অন্তরালের সে – ৩ (শেষ পর্ব)

দিপালী ২৩ অক্টোবর ২০২০, শুক্রবার, ০২:১১:৪৫অপরাহ্ন গল্প ১০ মন্তব্য

… … দুই দিন ধরে থানা পুলিশ চলল। অতঃপর অপমৃত্যুর মামলার মধ্য দিয়ে মৌটুসি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল!

মাত্র কিছু দিন যাবত দীপশিখা বাইরের খাবার খেতে শুরু করেছিল। কাজের মেয়ে রুপসী মৌটুসিকে সাহায্য করলেও দীপশিখার দেখা শোনা মুলতঃ মৌটুসিই করত। এখন দীপশিখাকে সামলাতে সবার হিমশিম অবস্থা।

মা ছেলে ছুটি নিয়ে দীপশিখার দেখা শোনা করছে তাও প্রায় সপ্তাহ হয়ে এল। কিন্তু এভাবে কতদিন? আবার শুধু মাত্র রুপসীর ভরসায় দীপশিখাকে বাসায় রেখে অফিসে যাবার কথা চিন্তা করতে পারেন না রাহেলা বানু।

রাতুলের বাবার মৃত্যুর পর রাহেলা বানু কোন অবস্থাতেই দ্বিতীয় বার কবুল বলতে চাননি। তিনি কি করে রাতুলকে আবার বিয়ে করার কথা বলবেন! এদিকে দীপশিখার জন্য মায়ের মমতা, রাতুলের বাকী জীবন সব কিছু ভেবে ভেবে ক্লান্ত হয়ে যান রাহেলা বানু কিন্তু কোন সমাধান হাতরে পান না।

: মা, আমি কি একটু ভিতরে আসতে পারি?

রাহেলা বানু ঘর অন্ধকার করে একাকী বসে আছেন। কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তার এমন কি রাতুলের সাথেও না।

: কেন রাতুল?

: তোমার সাথে একটা জরুরী কথা ছিল মা।

: আচ্ছা ভিতরে আসো বলে ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে দিলেন।

রাতুল খাটের উপর মায়ের মুখোমুখি বসল।

: মা।

: বল রাতুল।

: মা, এখন যদি আমি নিতুকে বিয়ে করি তাতেও কি তোমার আপওি থাকবে?

ছেলের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন রাহেলা বানু।

: মা, তুমিই কিন্তু সেদিন চট্টলা আন্টিকে বলছিলে গায়ের রঙ আজ কাল কেউ দেখে না আর এখন তো তোমার সংসার আলো করে দীপশিখা রয়েছেই।

: নিতু কি এ বিয়েতে রাজি হবে?

: নিতুর ব্যাপারটা তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও। তোমার বিয়েতে আর কোন আপওি নেই তো?

অনাড়ম্বরভাবে নিতুর সাথে রাতুলের দ্বিতীয় বিয়েটা হয়ে গেল। প্রান ফিরে এলো রাহেলা বানুর সংসারে। নিতু দীপশিখাকে নিজের সন্তানের মতনই মায়া মমতা দিয়ে যত্ন করে।

রাহেলা বানু অবাক হয়ে রাতুলকে দেখে। মৌটুসির সাথে রাতুলকে ভাল থাকতে দেখেছেন তিনি কিন্তু রাতুলের চোখে মুখে এত আনন্দ তিনি কখনও দেখেননি।

বিয়ের তিন মাস পর প্রথম বাপের বাড়ি চিটাগাং যাচ্ছে নিতু। সাথে দীপশিখা আর কাজের মেয়ে রুপসী। রাতুলও যাচ্ছে ওদের সাথে।

দুদিন চিটাগাং থেকে ঢাকায় ফিরে আসে রাতুল। নিতু আর না হলেও সপ্তাহ খানেক চিটাগাং থাকবে।

নিতুকে ছাড়া, দীপশিখাকে ছাড়া বাসাটা বড্ড ফাঁকা, বড্ড  নিরব। রাহেলা বানু অফিসের কি এক জরুরী কাজ নিয়ে ব্যস্ত। অফিস থেকে ফিরেই আবার কাজ নিয়ে বসেছেন।

রাতুল নিজের রুমে শুয়ে আছে। এরই মধ্যে কয়েকবার ভিডিও কলে দীপশিখাকে দেখেছে। আজ আর কল করা যাবে না হুলিয়া জাড়ি করেছে নিতু।

মৌটুসি মারা যাবার পর দিন মৌটুসির আলমারিটা রাহেলা বানু লক করে চাবি নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন আমানত হিসেবে। দীপশিখা বড় হলে ওদের মায়ের জিনিস গুলো ওদেরকে বুঝিয়ে দিবেন। ডুপ্লিকেট একটা চাবি রাতুলের কাছে থাকলেও রাতুলের আলমারিটা খোলার প্রয়োজন হয় না। কারণ আলমারিটিতে শুধু মৌটুসির জিনিসই থাকত।

একা একা থাকার কারনে আজ অনেক দিন পর মৌটুসির কথা মনে হল রাতুলের। আলমারিটার দিকে তাকিয়ে মৌটুসির গুপ্ত ধনের কথাটা মনে হতে ছেলেমানুষী পেয়ে বসল রাতুলকে। তার অকারন দেখতে ইচ্ছে হল শাড়ীর ভাজে আসলেই কত টাকা জমিয়ে রেখেছে মৌটুসি!

ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে আলমারিটা খুলতেই একটা মৌটুসি সৌরভ ছেয়ে ফেলল রাতুলকে।

মৌটুসির শাড়ী প্রীতি ছিল। আজ কালকার মেয়েরা ঘরে শাড়ী পরতে না চাইলেও মৌটুসি প্রায়ই বাসায় শাড়ী পরে থাকত। তাই রাহেলা বানু প্রায়ই মৌটুসিকে শাড়ী কিনে দিতেন। অল্প দিনের বিবাহিত জীবনে অনেক শাড়ী মৌটুসির।

আলমারিতে কিছু শাড়ী ঝুলিয়ে রাখা। কিছু শাড়ী সেলফে ভাজ করে রাখা। একদম উপর থেকে আরম্ভ করল রাতুল। একটা জামদানী শাড়ীর ভাজে বেশ কিছু এক হাজার টাকার নোট পেল রাতুল। গুনে দেখল ষোল হাজার টাকা মাত্র। টাকাটা আবার সেখানেই রেখে দিল। দ্বিতীয় সেলফের একটা হলুদ রঙের তাতের শাড়ীর ভাজে অনেক গুলো সবুজ পাঁচশ টাকার নোট। টাকাগুলো বের করতে গেলে তার সাথে একটা খয়েরী রঙের খামও বেরিয়ে এল। খামের উপরে “রাতুল” লেখা।

পাঁচশ টাকার নোট গুলো শাড়ীর ভাজে রেখে আলমারি বন্ধ করে খামটা খুলল রাতুল। খাম থেকে বেশ ভারী একটা চিঠি বেরিয়ে এল। চিঠিটা খুলে পড়তে আরম্ভ করল রাতুল –

প্রিয় রাতুল,

খুব অবাক হয়েছিলে! তাই না? পৃথিবীতে সব মানুষের জন্যই কিছু না কিছু বিস্ময় গচ্ছিত থাকে।

চিঠিটা যখন তুমি পড়বে তখন হয়ত আমি তোমার জীবন থেকে, এই পৃথিবী থেকে অনেক দূরে কোন অজানা ঠিকানার বাসিন্দা হবো।

বাসর রাতেই তুমি আমাকে নিতুর কথা বলেছিলে। তোমার সততা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আমি ধরে নিয়েছিলাম নিতুর প্রসঙ্গ ওখানেই শেষ।

বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের এক খাটে জায়গা হত না বলে তুমি পাশের রুমে ঘুমাতে। আমার বড্ড একা লাগত। মন খারাপ হত। আমি প্রায় রাতে চুপ করে তোমাকে একবার দেখে আসতাম।

একদিন হঠাৎ কান্নার শব্দে ঘুম ভেঁঙ্গে যায় আমার। কান্নার শব্দটা তোমার রুম থেকেই আসছিল। আমি দিকবিদিক হয়ে দৌড়ে তোমার রুমে যেতে গিয়ে দরজার কাছে “নিতু” “নিতু” শব্দে থমকে দাঁড়াই।

তারপর যা শুনলাম তাতে বুঝলাম তুমি আমার সাথে ভাল আছো ঠিকই কিন্তু সুখে নেই। ভাল থাকা এবং সুখে থাকার মধ্যকার সুক্ষ পার্থক্যটা যেন সেই মুহূর্তে মর্মে মর্মে অনুধাবন করলাম।

যদিও ব্যাপারটা অন্যায় তবুও নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারতাম না। প্রায়ই আড়ি পেতে আমি তোমাদের কথা শুনতাম। কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার জানো রাতের তোমাকে আর দিনের আলোয় খুঁজে পেতাম না। আমার সামনের তোমাকে তোমার অন্তরালের তোমার সাথে মিলাতে পারতাম না।

আমি খুব ভাল করে বুঝতে পেরেছিলাম তুমি এখনও নিতুকেই চাও এবং আমৃত্যু তাই চাইবে। নিতুর শ্যামলা গায়ের রং, সাত মাসের বড় হওয়া কিংবা মা হতে না পারার অক্ষমতা আমার সৌন্দর্য মেধা ভালবাসা সব কিছুকে ম্লান করে দিয়েছিল।

