অনুশোচনা

দালান জাহান ৩ জুন ২০১৯, সোমবার, ০৯:৩০:০৭অপরাহ্ন গল্প ১৫ মন্তব্য

অনুশোচনা

বৃদ্ধটি বটগাছের নিচেই বসে থাকে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা সকল ঋতুতেই । অথচ গত এক বছর আগেও এখানে এমন কেউ ছিলো না। এই বৃদ্ধ এখানে আশার আগেও , এই বটের গুঁড়ি অথবা ডালে লাল নীল ফিতা বেঁধে গেছে কত জানা অজানা মানুষ। কিন্তু বৃদ্ধ আশার পরেই সৃষ্টি হয়েছে যতো বিপত্তি।

যারা মনোবাসনা পূর্ণ হবার আশায় এখানে ফিতা বাঁধতে আসেন তাদেরকে বাঁধা দেন এই বৃদ্ধ । তাদের মধ্যে একজন হলো সৈয়দ সালাম । তার সাথে বেঁধে গেলো বৃদ্ধের বড় বিপত্তি। সালাম সাহেব ফিতা বাঁধতে আসতেই বৃদ্ধ খুব চটে গেলেন । তার মাথার অর্ধ সাদা চুলগুলো আলপিনের মতো দাঁড়িয়ে গেল ।

বৃদ্ধ চোখ লাল করে সৈয়দ সাহেবকে
বললেন , “তুই তো হজ্ব করে এসেই বিয়ে করবি” । “তুই কেন ফিতা বাঁধতে এসেছিস কেন” ? কিন্তু সৈয়দ সাহেবের কাছে এই কথাটা মনোপুত নয়। তিনি কিছুতেই বৃদ্ধের এহেন আচরণ মেনে নিতে পারছেন না। ইতিমধ্যেই সে নানা হয়েছেন ঘরে স্ত্রী আছে যে কি’না সৈয়দ সাহেবের দশ বছরের ছোট আর এখনও সে যতেষ্ঠ যৌবনা ।

ওড়ে এসে জুড়ে বসা বৃদ্ধের এস আজগুবি কথা সৈয়দ সাহেব মেনে নিতে পারলেন না । এই এলাকায় তার একটা আধিপত্য আছে সুনাম আছে । এলাকার দশজন তাকে মান্যগণ্য ও করে । তাই তিনি ঠিক করলেন গ্রামের সবাইকে ডেকে এই বৃদ্ধৃর একটা ব্যবস্থা করতে হবে ।

কথামতো একদিন গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বটের তলে উপস্থিত হলেন । তার মধ্যে একজন ছিলেন কায়সার চৌধূরী নামেও প্রভাবশালী ব্যাক্তি। উপস্থিত লোকজনের মধ্যে মধ্যে কেউ কেউ কটুক্তি করে বললেন , এসব ভণ্ডামি এখন আর চলে না । এসব ধান্দাবাজি বন্ধ করতে হবে।
এরপর সবাই সিদ্ধান্ত নিলেন যে এই ভণ্ড বৃদ্ধকে এখান থেকে তাড়াতে হবে । বৃদ্ধ তখন একা একা হাসছিলেন আর এমনভাবে হাত দিয়ে তার পাকা দাড়িতে আঁচড় দিচ্ছিলেন যেভাবে নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে ।

হঠাৎ বৃদ্ধটি উঠে দাঁড়ালেন এবং উচ্চস্বরে কায়সারকে লক্ষ্যে করে বললেন ,
“আগামী শুক্রবার তোমার মেয়ের বিয়ে হবে” কায়সার উঠে দাঁড়ালেন এবং
বিস্ময়পূর্ণ চোখে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কারন তিনি একজন কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা যার মেয়ের বয়স তেত্রিশ পার হলেও এখনও বিয়ে হচ্ছে না । কিন্তু সে কখনও মেয়ের বিয়ের জন্য ফিতা বাঁধতে আসেনি।

তখন সবাই সিদ্ধান্ত নিল আগামী শুক্রবার মেয়েটার বিয়ে হয় কি’না তা দেখতে হবে । তারপর বৃদ্ধের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে । যদি এই আইভুড়ি মেয়ের বিয়ে হয় তাহলে বৃদ্ধের সব কথা মেনে নিব আর যদি না হয় তখন বৃদ্ধের ব্যবস্থা আছে ।

