অন্তরালের সে – ১

দিপালী ২১ অক্টোবর ২০২০, বুধবার, ১০:১৩:৪০পূর্বাহ্ন গল্প ২৬ মন্তব্য

অন্ধকার বারান্দায় চুপচাপ বসে আছেন রাহেলা বানু। যেন নিজের আবেগকে সামলে নেবার চেষ্টা করছেন। রাতুলের ভবিষৎ চিন্তায় আজ কাল তিনি একটু দিশেহারা বোধ করেন। রাতুল তার একমাত্র সন্তান। স্বামী মারা যাবার পর তিনি একাই রাতুলকে লালন পালন করে বড় করেছেন। বেশ কিছু দিন যাবত রাতুলের বিয়ে নিয়ে মা ছেলের মধ্যে ঝামেলা চলছে। আজ রাহেলা বানু পরিষ্কার রাতুলকে জানিয়ে দিয়েছেন নিতুকে বিয়ে করলে তিনি আর রাতুলের সাথে কোন যোগাযোগ রাখবেন না।

: মা, তোমার সাথে একটু কথা বলতে পারি?

বারান্দার প্রবেশ মুখে দাড়িয়ে আছে রাতুল।

রাহেলা বানু কিছু বললেন না। চেয়ার ছেড়ে উঠে বারান্দার কোনায় মানি প্লান্ট গাছটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

রাতুল এসে মায়ের পাশে দাঁড়াল তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল –

: মা, তুমি যা চাইবে তাই হবে। তুমি না চাইলে নিতুর সাথে আমার বিয়ে হবে না।

রাহেলা বানু রাতের আলো আধারিতে রাতুলের চোখে চোখ রাখলেন।

চোখ নামিয়ে রাতুল বলল –

: তুমি যে মেয়েকে পছন্দ করবে তাকেই আমি বিয়ে করব বলে বারান্দা থেকে চলে গেল।

আজকাল রাহেলা বানু ভীষণ ব্যস্ত। দিন রাত একে তাকে ফোন করে ভাল একটা মেয়ের খোঁজ চাইছেন। বিয়ের ব্যাপারে রাতুলের সিদ্ধান্ত পাল্টে যাবার আগেই বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে চাইছেন তিনি।

প্রথম দেখাতেই মৌটুসিকে পছন্দ করে ফেললেন রাহেলা বানু। মেয়েটি দেখতে যেমন মিষ্টি তেমন তার ব্যবহার। জোছনার মতন উজ্জ্বল গায়ের রং আর কাটা কাটা চেহারার ভাজে মৌটুসি যেন সাক্ষাত দেবী। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে এবার বিবিএ কম্পিল্ট করেছে। রাতুলের চেয়ে বয়সে বছর তিনেক ছোট হবে।

মায়ের পছন্দে দ্বিমত করল না রাতুল। বিয়ে হয়ে গেল রাতুল আর মৌটুসির। বিয়েতে ইচ্ছে মতন খরচ করলেন রাহেলা বানু। রাহেলা বানু সিঙ্গেল মাদার হলেও আর্থিকভাব যথেষ্ট স্বচ্ছল। তিনি বাংকে ভাল একটি অবস্থানে চাকুরি করেন। তাছাড়া শশুড় বাড়ি, বাবার বাড়ি দুই পক্ষ থেকেই পৈত্রিক সম্পত্তি পেয়েছেন যথেস্ট।

রাতুলকে নিয়ে মনে মনে রাহেলা বানু চিন্তিত থাকলেও পুরো বিয়ের অনুষ্ঠানে রাতুল স্বাভাবিক ছিল। বিয়েতে আগত অতিথিরা মৌটুসির প্রসংশায় পঞ্চমুখ। সবার মুখে একি কথা যেমন রাতুল হ্যান্ডসাম তেমনি মৌটুসি সুন্দরী। একেবারে সোনায় সোহাগা।

বাসর ঘরে গোলাপ ছড়ানো পালঙ্কে বসে আছে মৌটুসি। রাতুল খুব স্বাভাবিক ভাবে মৌটুসির সাথে কথা শুরু করল। রাতুলের প্রথম কথা –

: আমি যদি তোমাকে “মৌ” বলে ডাকি তাতে কি তোমার কোন আপওি থাকবে?

