অনেকটা হীরামনের মতন

শামীম চৌধুরী ৭ নভেম্বর ২০২০, শনিবার, ০৮:০৯:১০অপরাহ্ন পরিবেশ ১৯ মন্তব্য
এমনিতে জানুয়ারী মাস। তার উপর শীতের রাত। সে বছর প্রচন্ড শীত পড়েছিল। তাই রাতে ভ্রমন না করে ভোরের বাসে সাতছড়ি রওনা হলাম। দুপুর দেড়টায় হবিগঞ্জের সাতছড়ি পৌছালাম। বনের ভিতর বন বিভাগের ডোরমেটরীতে উঠে রুমে ব্যাগ রেখে হাত মুখ ধুঁয়ে বনের ভিতর রওনা হলাম। বনের প্রবেশদ্বারে হাতের বাঁদিকে যে ছড়া নেমে গেছে তার সঙ্গে লাগোয়া বড় একটি সেগুন গাছের মগডালে পখিগুলি বসে ছিল। জীবনের প্রথম দেখা পাখির ছবি তোলার জন্য উত্তেজিত হয়ে গেলাম। বেশ খানিকটা দূরে থাকায় ছবি তোলার তেমন সুবিধা করতে পারছিলাম না। তাই কিছুটা আগ পিছ করতে করতে হঠাৎ পাখিগুলি উড়ে গেল। এমন একটি পাখির ছবি তুলতে না পারায় মনটা বিষন্নতায় ভরে গেল। ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলে যা হবার তাই হলো। তাই এটা নিয়ে আফসোস না করে টাওয়ারের দিকে রওনা হলাম। আশায় ছিলাম যদি টাওয়ারের আশে পাশে কোন উঁচু গাছে বসে তাহলে মনের মতন ছবি নিতে পারবো। শেষ পর্যন্ত সে আশায় গুড়ে বালি হলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো। টাওয়ার থেকে নেমে পড়লাম। পাখিটির আর দেখা পেলাম না।
 
জানুয়ারী মাসের শেষের দিকে টাওয়ার সংলগ্ন মান্দার গাছে ফুল ফোঁটে। ভোরে হরেক প্রজাতির পাখি সেই ফুলের মধু খাওয়ার লোভে পুরো গাছে ঝেঁকে বসে। খুব ভোরে উঠতে হবে। তাই রাত ৯ টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করে ঘুমাতে গেলাম। ভোর ৫ টায় ঘুম থেকে উঠে সতীর্থকে সঙ্গে করে টাওয়ারের দিকে রওনা হলাম। তখনও ভোরের আলো ফোঁটেনি। আমরা ভোর পৌণে ৬ টায় টাওয়ারে উঠে যার যার মতন ক্যামেরা সেটিংস করে বসে রইলাম। এরই মধ্যে ভীমরাজ, কাক্কু স্রাইক. ময়না, কাঠশালিক সহ নানা প্রজাতির পাখির কলতানে মান্দার গাছ মুখরিত।
 
