অন্যপূর্বা

গোধূলি ২৪ জুন ২০১৩, সোমবার, ১০:৫৬:০৬পূর্বাহ্ন গল্প ২০ মন্তব্য

তালগাছের মতোই লম্বা ছেলেটা। সবসময় কুঁজো হয়ে হাঁটেমাটির সাথে মিশে যেতে পারলেই যেন ভাল হতো এই রেলস্টেশনটা শাওনের প্রিয় একটা জায়গা। প্রায়ই আসে শাওন, রেললাইনের উপর দিয়ে হাঁটে। কখনো বা বেঞ্চে বসে, চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে। অন্যদিনের মতোই এক বিকেলে বেঞ্চে বসেছিল। খেয়াল করল, বিয়ের সাজে সজ্জিত এক মেয়ে আসছে বেঞ্চের দিকে। বৌ সাজলে সব মেয়েকেই সুন্দর লাগে, এই মেয়েটিকেও অস্বাভাবিক সুন্দর লাগছে। শাওনের তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকলে মেয়েটি কিছু ভেবে বসতে পারে। শাওন ভাবল, আমি এসব ভাবছি কেন। মেয়েটা বিয়েবাড়ি রেখে এখানে কি করছে?

মেয়েটি বেঞ্চে এসে বসলো। অস্থিরভাবে আশেপাশে তাকাচ্ছে। বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছে, এখন ভালবাসার মানুষের অপেক্ষা করছে। হঠাৎ মেয়েটির ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো, পার্স থেকে মোবাইল বের করল মেয়েটি, এসএমএস পড়ল। তারপর ঘোমটা টেনে ভালমতো মুখ ঢাকল। খুব সম্ভবত কাঁদছে মেয়েটি। শাওন বুঝতে পারল না সচেতন নাগরিক হিসেবে তার এখন কি করা উচিৎ। জীবনটা হিন্দি সিরিয়াল হলে, এতোক্ষণে মেয়েটিকে বিয়ে করা হয়ে যেত। যাই হোক।

শাওন একটু কাশি দিলো, বেশ জোরে। মেয়েটি যেভাবে বসেছিল, সেভাবেই বসে থাকলো। শাওন মেয়েটির দিকে ঘুরে বলল,” এই যে শুনুন।”

মেয়েটি শাওনের দিকে তাকালো। মেয়েটির গালভেজা, কাজল লেপটে যায় নি, আজকালকার ওয়াটারপ্রুফ কাজল বলে কথা। শাওন বলল, ” কোন সমস্যা?”

মেয়েটি কোন উত্তর না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। শাওন আবার বলল, ” আমি কি কোন উপকার করতে পারি?”

মেয়েটি এবার বলল,” জ্বি, আমাকে বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকতে পারেন।”

শাওন বেশ ধাক্কা খেল। মানুষের উপকার করতে নেই। শাওন আগের মতোই বসে থাকল। মেয়েটি হঠাৎ করেই বেশ জোরেশোরে কাঁদতে লাগল। শাওন বিব্রতবোধ করছিল। মেয়েটি কিছুক্ষণ পর কান্না থামিয়ে চোখ মুছল, তারপর ঘোমটা নামিয়ে আশেপাশে দেখলো। শাওনকে বলল,” আপনার কাছে টিস্যুপেপার আছে?”

“না নেই।”

জনদরদী শাওন নিজের রুমালটা পকেট থেকে বের করে দিলো ঠিক সিনেমাটিক হিরোদের মত। মেয়েটি রুমাল নিল না। আঙ্গুল দিয়ে একটা দোকান দেখিয়ে বলল, “ওইটাতে টিস্যু পাওয়া যাবে না?”

“বলতে পারছি না।”

মেয়েটি উঠে গেল। তারপর দোকানটি থেকে টিস্যু কিনে আবার এসে বসলো। শাওনের দিকে তাকাল, বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ”

“কি জন্য?”

“রুমাল অফার করার জন্য।”

“ও।” শাওন ভাবল,মেয়েটা সবকিছুই দেরি করে নাকি?

তারপর চুপচাপ কাটল মিনিটদশেক। মেয়েটি জিজ্ঞেস করল,” নেক্সট ট্রেন ক’টায়,জানেন?”

“না”

বিরক্তিভরা দৃষ্টি নিয়ে বলল, “তো আপনি কি করছেন এখানে?”

“মাঝে মাঝেই আসি।”

“ও”

“আপনি বোধহয় মাঝেমাঝে আসেন না”

“হুম”

“যার অপেক্ষা করছেন, সে আসবে না?”

“না” নিচুস্বরে বলল।

“তো কি করবেন এখন?”

“জানি না”

“আপনি পালালেন কিভাবে?”

“বিউটি পার্লার থেকে সরাসরি চলে এসেছি।”

“এখন কি সুইসাইডের কথা ভাবছেন?”

মেয়েটি শাওনের দিকে তাকাল, কিছু বলল না। শাওন বলল, “খুব সম্ভবত আজ আর ট্রেন নেই কোন।”

মিনিটদুয়েক বাদে শাওন আবার বলল,”কিছু মনে করবেন না, কিছু কথা বলতে পারি?”