প্রতিদিন একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে যাবার চেয়ে তোমাকে ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। আর সে জন্য প্রথমে নিজেকে সাবলম্বী হতে হবে। ঠিক করলাম পড়াশুনাটা শেষ করবো। মাকে এমবিএ ভর্তি হবার কথা বলতে উনি বললেন “এত ছোট ছোট দুটো বাচ্চা রেখে কিভাবে ক্লাস করবে? যদি খুব ইচ্ছে হয় তবে অনলাইনে ক্লাস করা যায় এমন কোথাও এডমিশন নাও”। আমি তাই করলাম। তোমাকে এমবিএ করতে চাই জানালে তুমিও পাশে থাকবে বলে সাহস দিলে।

আমার নিজের কোন ল্যাপটপ ছিল না। তাই তোমার দুটো ল্যাপটপের একটি আমি ব্যবহার করতে পারি কিনা বলতেই তুমি একটি ল্যাপটপ আমাকে ব্যবহার করতে দিয়ে বললে সামনের মাসেই আমাকে একটি ল্যাপটপ কিনে দেবে।

আমি যখনই সময় পেতাম ল্যাপটপ নিয়ে বসে যেতাম।

একদিন আমি সার্চ দিতে গিয়ে তোমার সার্চ হিস্ট্রিতে চোখ আটকে গেল। তুমি পয়জন নিয়ে অনেক লিটারেচার সার্চ দিয়েছ। ভয়ে বুকটা কেপে উঠল। কারন রাতে তুমি প্রায়ই নিতুকে বলতে নিতুকে না পেলে তুমি মরে যাবে, তুমি বিষ খাবে।

ব্যাপারটা মাকে বলব কিনা মনে মনে এমনটা যখন ভাবছিলাম তখন তোমার হঠাৎ করে যত্নের অজুহাতে আমাকে দুধ খাওয়ানো, হরলিকস খাওয়ানো ব্যাপারটা মনের মধ্যে স্টাইক করল।

মনে আছে রাতুল একদিন দুধের মগ হাতে নিয়ে আমি অনেক কেঁদেছিলাম। তুমি ভেবেছিলে তোমার ভালবাসায় আমি ডুকড়ে কেঁদেছিলাম। কিন্তু না! সেদিন কেঁদেছিলাম তোমার নিষ্ঠুরতায়।

আমি যখন বুঝতে পেরেছিলাম তুমি নিতুকে পাবার জন্য আমাকে মেরে ফেলতে চাইছ আমি ইচ্ছে হলে দীপশিখাকে নিয়ে তোমার জীবন থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারতাম কিন্তু তাতে তোমার মাও তোমার জীবন থেকে আলাদা হয়ে যেতেন। আর আমি সেটি একদমই চাইনি।

তুমি যদি ভালবাসার জন্য খুনী হতে পার তবে আমিও ভালবাসার জন্য খুন হতে পারি। আমি ধীরে ধীরে নিজেকে মৃত্যুর জন্য তৈরি করে ফেললাম। তার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে একটি স্বীকারুক্তিমুলক চিরকুট লিখলাম।

প্রতি রাতে তোমার দেয়া অমৃত পান শেষে চিরকুটটা মগের পাশে রেখে দিতাম। যেদিন বেঁচে যেতাম সেদিন সকাল হতেই সবার অলক্ষ্যে চিরকুটটি সরিয়ে ফেলতাম। আমি চাইনি আমার সন্তানেরা খুনীর সন্তান হিসেবে সমাজে পরিচিতি পাক।

রাতুল, আমার জীবনে তুমিই একমাত্র পুরুষ। কোন দিন কাউকে ভালবাসিনি আমি। সমস্ত ভালবাসা সঞ্চিত রেখেছিলাম স্বামীর জন্য, তোমার জন্য। তুমি আমার কাছে আমার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশী ছিলে।

ভাল থেকো রাতুল। তোমার নিতুকে নিয়ে সুখে থেকো। প্রতিদিন দীপশিখাকে তাদের মায়ের হয়ে একটু আদর করে দিবে প্লিজ।

আর একটি কথা। চিঠিটা পড়া শেষ হলে পুড়িয়ে ছাই ভষ্ম করে ফেলবে। কারন তুমি ছাড়া এই সত্যটা আর কারো জানবার প্রয়োজন নেই।

ইতি

মৌটুসি

 

(সমাপ্ত)

বিঃদ্রঃ সাথে থেকে অনুপ্রানিত করার জন্য কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসা জানবেন। ভুল ত্রুটি মার্জনীয়।

 

১৫৭জন ৩১জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য