে বলা তার কথাগুলো আমি আম্মাকে বললাম। আম্মা বললেন আমাকে আগে বলিস নি কেন? আমি বললাম ভয়ে!

তারও সাত বছর পর আমার বড় খালা যাকে সাথে নিয়ে জ্বীনে ভর করা দেখতে গিয়েছিলাম, তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। তার জানাজার নামাজ শেষে বাসায় ফিরে এসে আমার আবারো সেই দিনের কথা মনে হয়েছিলো। তিনি খালাকে বলেছিলেন আপনার তো যাবার সময় হয়েছে মা!! কি আশ্চর্য খালা চলেই গেলেন শেষ পর্যন্ত! অথচ আমার মায়ের বাকী সব ছোট ভাই বোন সবাই এখনও আল্লাহর রহমতে সুস্থ আছেন।

একদিন আমার মৌলভী নানাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সেই দিনের বিষয়ে। নানা মুচকি হাসি দিয়ে বলেছিলেন, দুনিয়াতে আল্লাহর নিদর্শন তিনি অনেক ভাবেই আমাদের দেখান হেতায়াতের জন্য, কিন্তু আমরা সাধারন মানুষ তার কতটুকুই বা বুঝি! এসব ঘটনাকে আমরা অপার্থিব বলে হেসে উড়িয়ে দিই।
কিন্তু আগুন আর পানি? তিনি বললেন শোন- আগুন হচ্ছে মেয়েমানুষ আর পানি হচ্ছে নেশা। সারা জীবনে দুটো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখিস।

আমি আজও ভাবি সেদিনের কথা। জ্বীনে ভর করা সেই নানা মারা গিয়েছেন অনেক আগেই। আমার নানার বাসায় গেলেই লোকমুখে শুনতাম, সে জ্বীনে ভর করা নানা একাই দশজনের কাজ করতে পারতেন। এক বিঘা জমিতে মাত্র একদিনেই তিনি একা ধানগাছ রোপন করতেন, যেখানে পাঁচজন মানুষের সময় লাগে দুইদিন। সবাই বলে জ্বীনেরা তার কাযে সাহায্য করতো! না হলে একা এসব করা অসম্ভব।

পৃথিবীতে কিছু ঘটনা ঘটে যেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা মানুষের কাছে নেই। প্রকৃতির রহস্যময় এসব খেলাকে আমরা অপার্থিব বলে আখ্যা দিয়েছি। আমরা মানুষেরা চাইলেও সে সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা। মনে দাগ কেটে যায়, শরীর হিম হয়ে যায়। তবুও আমরা বেঁচে থাকি, বাঁচার চেষ্টা করি। নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া সেই দিনের এসব কথা মনে হলে আমার মনে সেই শব্দটি এখনো বারবার বাজে থপ্ থপ্ থপ্………।

৬৫৯জন ৬৫৮জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