আমি পাখির উড়াউড়ির দৃশ্য দেখছিলাম। খুব ভাল করে খেয়াল করলাম কাঠশালিকের উপস্থিতিতে অন্য পাখিগুলি মান্দার ফুলে মধুর জন্য বসে না। ঠিক এমন সময় ক্যাঁ… ক্যাঁ… ক্যাঁ… শব্দে বেশ কয়েক প্রজাতির টিয়া এসে মান্দার গাছে বসলো। অন্যান্য টিয়া পাখির সঙ্গে আমার গতকালের না তোলা টিয়া পাখিটিও ছিল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে পাখিটিকে ক্যামেরা বন্দী করলাম। আমি কখনই ভাবতে পারিনি ভোরে মান্দার গাছের ফুলে Blossom-headed parakeet বা কইরিদি টিয়া বা ফুলটুসী বা ফরিয়াদি বা টুই নামের পাখির ছবি তুলতে পারবো।
কইরিদি টিয়া অনেকটা হীরামন টিয়ার মতন দেখতে। এরা সিটাকুলা রোসিয়েটা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ৩০-৩৬সেঃমিঃ দৈর্ঘ্য ও ৮০-৮৫ গ্রাম ওজনের মধ্যমাকারের পাখি। স্ত্রী পুরুষের পালকের রঙে পার্থক্য রয়েছে। পুরুষে মাথা বাদে পুরা দেহ সবুজ পালকে আবৃত। মাথা ফ্যাকাশে বেগুনী লাল যা ঘাড়-গলায় গিয়ে কালো চিকন হয়ে মিশেছে। স্ত্রী পাখির ধূসর মাথাবাদে বাকি দেহের পালক সবুজ। মেয়ে ও পুরুষ পাখির চোখ হলুদ। উভয়ের উপরে চঞ্চু হলুদ ও নীচের অংশ কালো। পা ও পায়ের পাতা সবুজাভ ধূসর। লেজ ও লেজের আগা নীলাভ-সবুজ। লেজের অগ্রভাদ হালকা হলদে বর্ণের হয়। উভয়ের কাঁধে রয়েছে লাল রেখা। হীরামন পাখির মধ্যে এদের মধ্যে মূল প্রার্থক্য হচ্ছে এদের লেজের অগ্রভাগ হলুদ ও মাথা কম লাল।
 
জানুয়ারী থেকে এপ্রিল মাস এদেরে প্রজনন মৌসুম। প্রজননকালে গাছের খোঁড়লে বাসা বানায়। কাঠঠোকরা, বসন্ত বৌরি বা অন্যান্য খোঁড়লিবাসা পাখিদের খোঁড়ল দখল করে নিজেদের মতন বাসা বানায়। নিজেদের বানানো বাসায় মেয়ে পাখি ৪-৫ টি সাদা বর্ণের ডিম পাড়ে। বাসা বানানো থেকে শুরু করে ডিমে তা দেয়া পর্যন্ত সবকিছুই মেয়েপাখিটি একাই করে থাকে। পুরুষ পাখি বাসা পাহাড়া দেয় ও ডিমে তা দেয়া অবস্থায় মেয়েপাখিটির খাবারের জোগাড় করে তা খাইয়ে দেয়। ২০-২২ দিনে ডিম ফুঁটে ছানা বের হয়। এদেরে আয়ুস্কাল ৭-৮ বছর। গুই সাপ ও সাপ ও গিরগিটি এদের ডিম খেয়ে ফেলে। তাই এরা হুমকির মুখে থাকে।
 
কইরিদি টিয়া আমাদের দেশীয় পাখি। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের সবুজ বন ও খুলনার সুন্দরবনে প্রচুর দেখা যায়। এরা সবুজ বনের পাখি। লোকালয়ে আসে না। তাই আমরা সচারচর দেখি না। গাছের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে এরা খাবার খায়। পানির চাহিদা মুলত ফুলের মধু থেকে মিটায়। ইহা ছাড়াও বনের হরেক প্রজাতির রসালো ফলও এদেরে প্রধান খাবার। এক সঙ্গে ঝাঁকে থাকতে পছন্দ করে।
 
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত,নেপাল,শ্রীলংকা,পাকিস্তান,চীন,ইন্দোনেশিয়া সহ সারা বিশ্বে এরা বিস্তৃত রয়েছে। বাংলাদেশের বন্য আইনে এরা সংরক্ষিত।
বাংলা নামঃ কইরিদি টিয়া বা ফুলটুসী টিয়া
ইংরেজী নামঃ Blossom-headed parakeet
বৈজ্ঞানিক নামঃ Psittacula roseata
 
ছবিগুলি হবিগঞ্জের সাতছড়ি বন থেকে তোলা।
১১৯জন ৮জন
0 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য