পরের শুক্রবার হঠাৎ করেই মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলো এক ধনী ব্যবসায়ীর সাথে । কন্যার পিতা আনন্দে আত্মহারা হয়ে বিভিন্ন উপহার নিয়ে বটতলায় হাজির। কিন্তু বৃদ্ধ কোথায় ? তার চিহ্ন ও খোঁজে পাওয়া গেলনা । শুধু বটের নিচে তার বিছানাটা পড়ে আছে। একজন বলে উঠলো কামেল লোক ছিল তাকে তোমরা চিনতে পারলে না।

এই বলে সবাই চলে যাচ্ছিলো ।
তখন হঠাৎ বাতাস ঠেলে সামনের দিকে ভেসে আসলো বৃদ্ধের কণ্ঠ । কায়সার চোখ উপুড় করে উপরে তাকাতেই দেখলো বৃদ্ধ মগডালে উঠে বসে আছেন । কায়সার বৃদ্ধকে নেমে আসার মিনতি জানাল কিন্তু বৃদ্ধ বলল , “আমি তোমার জন্যই এখানে উঠে এসেছি” । “আমি তোমার কোন কিছু গ্রহণ করতে এখানে আসিনি “। ” বরং তোমার কি লাগবে আমার কাছে চাইতে পার “! “তুমি চলে যাও এবং তোমার ছোট ভাইয়ের হক আদায় কর” । “এরপর তোমার হারানো ছেলেও ফিরে আসবে”।

এবার মেয়েটির বাবা তার ভুল বোঝতে পারল । কিন্তু এটাও ভাবলো এতসব সে জানলো কী করে । তার সাথের লোকজন ও একটা রেখা টানলো মনে এবং সমস্বরে বলল হুম কথা ঠিক। এরপর সবাই মিলে সৈয়দ সাহেবকে হজ্বে পাঠালেন । সৈয়দ সাহেব হজ্বে যাবার এক সপ্তাহ পর । তার স্ত্রী মারা গেল । সবাই হতবাক হলো আবার । বৃদ্ধ প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারবেন এমন আশায় লাশ নিয়ে হাজির হলো বৃদ্ধের সামনে ।

সবাই যখন বৃদ্ধের কাছে মৃতের প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করছেন বৃদ্ধ তখন মুখ গম্ভীর করে বসে আছেন । যখন কেউ প্রিয়জন হারানোর শোকে পাথর হয়ে যান তেমনি একটা প্রতিমূর্তি বৃদ্ধের চোখে মুখে ফুটে উঠছে। তারপর বৃদ্ধ তার পুটলা থেকে একটি রক্ত গোলাপ বের করে ছুঁড়ে মারলেন লাশের দিকে। সবাই ভাবলো লাশটা হয়তো এখন জেগে উঠবেন ।

কিন্তু না তেমন কিছু হলো না। বৃদ্ধ বললেন অবাক হবার কিছু নয় আমি কারও প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখি না । জীবিত কালে সৈয়দ সাহেব তার প্রতি
যতেষ্ঠ অনজ্ঞা এবং অবহেলা করেছেন , যে কারনে এই মহিলার মৃত্যু হয়েছে ।
কিন্তু কায়সার চৌধূরীর মনের শান্তি শেষ হয়ে গেল। ফিরে আসতে লাগলো অতীতের কুয়াশামাখা স্মৃতি । যে স্মৃতি শুধু ভিজিয়ে যায় না ভাসিয়েও নিয়ে যায় সর্বনাশা সমুদ্রের মতো ।

ক্রমে ক্রমে কায়সার চৌধূরী ফিরে গেলেন তিরিশ বছর আগে। যখন ছিল তার টগবগে যৌবন। শক্তি এবং ক্ষমতার দাপটে এমন কিছু নেই যে সে করেননি। সবকিছুই এখন তার চোখে বায়ুস্কোপের মতো ভাসছে।
একটা ঝিরঝির ঠাণ্ডা বাতাস তার নাক ভেদ করে চলে গেল পাকস্থলীতে । কায়সার ব্যথায় ছটফট করতে লাগলেন কায়সার অনুভব করলেন বাতাস তো নয় যেন আস্ত একটা মানুষ ফুটবল খেলছেন তার পেটে। কাওসার বমি করলেন বমির সাথে বের হয়ে এলো রক্ত মিশ্রিত কতগুলো কয়েন ।