দৃঢ়কণ্ঠে মেয়েটি বলল, “না”।

কিছুক্ষণ পর মেয়েটি বলল, “হেলেন অফ ট্রয়ের কথা শুনেছেন?”

“হুম, পড়েছি।”

“আপনি কি বলতে পারবেন, হেলেন মেনেলাউসের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কেন প্যারিসের হাত ধরে চলে এসেছিল?”

“মেনেলাউসকে হয়তো হেলেন ভালবাসতেন না।”

মেয়েটি মৃদু হেসে বলল, “দুনিয়াটা  মেয়েদের দোষ দিতে খুব ভালোবাসে। হেলেন ছিলেন স্বয়ংবরা। গ্রীসের সবচেয়ে রূপবতী রমণী ছিলেন হেলেন। তাকে বিয়ে করার জন্য অসংখ্য রাজা-রাজপুত্র ভিড় করেছিল। হেলেন মানেলাউসকে নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেন। মেনেলাউস ছিলেন হেলেনের রুপমুগ্ধ। মেয়েরা ভালবাসার কাঙাল হয়। হেলেন প্রকৃত ভালবাসা খুঁজত। আমিও তাই পালিয়ে এসেছি। আমার সাথে যার বিয়ে হবার কথা সে আমাকে আমার ছবি দেখেই পছন্দ করেছে। কখনো কথা হয়নি। এমন একজনকে কিভাবে বিয়ে করি? জানি না,শুনি না। কি গ্যারান্টি আছে যে, বিয়ের পর আমাকে পেটাবে না?”

“ছেলেদের সম্পর্কে এমন নেগেটিভ ধারণা কেন আপনার?”

“পজেটিভ ধারণাই বা হবে কিভাবে,বলুন? যেই ছেলেটা চার বছর ধরে আমার পিছে ঘুরেছে, আজ সেই পিছু হটলো! আমাকে ছাড়া নাকি বাঁচবে না। জান কোরবান করে দেবে আমার জন্য। যে আমার দিকে তাকাবে,তার চোখ উপড়ে ফেলবে। ভালবাসার কত্ত কথা। হুহ। আজ বললাম, ‘আমি তোমার’। কিন্তু তার পক্ষে পসিবল নয়। দিনের পর দিন প্রেমালাপ করার সময় কেনো ভাবেনি যে ‘সম্ভব নয়’? আমাকে নিরুপায় করে ছেঁড়ে দিয়েছে।****(কিছু গালি দিলো)” মেয়েদের মুখ থেকে গালি শুনতে বেশ ভালোই লাগে শাওনের।

শাওন বলল,”মানুষ চিনতে সবাই ভুল করে। আপনিও করেছেন।”

“হুম। প্রতিদিন আমার জন্য গোলাপ নিয়ে আসতো। পরীক্ষা থাকলে সকালে ফোন করে আমার ঘুম ভাঙ্গাতো। ভুল বুঝেছি সব। তাই না?” দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর বলল,”লাইফটা খুব কঠিন। আর হিন্দি সিরিয়ালগুলো সব নষ্টের মূল। ছেলেদের খুব মহৎ করে দেখানো হয়। তারা লগ্নভ্রষ্টা,বিধবা এমনকি ধর্ষিত মেয়েকে বিয়ে করতে এগিয়ে আসে। বাস্তবে তা হয় না। লাইফ যদি সিনেমা হতো, তাহলে আমার এখনকার ডায়লগ হতো,’আমার কি হবে?’ আর আপনি বলতেন,’আমি তোমাকে বিয়ে করবো’ ”

“ভালোই বলেছেন।”

কিছুক্ষণ পর শাওন বলল,” আচ্ছা, আপনি ভাগার আগে একবারো নিজের আব্বু-আম্মুর কথা ভাবেন নি?”

“ভেবেছি। সব মা-বাবা নিজের সন্তানের অনেক ভালবাসেন। একটা সময় এমনিই মাফ করে দিতেন।”

“একটা কাজ করতে পারেন।”

“কি?”

“বাড়ী যান।”

“মানে?”

“সময় বেশি যায় নি, আধাঘণ্টার মতো। বাড়ী যান, বিয়ে করেন।”

“পসিবল না। কাউকে কিছু না বলে ফাঁক দিয়ে চলে এসেছি। কারো ফোনও রিসিভ করিনি। কি বলবো?”

“অজুহাত খাড়া করতে কিছু লাগে? বলবেন, ফোন খেয়াল করেননি। নার্ভাস লাগছিল বলে একটু বাইরে বেরিয়েছিলেন।”

 

শাওন মেয়েটিকে নিয়ে রেখে এলো বিয়েবাড়ির একটু দূরে। মেয়েটি যাওয়ার আগে বেশ ক’বার পিছে ফিরল। যতক্ষণ মেয়েটিকে দেখা যায় ,শাওন তাকিয়ে রইল।

 

দু’বছর পর। শাওন আবার সেই রেলস্টেশনের সেই বেঞ্চটিতেই বসে আছে। দূর থেকে গোলাপি রঙের শাড়িপরা একটি মেয়েকে এগিয়ে আসতে দেখল। চেনা চেনা লাগছে মেয়েটিকে। মেয়েটি শাওনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল, তারপর বেঞ্চে বসলো। বলল, “ভালো আছেন?”

