অপারেশন সার্চলাইট, ২৫শে মার্চের কালরাত্রি।

ইঞ্জা ২৫ মার্চ ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১০:৫৬:৩৯অপরাহ্ন ইতিহাস ১৭ মন্তব্য

বাঙালির ওপর ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের ঐ নিধনযজ্ঞের পরিকল্পনা হয়েছিল একাত্তরের মার্চের শুরুতেই, জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাড়ি পাকিস্তানের লারকানায়৷

শিকারের নামে এই গণহত্যার ষড়যন্ত্রে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টো, জেনারেল ইয়াহিয়া এবং জেনারেল হামিদ অন্যতম৷ তাঁরা মনে করেছিলেন, ২০ হাজার মানুষ হত্যা করলেই ভয় পাবে বাঙালিরা, স্বাধীনতা এবং স্বাধিকারের কথা আর বলবে না৷

২৫শে মার্চ রাতে ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগের পর পাকিস্তান পৌঁছানোর আগেই ঢাকায় গণহত্যা শরু হয়৷ আর সেই রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে৷ কিন্তু তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৬শে মার্চ রাতের শুরুতেই ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়ে যান তিনি৷ আর আগে ৭ই মার্চের ভাষণেই তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন বলেছিলেন, যার যা আছে তা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে৷

২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর নামে একযোগে ভারী অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ঢাকায় তখনকার পুলিশ (ইপিআর) সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবাসে৷ তারা গোলা নিক্ষেপ করে মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাসে, হামলা চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বস্তি এলাকায়৷ ইতিহাসের এই নির্মম নিধনযজ্ঞ আর তা রাতেই ছড়িয়ে পরে পুরো শহরে৷ ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হায়নারা৷ সেই রাতেই রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে প্রতিরোধ শুরু হয়৷ ইপিআর সদস্যরাও প্রতিরোধের চেষ্টা করে জীবন দেন৷ তারপর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ৷ মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি নিধনে সামনের সারিতে ছিলেন পাকিস্তানি জেনারেল টিক্কা খান৷ আর ছিল তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও শান্তি কমিটি৷

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঢাকায় প্রথম গণহত্যা শুরু করে৷ আর রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ওই রাতেই প্রথম প্রতিরোধ শুরু হয়৷ সাড়ে তিনঘণ্টার সেই প্রতিরোধ যুদ্ধের কথা জনিয়েছেন তিন মুক্তিযোদ্ধা৷

শাহজাহান মিয়া ছিলেন ওয়্যারলেস অপারেটর৷ আবু শামা ছিলেন অস্ত্রাগারের দায়িত্বে একজন পুলিশ কনস্টেবল৷ আর আব্দুল আলী পুলিশের তৎকালীন আইজি তসলিম উদ্দিনের বডিগার্ড৷ থাকতেন রাজারবাগে৷ তারা তিনজনই ডয়চে ভেলেকে জানান, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরই ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি চলছিল৷ ২৫ মার্চ বিকেল থেকেই রাজারবাগের আশেপাশের সড়কে ট্রাকে করে রেকি করে পাকিস্তানি বাহিনী৷ আর রাত ৯টার পরই খবর আসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ হতে পারে৷

তখন রাজারবাগের অস্ত্রাগার খুলে চার শতাধিক অন্ত্র নিয়ে রাজারবাগের পুলিশ সদস্যরা রাজারবাগ এবং আশাপাশ এলাকায় পজিশন নেয়৷ রাত সাড়ে ১১টায় দ্বিতীয় দফা পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে অস্ত্রাগারের সব অস্ত্র বিলি করা হয় পুলিশ সদস্যদের মাঝে৷ এরপর রাত সাড়ে ১১টার কিছু পরে তারা রাজাররবাগের দিকে আসতে শুরু করলে পথেই প্রতিরোধের মুখে পড়ে৷

শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘‘রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে পাকিস্তানি বাহিনী চামেলিবাগে প্রথম পুলিশ ব্যারিকেডের মুখে পড়ে৷ সেখানেই দুই পাকসেনা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়৷ এটাই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রথম বুলেট৷ আমি এবং ওয়্যারলেস অপারেটর মনির তখন ওয়্যারলেস রুমে চলে যাই৷ সেখানে একটি ওয়্যারলেস বার্তা আমি লিখে তা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ১৯ জেলা, ৩৬টি সাব ডিভিশন এবং সব পুলিশ লাইন্সে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে জানিয়ে দিই৷ বার্তাটা ছিল: ‘দ্য বেস ফর অল স্টেশন পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ, কীপ লিসেনিং, ওয়াচ, উই আর অলরেডি অ্যাটাক্ড বাই পাক আর্মি, ট্রাই টু সেভ ইয়োরসেলফ্, ওভার এন্ড আউট৷’ আমি বেশ কয়েকেবার ম্যাসেজটি ট্রান্সমিট করি৷ তখন চারদিকে হাজার হাজার গুলির শব্দ৷ আমরাও তখন অন্ত্র নিয়ে পুলিশ লাইনের চার তলার ছাদে চলে যায়৷”

আবু শামা বলেন, ‘‘২৫ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে আমরা রাজারবাগ অস্ত্রাগারের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের পাতাকা উত্তোলন করি৷ স্লোগান দেই বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর৷ জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু৷ তখন অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা সুবেদার আবুল হাসেম অস্ত্রাগারে তালা মেরে চাবি আর আই মফিজ সাহেবের কাছে রেখে পালিয়ে যান৷ আমরা খবর পাই ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনী বের হয়েছে৷ তখন আমরা মফিজ সাহবেবের বাসায় দৌড়ে গিয়ে চাবি নিয়ে আসি৷ তিনি চাবি দিতে চাননি৷ আমরা জোর করে চাবি এনে অস্ত্রাগার খুলে দিই৷ রাইফেল নিয়ে আমরা পজিশনে চলে যাই৷ অস্ত্রাগার তালা মেরে দেয়া হয়৷ রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমাদের ওপর যখন চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু হয় তখন আমরা পাগলা ঘণ্টা বাজাই৷ তখন বাকি যারা ছিলেন তারাও বের হয়ে এসে অস্ত্রাগার ভেঙ্গে বাকি অস্ত্র হাতে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে৷ প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা আমরা প্রতিরোধ চালিয়ে যাই৷ লড়াই করি৷ এই সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ভিতরে ঢুকতে পারেনি৷ সাড়ে তিন ঘণ্টায় আমাদের গুলি ফুরিয়ে যায়৷ আমাদের গুলি বন্ধ হয়ে যায়৷ এরপর চারটি ব্যারাকে পাকিস্তানি বাহিনী আগুন ধরিয়ে দেয়৷”

তিনি বলেন, ‘‘সারারাত তারা গুলি ও কামানের গোলা ছোড়ে৷”

তৎকালীন আইজিপি’র বডিগার্ড আব্দুল আলী বলেন, ‘‘রাত ১১টা ৩০ মিনিটে আমি বঙ্গবন্ধুর ছেলের (শেখ কামাল) মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা পাই৷ আর তখন পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে ফোর্স জমায়েত করি৷ তখন চাবি না পেয়ে রাইফেল দিয়ে অস্ত্রাগারের তালা ভাঙ্গা হয়৷ আমি নিজেই অস্ত্রাগারে ঢুকে সহকর্মীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিই৷ রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজারবাগের কাছে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পৌঁছে যায় তখন আমরা রাজারবাগ থেকে গুলি ছুড়ে যুদ্ধ শুরু করি৷ তারা কামান ও ট্যাংকের গোলা ছোড়ে৷ আমরা ৩০৩ রাইফেল দিয়ে জবাব দিই৷”

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘‘২৬ মার্চ ভোরে পাকিস্তানি বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ভিতরে প্রবেশ করে পুলিশ লাইনের চারতলা ভবনের ছাদে পানির ট্যাংকের নীচে আমরা অনেকে লুকিয়ে ছিলাম৷ আরো বিভিন্ন জায়গায় ২০/২৫ জনকে পায় তারা৷ বাকিরা বাইরে চলে যেতে সক্ষম হয়৷ আমাদের আটক করে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়৷ আমরা তখন অনেক পুলিশ সদস্যদের লাশ পরে থাকতে দেখি৷ দেড়শ’র মত পুলিশ সদস্য প্রাণহারান৷”

