অনির্বাণ এর রাত্রিদিন

সাবিনা ইয়াসমিন ২২ ডিসেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার, ০৪:৫৯:৫১পূর্বাহ্ন গল্প ২১ মন্তব্য

– হ্যালো, কে বলছেন?
= আমি অনির্বাণ, কেমন আছিস বন্ধু?

– ভালো, হঠাৎ কি মনে করে কল দিলি?
= একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।
ভাবলাম তোর সাথে আলাপ করি।

– তাই নাকি! কোন ব্যাপারে? সিরিয়াস কিছু?
= হ্যা রে সিরিয়াস ব্যাপার। ভাবছি বিয়ে করবো।

– বেশতো কর, এটাতো ভালো খবর, সিরিয়াস হবার কি আছে!
= রাগশ্রীকে বিয়ে করার কথা ভেবেছি।

– কি! রাগশ্রী!? তোর মাথা ঠিক আছে? অসুখবিসুখ করেনিতো?
= উহু, মাথা একদম ঠিক আছে। অনেক ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

– দাঁড়া,একটু ভাবতে দে। রাগশ্রী! তাই না?
= হু

– ভয়ংকর রাগী,
= রাগ ওর অলংকার
– বদ মেজাজী,
= এটা ওর অহংকার
– কাউকে পাত্তা দেয় না, খুব ভাব নিয়ে চলে,
= ওর ব্যাক্তিত্ব এমনই
– কড়া কড়া কথা বলে, একরোখা স্বভাব,
= হোক, আমার এমনই চাই।

– কিন্তু কেন? ওকে বিয়ে করার মানে হলো স্বেচ্ছায় আগুনে ঝাঁপ দেয়া। পুড়ে মরতে চাস! সামাল দিতে পারবি?

= আলবৎ পারবো।
ও যখন হাসে আমার পৃথিবী ফুলে-ফলে ভরে যায়। সূর্য উঠে সোনা রোঁদ গায়ে মেখে।
ও যখন কথা বলে আমার চারপাশে আনন্দের কোলাহল শুনি, আকাশের রঙ আরও নীল হয়, বাতাসে সুর খেলা করে।
ও যখন নিরব থাকে আমার সবকিছু থমকে যায়, নিস্তব্ধতা গ্রাস করে আমার সারাদিন সারাক্ষণ।
আমি ওকে ভালোবাসি।

– শুভ কামনা রইলো বন্ধু। তোর ভালোবাসা সার্থক হোক, অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আশির্বাদ করি।

 

 

….দেড় বছর পর……

– হ্যালো,কে বলছেন?
= আমি অনির্বাণ।
– কেমন আছিস বন্ধু? বিয়ের পর আর কল দিলি না। কি খবর তোর?

= ভালো নেই। একটা সিদ্ধান্ত নিতে চাই, হেল্প কর প্লিজ।
– সিরিয়াস কিছু?
= রাগশ্রী.. ওর সাথে বনিবনা হচ্ছে না, কি যে করি!

– কেন! কি হয়েছে? ভালোবাসা খতম?
= জানি না। খুব জ্বালায়, লাইফটা তেজপাতা হয়ে যাচ্ছে।

– কি বলিস! খুলে বল!

= তুই তো জানিস আমি খুবই বন্ধুভাবাপন্ন মানুষ ছিলাম। বন্ধু বান্ধবীদের জীবনের বড় একটা অংশে স্থান দিতাম। কিন্তু রাগশ্রী সব উলোটপালোট করে দিয়েছে।

= মানে!

– মানে আর কি! বন্ধু রাখা যাবে কিন্তু বান্ধবী নট এল্যাউ।
সবাইকে আমার বোন বানিয়ে দিয়েছে, তাও সবাইকে দাওয়াত করে বাসায় এনে সামনে দাঁড়িয়ে থেকে। আর যাদেরকে বাসায় আনতে পারেনি তাদের কাছেও পাঠিয়েছে, রাখী বন্ধনের ভিডিও দেখে তারপর নিশ্চিত হয়েছে।

– ওহ, এটা নিয়ে মন খারাপ করিস না,
মেয়েরা একটু হিংসুটে হয়। এরা হাজব্যান্ডের মেয়ে বান্ধবীদের খুব একটা সহ্য করতে পারে না।

= তোর শান্তির কথা মনে আছে অনিরুদ্ধ ?

– হু, তোর এক্স ছিলো। কেন তাকে নিয়েও ঝামেলা হচ্ছে?

= ও আমাকে একটা সোয়েটার গিফট করেছিলো প্রেম করার সময়। এই শীতে নতুন সোয়েটার কিনিনি,
ভাবলাম ওটাই পরি। কিন্তু রাগশ্রী…

– কি করেছে? আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে ফেলেছে?

= না রে,
ফেসবুকে একটা পুরাতন জিনিস বেচাকেনার গ্রুপ আছে, সেখানে বিক্রি করে দিয়েছে। আমি শুধু বললাম বিক্রি করলে কেন,কোন অসহায়কে দিয়ে দিতে,

– ও কি বললো!?

