সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

অধরা প্রেম

সুপর্ণা ফাল্গুনী ৩১ মে ২০২০, রবিবার, ০৪:৫৯:৪৬অপরাহ্ন গল্প ১৭ মন্তব্য

আজ সুতপার মনে পড়ছে যারা তাকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চেয়েছিল তাদের কথা। তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত, সুদর্শন , সুপুরুষ ছিল। কিন্তু রাজীবকে ভালোবাসতে গিয়ে তাদের সবাইকে হেয় করেছে বলা যায় রাজীবের প্রতি গভীর ভালোবাসা, অন্ধবিশ্বাস থেকে তার এই আচরণ। কিন্তু রাজীব কথা দিয়েও কথা রাখেনি। তার নাট্যগ্রুপের একজনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সুতপা কখনো ‘ভালোবাসা’ নামক বস্তুকে অদৃশ্য কারণে পছন্দ করতো না। সে সবসময় চাইতো তার বাবা-মায়ের মতে, সামাজিক বিয়ে করতে। কিন্তু বিধির কি বিধান! তা-কি কেউ পাল্টাতে পারে? সুতপা ও পারেনি তাই নিজের প্রথম ভালোলাগাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো নিষ্ঠুর ভাবে, শুধুমাত্র বাবা-মা চায়নি বলে।

ছেলেটি সুতপার চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড় ছিলো; শিক্ষিত, সুদর্শন তপনকে সুতপার মনে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গেল স্কুল জীবনেই। প্রথমে ভেবেছিলো মা ছেলেটিকে পছন্দ করেছে, কারন মা-ই বলাবলি করছিলো জামাই বলে। তার উচ্ছাস দেখেই সে তপনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে চিঠি লিখতো। ছেলেটি কয়েকবার বাসাতেও এসেছিল। মা তাকে যত্নআত্তি করতো ভালোই। একদিন তপনের লেখা একটি চিঠি ধরা পড়ে মায়ের কাছে। সে-কি রাগ মায়ের। সেই ঘটনা জানিয়ে তপনকে সে সব জানায়। বছরখানেক পরে সুতপার এস.এস.সি পরীক্ষা, খুব কড়াকড়ি শাসনে বন্দী হয়ে যায় সে। যাইহোক পরীক্ষা ভালোভাবে শেষ করলো, ভালো রেজাল্ট ও করলো। তপনের পাঠানো ঠিকানায় মিষ্টি নিয়ে গেল ওর এক বয়সে বড় কাজিনকে সাথে নিয়ে। সাথে একটি চিঠি ও লিখে রেখে আসলো রেজাল্ট এর কথা জানিয়ে। আর লিখলো বাবা-মায়ের অমতে সে তাকে বিয়ে করতে পারবেনা , তাই সে যেন আর কখনো তার সাথে কোনোরকম যোগাযোগ না করে।

এর কিছুদিন পরেই রাজীবের প্রস্তাব, রাজীব তাদের আত্নীয় হতো। সে সরাসরি বলে দিলো তার বাবা-মাকে , রাজীবের বাবা-মাকে সে যদি রাজী করাতে পারে তার কোন আপত্তি নেই এ সম্পর্কে। রাজীব তখন মাত্র অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তাই সে সুতপাকে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে বললো, ততোদিনে সে নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে -তখন দু’ ফ্যামিলিকে রাজি করাতে সমস্যা হবেনা। সুতপা রাজি হলো এবং সে অপেক্ষা করবে বলে জানালো । সুতপা ভালোবাসার প্রেমে পড়ে গেল। তখন সে বুঝলো ‘ভালোবাসা হলো স্বর্গ’। ভালোবাসাতে-ই আসল সুখ। কিন্তু সম্পর্কের বছরখানেক পড়েই রাজীব অন্যরকম আচরণ করতে লাগলো। সুতপাকে এড়িয়ে যেতে লাগলো। সুতপা এই প্রথম বুঝলো ভালোবাসার আঘাত , অনুভব করতে পারলো ভালোবেসে কেন মানুষ নিজের জীবন তুচ্ছ মনে করে; চারপাশের সবকিছু অচেনা আর অসহ্য হয়ে উঠে! তখন সে তপনকে আঘাত দেয়ার কথা বুঝতে পারলো। সুতপা নিজেকে বুঝ দেয়- তার বয়স অল্প ছিলো, একটা মোহ কাজ করছিলো তপনের প্রতি। কিন্তু এখন সে-তো নিজেকে মানাতে পারছে না। তার একমাত্র ভালোবাসা সেটা হলো এই রাজীব। যার জন্য সে নিজের জীবন দিতে পারে। হ্যাঁ সুতপা তা-ই করতে গেল। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলো। সব জেনেও রাজীব বদলালো না। হিতে বিপরীত হয়ে গেল। সবার মাঝে ছড়িয়ে গেলো তাদের ভালোবাসার কথা। আত্নীয়তার মধ্যে মন-কষাকষি হলো। তবুও সুতপা রাজীবের অপেক্ষায় রইলো। তার বিশ্বাস ছিলো রাজীব স্বাবলম্বী হলেই তার কাছে ফিরে আসবে ; কারন এখনো ওর বেঁধে দেয়া সময় ফুরিয়ে যায়নি।