আব্দুল আলী বলেন, ‘‘আমাদের ২৮ মার্চ পর্যন্ত বন্দি রাখা হয়৷ এই সময়ে আমাদের কোন খাবার, এমনকি পানিও দেয়া হয়নি৷ এরপর আমাদের ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার ই এ চৌধুরীর কাছে হস্তান্তর করা হয়৷ আমাদের সেখান থেকে ছেড়ে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট দিনে কাজে যোগ দিতে বলা হয়৷ কিন্তু আমরা তা করিনি৷ আমরা পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই৷”

তারা তিনজনই প্রথমে ভারতে যান৷ সেখান থেকে ফের বাংলাদেশে প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন৷

শাহজাহান মিয়া তাঁর তিন ভাইকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন৷ যুদ্ধ করেন ৯ নম্বর সেক্টরে৷ তাঁর এক ভাই মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হন৷ আর আবু শামা ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে গুরুতর আহত হন৷ আব্দুল আলি মেঘালয়ে প্রথমে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন৷ এরপর ময়মনসিংহ এলকায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন৷

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা তিনজনই চাকরিতে যোগ দেয়ার পর অবসরে যান৷ তবে এরমধ্যে আব্দুল আলীকে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল৷ আব্দুল আলী বলেন, ‘‘১৯৭৭ সালে জিয়ার সময়ে স্পেশাল মার্শাল ল’ ট্রাইবুন্যালে আমাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়৷ ২৫ মার্চ রাজারবাগে পাগলাঘণ্টা বাজান, অস্ত্রাগার ভাঙ্গা এইসব অপরাধে আমাকে তখন ফাঁসিতে ঝোলানোর প্রস্তুতি নেয়া হয়৷ পরে চাকরিচ্যুতির শর্তে আমি প্রাণে বেঁচে যাই৷”

 

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদঃ

মুক্তিযুদ্ধে প্রথমে শহীদ হোন ফারুক ইকবাল যার

শহীদ স্মৃতি সমাধি সৌধ রাজধানীর ব্যস্ততম মৌচাক মোড়ে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মারক ফারুক ইকবাল- তসলিম স্মৃতি সমাধি সৌধ। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ ফারুক ইকবাল ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। আর কিশোর মুক্তিযোদ্ধা তসলিম নিহত হোন যুদ্ধ শেষে ঘরে ফেরার পথে ১৭ ডিসেম্বর।

এলাকাবাসীর দাবিতে ফারুক ইকবালের পাশেই সমাহিত করা হয় কিশোর মুক্তিযোদ্ধা তসলিমকে। দুই বীর শহীদের স্মৃতি ধরে রাখতে ২০০৮ সালে নির্মাণ করা হয় সমাধি সৌধ।

১৯৭১ সালে রাজধানীর মালিবাগে আবুজর গিফারী কলেজের ছাত্র সংসদের সেক্রেটারি ছিলেন ফারুক ইকবাল। ২ মার্চ স্বাধীকারের দাবিতে দেশ যখন উত্তাল তখন পশ্চিমা পাকিস্তানি শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কারফিউ ভেঙে উত্তাল মার্চে মিছিল বের করে ছাত্র সংসদ।

নেতৃত্বের কারণে আগে থেকেই পাকিস্তানি শাসকদের টার্গেট ছিলেন ফারুক ইকবাল। ৩ মার্চ কলেজ ছাত্রসংসদ আবারো মিছিল বের করলে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে নিহত হন ফারুক ইকবাল। তিনিই মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ।

পরে বর্তমান মৌচাক মোড়ের এ জায়গাটিতে তাকে সমাহিত করা হয়।

ফারুক ইকবালের পাশে শায়িত আরেক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা তসলিম উদ্দীন। একাত্তরে সিদ্ধেশ্বরী বালক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র তসলিম যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে।

যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফেরার পথে ১৭ ডিসেম্বর শহীদ হন তিনি। ফারুক ইকবালের পাশেই সমাহিত করা হয় তাকে। দীর্ঘদিন অযত্নে অবহেলায় পড়ে ছিল এ দুই শহীদের কবর। পরে ২০০৮ সালে এখানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে ঢাকা সিটি করপোরেশন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা আজও হয়নি। এ নিয়ে বিশদ গবেষণাও হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ১৯৫ জনের নাম আছে, যাঁদের পরিচয় পাওয়া যায়। এর বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়াতে আসা অনেককে হত্যা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সেদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আড়াই শ থেকে তিন শ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওয়্যারলেসের সংলাপেও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন শ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে।

