অদ্ভুত আঁধার এক – ৫

রিমি রুম্মান ৫ মে ২০২০, মঙ্গলবার, ১২:১০:০২অপরাহ্ন সমসাময়িক ২১ মন্তব্য

নিউইয়র্কে লকডাউনের ষষ্ঠ সপ্তাহ চলছে। মানুষের সঞ্চিত খাবার ফুরিয়ে এসেছে। মানুষ খাবারের সন্ধানে বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। অনেকদিন পর পর আমরা যখন জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাই, কাজ শেষ হলেও অকারণে চেনা পথে, চেনা স্থানে গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াই। আমরা আগের যে কোন সময়ের মতো প্রবলবেগে গাড়ি চালাই না। ধীর গতিতে এ পথ ও পথ ঘুরি। চারপাশটা দেখি। অদ্ভুত এক ভালোলাগার অনুভূতি হয়। যেন কতোকাল বন্ধি জীবন যাপন করছি ! কতোকাল পর মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিয়েছি ! কতোকাল মানুষ দেখিনি ! বড় বড় সড়ক এখনো বলা চলে অনেকটাই ফাঁকা। মাঝে মধ্যে ২/১ টি গাড়ি ধীর গতিতে চলে যেতে দেখি। তাড়া নেই কারো কোথাও যাবার। তবুও জীবন তো থেমে থাকার নয়। জীবন বাঁচাতে জীবিকার প্রয়োজন। মানুষজন এখন জেনে গেছে, করোনা ভাইরাসকে মোকাবেলা করে, যথাযথ সচেতনতা অবলম্বন করেই জীবনে ফিরতে হবে সকলকে। আর তাই শ্লথ হয়ে থাকা জীবন থেকে মানুষ একটু একটু করে বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

আমরা যেহেতু খুব বেশি খাবার মজুদ করে রাখিনি, তাই সপ্তাহ দুই পর পর অন্তত একবার বের হতে হচ্ছে। মানুষের ভিড় এড়াবার উদ্দেশ্যে তুমুল বৃষ্টির সময়কে বেছে নেই বের হতে। তাছাড়া রোজার দিন। দিনভর অনাহারে থাকা মানুষেরা ইফতারের ঠিক আগের সময়টা বাইরে বের হবার কথা নয়। এমনতর নানান হিসেব নিকেশ করে বের হয়েছিলাম প্রথম রমজানের দিনে। কেননা মানুষের সংস্পর্শের বাইরে অপেক্ষাকৃত কম কোলাহলের মাঝে কেনাকাটা সেরে বাড়ি ফিরতে হবে যে ! প্রথমে হোলসেল স্টোরে গিয়েছিলাম। সেখানে তাদের নিজস্ব বিশাল পার্কিং লট ছাড়িয়ে অপেক্ষমান ক্রেতাদের লাইন বাইরে ফুটপাতে অনেকদূর পর্যন্ত চলে গিয়েছে। বিধায় সেখান থেকে কেনাকাটা না করেই ফিরে এসেছি। ইন্ডিয়ান গ্রোসারির একটিতে মানুষের লাইন দেখে ওমুখো হইনি আর। অন্যটিতে স্বল্প সংখ্যক মানুষের লাইন চোখে পড়ে। ঝটপট নেমে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ি। বিশাল স্টোরের বাইরে থেকে কাঁচের দেয়ালে ভেতরের দিকে তাকিয়ে দেখি মানুষজন সংখ্যায় খুবই সামান্য। ক্যাশ রেজিস্টারগুলোতে লাইন নেই। ভেতরের মানুষেরা বেরিয়ে এলে তবেই ১০/১২ জন করে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সকল নিয়ম মেনেই কাজ করে যাচ্ছে। দোকানের বাইরে অনেকদিন পর বন্ধু ফারহানার সাথে দেখা। দূরত্ব বজায় রেখে কথা হচ্ছিল আমাদের। বললেন, আগে কাজের চাপে অতিষ্ঠ ছিল জীবন। মনে হতো কবে একটু সময় হবে বিশ্রাম নেবার, কিংবা মন মতো ঘুমাবার। এখন অফুরন্ত সময়। অখণ্ড অবসর। কিন্তু হারিয়ে গেছে জীবনের ছন্দ। হারিয়ে গেছে রুটিন স্বাস্থ্যকর জীবন। কাজ নেই, ভোরে উঠার তাগিদ নেই। তাই ঘুমাবারও তাড়া নেই। ক্লান্তিহীনতায় ঘুমহীনতা জেঁকে বসেছে। খাওয়াসহ দৈনন্দিন স্বাভাবিক কর্মময় জীবনে এসেছে অনিয়ম আর আলস্য।