এরমধ্যে অনেকেই তাদের দুর্বলতার কথা জানিয়েছে বা আকার -ইঙ্গিতে বোঝাতে চেয়েছে ‘সুতপাকে’ তারা চায়। কিন্তু সুতপার ঐ এক কথা, এক গোয়ার্তুমি – সে রাজীবের জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করবে, সে তার ভালোবাসাকে মর্যাদা দিবেই। পাঁচ বছর পর- এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গেল সুতপা । কারন সেখানে রাজীব ও যাবে সেটা সে জানতে পেরেছিলো। ততোদিনে রাজীব ও ভালো জব করছে, পরিবারকেও সাহায্য করছে। একটা ক্ষীণ আশার আলো দেখতে পেলো – সুতপা। ভেবেছিলো রাজীবের সাথে সুযোগ বুঝে ওদের বিষয়টা নিয়ে কথা বলবে। কিন্তু ওর সব আশাকে ভুল প্রমাণ করে দিলো। ঐযে ওর সাথে সাথে একটা মেয়ে সবসময় জোঁকের মতো লেগে আছে ! সে-ই হলো ওর গ্রুপের সাথী। রাজীব সুতপাকে ডাকলো। সুতপা আর সে-ই মেয়েটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। একদিন সুতপা রাজীবের অফিসে ফোন করেছিলো, টেলিফোন অপারেটর ভুল করে সেই মেয়েটির নাম বলেছিল। সেই সূত্রপাতে ওর নাম জেনে ফেলেছিলো সুতপা। সুতপা হাসিমুখে মেয়েটিকে ‘হাই’ বললো। মেয়েটিও ‘হ্যালো’ বলে করমর্দন করলো। সুতপা কাউকে কিছু বুঝতে দিলো না। ওর ভিতরে যে মহাপ্রলয়ের তান্ডবলীলা চলছে। সুতপা কিছুতেই রাজীবকে একান্তে পাচ্ছিলো না। না-কি রাজীব ইচ্ছা করেই এমনটা করছে সুতপার সাথে? অ-নে-ক প্রশ্ন, কষ্ট ওর মনে বাড়ি খাচ্ছে। সুতপা বাড়ি ফিরে এলো, বিয়ে পরবর্তী অনুষ্ঠানে আর যায়নি সে। ওর মা-কে পাঠালো। সুতপা অনার্স ফাইনাল দিলো।

আজ প্রায় দু’বছর , আর কোনো যোগাযোগ করেনি রাজীবের সাথে। হঠাৎ ওর ছোট মামা একটা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলো। ওর মা সুতপাকে ডাকলো, সুতপা ‘আসছি’ বলে কিছুক্ষণ পরে এলো। বলো মা , কি বলবে? মা বললো, একজন দেখতে আসবে তোমাকে । তুমি একটু সাজো। সুতপা বললো, তুমি কি বলছো? আমি বিয়ে করবো না। মা জানতে চাইল, কেন? সে বললো, আমার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব নয়, তুমি মানা করে দাও। মা বললো , তুমি শুধু সামনে যাবে, তারপর চলে আসবে। আর কিছু তোমাকে করতে হবেনা। ওদের কিছু বুঝতে দেয়া যাবে না। সুতপা চুপ মেরে গেলো। তখনি ওর রুমে চলে আসলো। সুতপা কিছুতেই রাজীবকে ছাড়া অন্যকারো ঘর করার কথা ভাবতে পারছিলো না। কি করবে , এখন সে? মা বুঝতে পারলো ওর অবস্থা । সে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো, বললো আর কখনো তাকে বিয়ের কথা বলবে না। এইবারের মত তুমি সামনে যাও। আচ্ছা মা, সুতপা বললো। অনার্সের রেজাল্ট দিলো। রেজাল্ট মোটামুটি পাশ এসেছে। সুতপার সমস্ত আশা দূরাশা হয়ে গেল। একটা ভালো রেজাল্ট হলে রাজীবকে সে চ্যালেঞ্জ দিতে পারতো। সে এখনো রাজীবের উপর বিশ্বাস রেখেছে। কিন্তু রাজীব আজো অধরা-ই রয়ে গেলো।

৩৯৯জন ২৭০জন
15 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