১৯৭১ সালের গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেছিলেন ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হলেই বাকিরা কাবু হয়ে যাবে। তাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ সব আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। আর সে কারণেই ২৫ মার্চ রাতেই এখানে হামলা হয়। যেহেতু এটি পরিকল্পিত এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সুসজ্জিত হয়ে ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্বিচারে হত্যা চালিয়েছে, কাজেই এটি গণহত্যা।’

জগন্নাথ হলের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সময়ের ইকবাল হলেও (বর্তমান জহরুল হক হল) পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা চালায়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ ছাত্রনেতারা এই হলে থাকতেন বলেই অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম লক্ষ্য ছিল এই হলটি।

রঙ্গলাল সেনসহ তিনজনের সম্পাদিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বইটিতে বলা হয়েছে, ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী ট্যাংক, জিপে বসানো রাইফেল, মর্টার, ভারী ও হালকা মেশিনগান নিয়ে জহুরুল হক হল আক্রমণ করে চারদিক থেকে। ছাত্রনেতা ও কর্মীরা হল ছেড়ে চলে গেলেও সাধারণ ছাত্র ও কর্মচারীরা হলে ছিল। জহুরুল হক হল আক্রমণের প্রথম পর্যায়েই ব্রিটিশ কাউন্সিলে পাহারারত ইপিআর সৈনিকদের হত্যা করা হয়। এরপর ওই ভবনের ওপর সামনে ট্যাংক ও ওপরে কামান বসিয়ে জগন্নাথ হল ও ইকবাল হলে গুলি করা হয়।

জহুরুল হক হলের মূল ভবনের সিঁড়িতে নিহত ছাত্র যাঁদের পরিচয় পাওয়া গেছে তাঁদের নয়জনের একটি তালিকা আছে। জহুরুল হলসংলগ্ন নীলক্ষেত আবাসিক এলাকায় তিনটি বাড়ির ছাদে আজিমপুর থেকে পালিয়ে আসা ইপিআর সদস্যরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেও গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। ২৩ নম্বর ছাদ থেকেই শুধু ৩০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল।

তথ্য সূত্রঃ Google. 

 

আমার কথাঃ

 

এতো গেলো ঢাকার কথা, এছাড়া চট্টগ্রামে এই কালরাত্রিতে সৈনিকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং ৭ই মার্চের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ডাক অনুযায়ী চট্টগ্রামের সেনাবাহিনী পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে প্রথমেই চট্টগ্রামে পাকিস্থানি সৈন্যদের নিরস্ত্র করে বন্দী করে ফেলে এবং পরবর্তীতে যুদ্ধ পরিচালনার সকল কর্ম পন্থা নির্ধারণ করে।

এভাবেই শুরু হয় সারা দেশে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ, নিজের দেশের জন্য যুদ্ধ।

এই যুদ্ধের মূল নিয়ম ছিলো গেরিলা যুদ্ধ, আঘাত হানো, যত পারো পাক হানাদার এবং তাদের দোসরদের হত্যা করো, যাকে ইংরেজিতে বলে Eye for an Eye.

নিরস্ত্র বাংগালী নিধনের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এক সময় সবাই হয়ে যায় মুক্তিবাহিনী, এই বাহিনীতে যেমন বাংগালী সেনাবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ছিলো, তেমনি ছিলো এই দেশের সাধারণ মানুষরা।

কৃষক, শ্রমিক, রিকসাওয়ালা, ছাত্র ছাড়াও সকল স্তরের মানুষ এই মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলো।

স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদার এবং তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস, বিহারিদের হাতে এই দেশ হারিয়েছে তার সূর্য সন্তানদের, তিরিশ লক্ষ শহীদ এবং দুই লক্ষেরও অধিক মা বোন ধর্ষিত এবং নিহত হয়, আর আমরা এর বিনিময়ে পাই স্বাধীনতা।

প্রিয় পাঠকবৃন্দ, এতো ক্ষতির পর পাওয়া স্বাধীনতাকে আমাদের উচিত সবসময় মনে রাখা উচিত, প্রতিবার এই স্বাধীন দেশ এবং তার সবুজ জমিনে লাল পতাকাটির সম্মান সমুন্নত রাখা।

আসুন হাতে হাত রেখে বলিঃ

আমার সোনার বাংলা

আমি তোমায় ভালোবাসি।।

 

সমাপ্ত।

৩৫৪জন ১৮০জন
71 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য