= বললো তোমার চাইতে অসহায় আর কে আছে! লজ্জা করে না শীতের ঠ্যালায় প্রাক্তন প্রেমিকার দেয়া সোয়েটার পরো? বেশি বকবক করলে তোমাকেও পুরনো জিনিসের গ্রুপে বিক্রি করে দিবো।

– আহারে, সো স্যাড।
কিন্তু কি করবি বল,বউ গুলো এমনই হয়। তা এতো রাতে কল দিলি, কিছু খেয়েছিস? ঘুমাবি কখন?

= আর ঘুম।
ঘুম,খাওয়া দাওয়া আমার কপাল থেকে উঠে গেছে বন্ধু..

– কি বলিস! খাওয়া দাওয়া কপাল থেকে উঠে গেছে মানে? রাগশ্রী রান্নাবান্না করে না?

= সে আর বলতে!
ও অনেক বেশি বেশি খেতে দিতো। চারজন মানুষের খাবার দিয়ে বলতো সব খেয়ে নিতে। মাঝে মাঝে খাওয়ার পর আমার দম বন্ধ হয়ে আসতো, তবুও খেতাম। এতো খেয়ে আমি দিনদিন মটু হয়ে যাচ্ছিলাম।

– তারপর?

= তারপর একদিন ও শিং মাছের ঝোল রান্না করেছিলো, অনেক ঝাল দিয়ে। আমি খুবই নম্র ভাষায় ওকে বললাম এত ঝাল আমি খেতে পারি না। আমাকে ডাল দাও। ডাল দিয়ে খাই। তোমার হাতের ডাল আর খিচুড়ি আমার ভীষণ প্রিয়।

– বলতে থাক,

= ও কোন কথা না বলে সোজা রান্নাঘরে গেলো। কিছুক্ষণ পর দুমদাম শব্দ শুনে আমি দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি তরকারি রান্নার সব গুলো হাড়ি-পাতিল শীলপুতো দিয়ে আচ্ছামতো চ্যাপটা করছে আর ডাস্টবিনে রাখছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম এগুলোর এই অবস্থা কেন করছো! রান্না করবে কি’সে?

– কি উত্তর দিলো!

= বললো এখন থেকে শুধু ডাল রাধবো, অথবা খিচুড়ি। এতোগুলো হাড়ির দরকার নেই।
সেই থেকে নাস্তা, লাঞ্চ, ডিনারে এগুলোই খাই। অফিসে থাকলে অবশ্য অন্যকিছু খেতে পারি। কিন্তু বাড়ি এলেই….। আমার ওজন দ্রুতই কমে যাচ্ছে দোস্ত।

– শোন অনির্বাণ আমি বুঝতে পারছি তোর উপর দিয়ে কি ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ভাবিস না, আমি যেহেতু আছি তোর জন্য একটা উপায় বের করবোই। এক কাজ কর, তুই রাগশ্রীকে ডিভোর্স দিয়ে দে। না থাকবে বাশ, না বাজবে বাশরী।

= রাইট, আমিও এই সিদ্ধান্ত নিতে চাই। এই জন্যেই তোর কাছে কল দিয়েছি।

– ওকে, তাহলে এটাই ফাইনাল। তুই কাল কোর্টে আয়, সব ব্যবস্থা করে দিবো।

 

…পরদিন…

– অনিরুদ্ধ
= হু?

– রাগশ্রী খুব ইমোশনাল
= তো?

– ও আমার খুব খেয়াল রাখে। এক মিনিটের জন্যেও আমার কাছে থেকে দূরে থাকে না।
= কিন্তু রাগশ্রী খুব রাগী। সে তোর লাইফ এলোমেলো করে দিয়েছে।

– না রে, আমিই এলোমেলো ছিলাম। ও আমাকে গুছিয়ে রাখে।

= তাহলে ডিভোর্স দিবি না? শাসনে রাখতে পারবি?

– উহু, শাসনে না, বুক দিয়ে আগলে রাখবো। ঐ পাগলীটা আছে বলেই আমি ভালোবাসতে শিখেছি।

= বেশ তাহলে বাড়ি যা। আমার সময় নষ্ট করার জন্য  এবারের মতো মাফ করে দিলাম। ভালো থাকিস তোর রাগশ্রীর ভালোবাসায়।

– ধন্যবাদ বন্ধু।

– অনিরুদ্ধ, আরেকটা কথা..
= কি?

– রাগশ্রী বলেছে তোর সাথে আর না মিশতে। কথা বলতেও নিষেধ করেছে। কি যে করি, একটা আইডিয়া দে দোস্ত। আর শোন আমি বাসায় থাকলে তুই কিন্তু কল দিস না, তাহলে রাগশ্রী..

– অনির্বাণ!// 😡😡

 

#চলবে.
*ছবি- নেট থেকে নেয়া।

৪৯১জন ২৭৯জন
137 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য