“হুম”

“চিনেছেন আমাকে? না ভুলে গেছেন?”

শাওনের স্মৃতিশক্তি খুব একটা খারাপ না। সে বলল,” জ্বি, আপনি কেমন আছেন?”

“বেশ ভালো”

“জানেন, আমি এখানে বিগত বেশ ক’বছর ধরেই আসছি? প্রত্যেকবার ভেবেছি,আজ হয়তো আপনার সাথে দেখা হবে। কিন্তু আপনি আসেননি।”

“তাই?”

“হুম”

“আজ তো দেখা হয়েই গেলো।”

মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল, “হুম। একটা কথা বলার ছিল আপনাকে।”

“কি?”

“থ্যাঙ্ক ইউ”

“ওয়েলকাম। কিন্তু কেন?” কিন্তু শাওন মনে মনে বলল,’আগের বারও থ্যাঙ্ক ইউ টা দেরিতে বলেছিলেন।’

“আমাকে বিয়েবাড়ি দিয়ে আসার জন্য।”

“ও”

শাওন হাসল। বলল, “তার মানে বিয়েতে আপনি বেশ সুখী হয়েছেন?”

মেয়েটি হাসল এবার। বলল,”ঐ দিন আমার বিয়ে হয় নি।”

“মানে?”

“আমার বিয়ের বরও পালিয়ে গেছিল। ছেলেটিও অন্য একটি মেয়েকে ভালোবাসতো। পরিবারের চাপে সে আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়। মেয়েটি নাকি সুইসাইড অ্যাটেমপ্ট নিয়েছিল। তাই ছেলেটি… দুনিয়াটা মেয়েদের দোষ দিতে বড্ড ভালোবাসে। বিয়ে ভাঙলে মেয়ের পরিবারেরই দুর্নাম হয়। আমি ভাগলে আরো দুর্নাম হতো। যাই হোক। আল্লাহ যা কিছু করেন মঙ্গলের জন্যই করেন।”

মেয়েটি উঠে দাঁড়ালো, বলল, “ভালো থাকবেন,আসি।” তারপর চলে গেল।

শাওন ভেবেছিল, মেয়েটির নাম-পরিচয় জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু করলো না। কিছু কিছু সম্পর্ক এমনই হয়। কেউ কারো নাম জানবে না, ঠিকানা জানবে না, কিছুই জানবে না। হয়তো এখানেই আবার কোন একদিন দেখা হবে, অথবা আর কোনোদিনই হয়তো দেখা হবে না। কি যায় আসে? মেয়েটি শাওনের স্মৃতিতে যেমন অক্ষয় হয়ে থাকবে, মেয়েটির স্মৃতিতেও শাওন অক্ষয় হয়ে থাকবে।

 

শাওন বেঞ্চ থেকে উঠে রেললাইনের উপর দিয়ে হাঁটতে লাগলো। হঠাৎ মুঠোফোন বেজে উঠলো। ওপাশ থেকে মিহিসুরে কেউ বলল, “তুমি কৈ এখন?”

“রেলস্টেশনে”

” কি করছ?”

“রেললাইনের উপর দিয়ে হাঁটছি।”

“আমাকে কি একবার ফোন দেওয়া যায় না?”

“বিজি ছিলাম”

“হুম। রেললাইনের উপর দিয়ে হাঁটা খুব ইম্পরট্যান্ট একটা কাজ?”

“হুম। ঠিক ধরেছো।” কিছুক্ষণ থেমে শাওন বলল, “আজ একজনের সাথে দেখা হল এখানে বছরখানেক পর।”

“কার সাথে?”

“তোমাকে বলেছিলাম না? বিয়ে পালানো মেয়েটা, ঐ যে RUNAWAY BRIDE.”

“জুলিয়া রবার্টসের মুভির কথা বলছ?”

“আরে না। ঐ যে, যেই মেয়েটার সাথে রেলস্টেশনে দেখা হয়েছিলো। তোমাকে বলেছিলাম।”

“তুমি তো কত মেয়ের কথাই বল।”

“তাই?”

“হুম”

“জানো, মেয়েটা কয়েকবছর ধরে এখানে আসতো আমার সাথে দেখা হবে-এই আশায়?”

“ফোন নম্বর নিয়েছো?”

“ধুর”

“তাহলে দেখা করাটা তোমাদের জন্য ইজি হতো।”

“ভালো বলেছো। নেক্সট টাইম দেখা হলে, অবশ্যই নিয়ে রাখব।”

কিছু কিছু মানুষকে রাগিয়ে জ্বালিয়ে অন্যরকম মজা পাওয়া যায়। শাওন ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করে।

©কৃন্তনিকা

২৬১জন ২৬১জন
0 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য