ফোনে কথা হচ্ছিলো আমার পুরনো এক সহকর্মীর সাথে। সময় কাটছে কেমন করে এমন প্রশ্নের জবাবে বললেন, টেনশন কাটাতে পুরনোদিনের সিনেমা দেখা, বই পড়া, গান শোনা হচ্ছে। ইউটিউব দেখে নতুন নতুন রান্না শিখছেন। জীবনসঙ্গীর সাথে দৈনন্দিন কাজ ভাগাভাগি বিষয়ে বিবাদ বেড়েছে। মানসিক চাপ বেড়েছে। জীবন হয়ে উঠেছে নিরানন্দের। শেষে দীর্ঘশ্বাসের সাথে বললেন, জীবনের কঠিন এই সময়ে কভিড-১৯ শুধু শারীরিকভাবেই নয়, আমাদের মনোজগতকেও আক্রান্ত করে ছেড়েছে।

আগে বিকেলগুলোতে বেলকণিতে বসে রোজ প্রতিবেশিদের আসা-যাওয়া দেখতাম। কেউ পালিত কুকুর নিয়ে লনে খেলা করতো, কেউবা আসা যাওয়ার পথে একলা হেঁটে চলা বিড়ালের মাথায় হাত বুলিয়ে এমনভাবে আদর করত যেনো কোনো পুতুলকে আদর করছে। সবচেয়ে বেশি দেখা যেতো প্রতিবেশি চাংপুকে। বয়স সত্তরের কোঠা পেরিয়েছে নিশ্চিত। কর্মঠ শরীর। কিন্তু দুইমাস হলো বয়সের ভারে আংশিক কুঁজো হয়ে হেঁটে যাওয়া চাংপুকে দেখা যাচ্ছে না। বারান্দায় গেলে কোন এক অজানা আশায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই। লনে কেউ আসা-যাওয়া করলে জিরাফের মতো গলা বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করি। গ্যারাজে টুংটাং আওয়াজ শুনলে এগিয়ে যাই। কোথাও দেখা নেই তার। শঙ্কা হয়, বেঁচে আছে তো ! নিজেকে নিজেই প্রবোধ দেই, ‘ এইদিকে তো কোন এ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনিনি’।

আমাদের পরিচিত এক বড়ভাই ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে একুশ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। লড়াই শেষে আংশিক সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন অবশেষে। দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি এখনো। তার ধারণা, অন্য অনেকের মতো তিনিও মার্চের মাঝামাঝিতে হুমড়ি খেয়ে বাজার করেছিলেন জনস্রোতের মাঝে। আর সেখান থেকেই ভাইরাসটি বহন করে নিয়ে এসেছেন। আমার ভেতরটা কেঁপে উঠে শঙ্কায়। কেননা, এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভিড় ঠেলে আমিও যে গিয়েছিলাম গ্রোসারি স্টোরে সেইসময় ! প্রতিদিন অনলাইন নিউজে ভাইরাস সম্পর্কে আরো বিশদ জানার চেষ্টা করছি। যেহেতু হাঁচি,কাশির মাধ্যমে মানুষের শরীরের কোষের সংস্পর্শে এটি বংশ বিস্তার করে, তাই কোথাও কেউ হাঁচি দিলেই ফিরে তাকাই। মনে হয় যেন তার হাঁচি/কাশির সাথে বেরিয়ে আসা ড্রপলেট বাতাসে ভেসে এটম বোমের মতো ধেয়ে আসছে আমার দিকে সংক্রমন ছড়াতে। জানি এইসব ভয়, আতঙ্ক সাময়িক। আমরা হয়তো সহসাই ভয়কে জয় করে অভ্যস্ত হয়ে উঠবো নতুন এক জীবন যাপনে।

ওয়াশিংটন স্টেটের সিয়াটল শহরে ২১শে জানুয়ারি প্রথম করোনাভাইরাস সনাক্ত হবার পর এখন পরিবর্তিত পৃথিবী সম্পূর্ণ নতুন এক পৃথিবী। যেখানে মানুষ একে অপরের কাছ হতে দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করছে। তারা জেনে গেছে, আগের মত ভিড়ভাট্‌টা ঠেলে কোথাও যাওয়া যাবে না। চেনা কারো সাথে দেখা হলেই হাত মেলানো যাবে না। আবেগে জড়িয়ে ধরা যাবে না। দূরত্ব বজায় রেখেই কুশল বিনিময় করতে হবে। বাইরে গেলে মাস্ক, গ্লভস ব্যবহার করতে হবে। এভাবে ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে হবে। দুইমাস আগের আর পরের পৃথিবীর মাঝে বিস্তর ফারাক। নতুন এক পৃথিবীতে পদার্পণ করতে যাচ্ছে পৃথিবীর সকল মানুষ।

রিমি রুম্মান
কুইন্স, নিউইয়র্ক
ছবি: আমার তোলা সোনেলার এই লেখার জন্যই।
১২৭জন ১৫জন
29 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য