বিয়ের আগে রাতুলকে মাত্র একদিন দেখেছিল মৌটুসি কিন্তু কোন কথা হয়নি। মৌটুসি মনে মনে কথা বলতে চাইলেও রাতুল মুরব্বিদের জানিয়ে দিয়েছিল কথা বলার প্রযোজন নেই। এটাই রাতুলের সাথে মৌটুসির প্রথম কথা। এত মায়া দিয়ে রাতুল তাকে মৌ বলে ডাকতে চাইল যে ভাল লাগায় মনটা আদ্র হয়ে উঠল মৌটুসির।

: মৌ, তুমি তো জানোই আমি আমার মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার বয়স যখন আট মাস তখন আমার বাবা রোড একসিডেন্টে মারা যান। এরপর আমার দাদা নানা সবাই মাকে আবার বিয়ে দিতে চাইলেও তিনি তা করেননি। আমার মা ই আমার সব। যে কোন মূল্যে মাকে খুশি দেখতে চাই আমি। তুমি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ আমি কি বলতে চাইছি?

মৌটুসি আসতে করে শুধু “হুম” বলল।

খানিকটা বিরতি নিল রাতুল তারপর

: বিয়েতে মা আমাকে একটি পয়সাও খরচ করতে দেননি। কিন্তু আমার নিজেও তো তোমাকে কিছু দিতে ইচ্ছে করে বলে সেরোয়ানীর পকেট থেকে একটি ছোট বক্স বের করল। তোমার হাতটা দাও বলে নিজেই মৌটুসির বাম  হাতটা টেনে নিয়ে অনামিকায় একটি ডাইমন্ডের আংটি পরিয়ে দিল।

বাহ্! অংটিটা দেখি একদম ঠিকমত হয়েছে। আমি একটু চিন্তিত ছিলাম সাইজ নিয়ে! তোমার কি পছন্দ হয়েছে মৌ?

: খুব পছন্দ হয়েছে। ভীষণ পছন্দ হয়েছে।

: মৌ তোমাকে আমার জীবনের একটা জরুরী কথা বলতে চাই। তোমার সাথে কোন মিথ্যা বা কোন কিছু গোপন করে জীবন শুরু করতে চাই না। আর তাছাড়া ব্যাপারটা সবাই জানে। অন্য কারো কাছ থেকে জানার চেয়ে আমার কাছে জানাটাই ভাল মনে করি।

হঠাৎ মৌটুসির বুকটা ধরফর করতে থাকে। কি কথা বলতে চায় রাতুল! হঠাৎ করে রাতুলের মুখটা এত কঠিন আর বিষন্ন দেখাচ্ছে কেন?

: মৌ, আমার একটি অতীত আছে। সেই অতীতে একজন মানুষের বাস ছিল। সেই মানুষটির নাম নিতু। আসলে নিতুকে ছাড়া আমার একটা জীবন হতে পারে সেটি আমি কোন দিন ভাবিনি।

বাসর রাতে স্বামীর মুখ থেকে এমন কিছু শোনা যে কোন নব বধুর জন্যই নরক যন্ত্রনার সামিল। হতবাগ হয়ে রাতুলের দিকে তাকিয়ে রইল মৌটুসি।

: আমি জানি মৌ এমন কথা শোনার জন্য কেউই প্রস্তুত থাকে না কিন্তু

রাতুলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মৌটুসি জানতে চাইল –

: নিতুর সাথে আপনার সম্পর্কটা টিকল না কেন?

কোন ভনিতায় না গিয়ে রাতুল সরাসরি বলল-

: মা চাননি আমি নিতুকে বিয়ে করি।

: কিন্তু কেন?

…… চলবে

 

 

২৩৫জন ২৪জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য