অনন্ত অপেক্ষার জগতে

বন্দনা কবীর ৯ জুলাই ২০১৫, বৃহস্পতিবার, ০৭:৫৮:২৯অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১৩ মন্তব্য

11714395_683597431745338_649782752_n11111

বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে বৃদ্ধাশ্রমটি। খোলামেলা – প্রচুর গাছগাছালি, পুকু্‌র – পার্কের মতন ছিমছাম করে গোছানো। গেট পেরিয়ে পার্কটায় ঢুকতে ঢুকতে যে কারোরই মন জুড়িয়ে যাবে। জায়গাটা বেড়ানো কিংবা পিকনিক করতে যাবার জন্য চমৎকার একটা জায়গা হতে পারতো। কিন্তু …
কী অদ্ভুত রকম বিষন্ন ! মৃত বাড়িতেও কিছু শোরগোল থাকে। এখানে তাও নেই। অথচ একটু কান পাতলে ঠিকই শোনা যায় বারান্দায় সেট করা সার সার বেঞ্চ ভরে বসে থাকা অসংখ্য অসহায় মা-বাবার গোপন কান্নার কলরব।
কী অসহ্য অসহায়তা এক জনের চোখ-মুখে ! ওই সব মুখের একটি মুখ এর দিকে তাকালেই যেখানে কলজে ফেটে যায় সেখানে প্রায় শ দুয়েক মুখ দেখার জন্য কলিজা জানিনা কী করে হলো আমাদের !
দেখে তো এলাম। কথাও বললাম। তাঁরা কাদলেন, গুমরে উঠলে্‌ চোখ মুছে ফের হাসলেনও। জড়িয়ে ধরে গালে মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন… আঙ্গুলগুলোর স্পর্শ স্পষ্ট বলে দিচ্ছিলো কতকাল নিজের সন্তানকে আদর করতে না পারার আকুলতায় অস্থির হয়ে আছে।
———–
দল বেঁধে গিয়েছিলাম আমরা প্রায় ৩৮/৪০ জন। জনা দশেক বাদে বেশিরভাগই একেবারে বাচ্চা ছেলে-মেয়ে। টগবগে উদ্যমি হাস্যজ্জ্বল প্রত্যেকটা মুখ ওখানকার মানুষগুলোকে দেখার সাথে সাথেই মনে হলো কেমন মলিন হয়ে গেলো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোনও এক প্রতারিত বাবার গল্প শুনতে শুনতে চোয়াল শক্তও হলো। চোখে জমা হতে দেখলাম অজানা অচেনা কারোর সন্তানের প্রতি তীব্র ঘৃনা।
” কী করে মানুষ এতো পাষন্ড হয়?! আপন মা-বাবাকে কেউ এইভাবে ফেলে রেখে কী করে নিজেরা সুখে থাকে?!”
কোনও কোনও অভাগী অভিমানি মায়ের চোখের জল মুছতে গিয়ে মেয়েদের কেউ কেউ নিজেই কেঁদে ফেললো। জানি সবারই মনে অজস্র অভিযোগ কিন্তু একটি মা’কে পেলাম না, যে তার সন্তানের খারাপ চাইলেন অথবা চাইলেন তাঁদের ছেলেমেয়েরাও বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের মতনই এরকম জীবনে এসে পড়ুক।

ওঁদের দেখছিলাম আর মাথায় ঘুরছিলো নচিকেতার বিখ্যাত এক গা্ন ‘বৃদ্ধাশ্রম’ এর শেষ প্যারাটা…
”খোকারও হয়েছে ছেলে দুবছর হলো
আর তো মাত্র বছর পঁচিশ ঠাকুর মুখ তোলো,
একশো বছর বাঁচতে চাই এখন আমার সাধ
পঁচিশ বছর হলেই খোকার হবে উনষাট ।
আশ্রমের এই ঘরটা ছোট জায়গা অনেক বেশি
খোকা-আমি দুজনেতে থাকবো পাশাপাশি
সেই দিনটার স্বপ্ন দেখি ভীষন রকম
মুখোমুখি আমি খোকা আর বৃদ্ধাশ্রম ”
জানিনা, গানটা কে লিখেছিলেন। যেইই লিখে থাকুন না কেন, বড় ভুল লিখেছিলেন একজন মায়ের ভাষ্যে। খোকা খুকু মা’কে যত কষ্টেই রাখুক না কেন কোনো মা কি এমন প্রার্থনা করতে পারেন আপন গর্ভজাত সন্তানের জন্য?! কখোনোই নয়। কিন্তু আমরা যারা বহিরাগত, বাইরের মানুষ এঁদের যন্ত্রনা ক্লিষ্ট শীর্ণ মুখ দেখি আমাদের মনে ঠিকই এই কথাগুলো চলে আসে। মন থেকে অজান্তেই অভিশাপ বের হয়ে আসে এমন পাষন্ড সন্তানের জন্য, যারা নিজেদের একটু বাড়তি সুখ সুবিধে বা একটু অসুবিধার জন্য বাবা মা’কে কোনও বয়ষ্ক পূনর্বাসন কেন্দ্রে ফেলে রেখে আসে! অথবা বাবা-মায়েরা বাধ্য হন গায়ের রক্ত জল করে তিল তিল করে গড়ে তোলা সংসার ফেলে আশ্রমে ঠাঁই নিতে!
——————-
আমরা যারা সুখে থাকি, তাদের অনেকেই সংসারের বড় বড় ঝামেলায় বিরক্ত হয়ে বলি, ‘বুড়ো হলে বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে থাকবো। শান্তিতে থাকবো তাও’
খোদার কসম, ওখানে কেউ শান্তিতে নেই। থাকতে পারে না। থাকা যায়ও না। চাইনা কোনও শত্রুরও অমন জায়গায় ঠাঁই হোক শেষ বয়সে। অপরিচিত একশো সঙ্গির বদলে আপন একজন কেউ হলেও তার হাত ধরে থাকুক মৃত্যু অবধি।

৩৯৭জন ৩৯৭জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