কায়সার স্বস্তি পেলেন কমেও গেল পেটের ব্যথা। কিন্তু হঠাৎ 130 ডেসিবলের মতো প্রকান্ড শব্দ হলো যেন একটি জেট বিমান তার এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বের হয়ে চলে গেছে। কায়সার আবার নিজের অজান্তেই জ্ঞান হারালেন । যখন জ্ঞান ফিরল তার তখন সে অনুভব করলেন একটা ছায়া তার চারপাশে বৃত্তাকারে ঘুরছে। কানে ভেসে আসছে দৌড়বাজ ঘোড়ার খুঁড়ের শব্দ। কায়সার চোখ কচলিয়ে ভালো করে তাকালেন ।

এখন আরও আরও আশ্চর্য হলেন তিনি ।
জনশূন্য এক জঙ্গলে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
একটি ব্যাঙ নিজের চেয়ে দশগুণ বড় আস্ত একটি সাপকে গিলে ফেলছে। একটি ফুল পলকে পলকে পরিবর্তন হচ্ছে চারটি রঙে।কি সব হচ্ছে আমার সাথে ! লতাপাতায় পরিপূর্ণ এত ঘন জঙ্গল তো এখন কোথাও নেই । ভয়ে অস্থির কায়সারের কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সমগ্র পৃথিবীর সমস্ত ভয়ে ভরা ঘাম।

হঠাৎ একটু দূরে ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন অত্যন্ত অভিমানে ভরা মুখ নিয়ে একটা গাছের গুঁড়ির উপর বসে আছে তার ছোট ভাই । যাকে তিরিশ বছর আগে বাঁশ কাটার কথা বলে নিয়ে এসে সৈয়দ সালাম এবং সে মিলে হত্যা করেছিলেন এমনই এক
ঘন জঙ্গলে। কিন্তু এতদিন পরেও তাকে এত তরুণ লাগছে কেন ? তাহলে সে কি মরেনি ? আর না মরলেও তো তার বয়স বাড়ার কথা !

কায়সার তার ছোট ভাইয়ের দিকে যেতে পা-বাড়াতেই লোকটা হাত তোলে তাকে অগ্রসর হতে মানা করলো এবং স্পষ্টভাবে বললো
“তুমি তো আমাকে মেরে ফেলেছ আমি সেই অবস্থায় আছি “। আমার বয়সের কোন পরিবর্তন হবে না । তুমি আমার কাছে এসো না আর আসলেও আমাকে ছুঁতে পারবে না”। আরও বললেন “কি ভাবছ ভাই ? আমি এখনও যুবক আছি কী করে “? নিজের দিকে তাকাও তুমিও যুবক সেই স্বার্থন্বেসি কায়সার ! কায়সার এবার নিজের শরীরে তাকালেন মুখে হাত দিলেন কিন্তু কোথাও তার বয়সের ছাপ পেলেন না মুখের দাঁড়িগুলো হাওয়া হয়ে গেছে। সমস্ত শরীরে সেই যৌবনের আমেজ।

কায়সার যেন কোনভাবে নিজের থেকে সরে এসেছেন কোথায় থেকে কোথাও চলে এসেছেন কিন্তু কিছুই সে বুঝতে পারছে না । হঠাৎ কোন কিছু পাওয়ার মতো সব ঘটনা মনে পড়ল কায়সারের । একটি মেয়ের কারনে সৈয়দ সালামের ষড়যন্ত্রে সৎ বড় ভাইকে হত্যা করে ঐ মেয়ের সাথে সৈয়দ সালামের বিয়ে দেওয়া এবং ছোট সৎ ভাইয়ের সম্পত্তি গ্রাস করা এবং পরবর্তীতে ছোট ভাইকে নিখোঁজ বলে চালিয়ে দেওয়া। এই সব কিছুই এখন মনে পড়ছে তার ।

তখন তার ছোট ভাই আবার তার দিকে তাকালেন এবং চোখ বড় করে হাসলেন । হাসতে হাসতে ঢুকে গেলেন
ঐ চার রঙা ফুলটির ভেতরে। এদিকে সাপখেকু ব্যাঙটি হামাগুড়ি দিয়ে আসছে কায়সারের দিকে। কায়সার আবারও ভয়ে জ্ঞান হারালেন । যখন জ্ঞান ফিরল তখন তিনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন হাসপাতালের বিছানায়। তার হারানো ছেলেও ফিরে এসেছেন তার স্ত্রী কন্যা কন্যার জামাই সবাই তার দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন। কিন্তু কায়সার কাউকে চিনতে পারছে না । তার স্ত্রী পুত্র আত্মীয়রা আবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। সমস্ত কান্না ঠেলে কায়সার দৃঢ় পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন সেই বটতলার দিকে।

 

দালান জাহান

সখিপুর

 

৫৫৮জন ৪৬১জন
1 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