অদ্ভুত আঁধার এক – ৩

রিমি রুম্মান ৪ এপ্রিল ২০২০, শনিবার, ০১:২০:৩৬অপরাহ্ন সমসাময়িক ১৭ মন্তব্য
বাইরে বেরুনোটা খুব বেশি জরুরি ছিল না। জরুরি ছিল ফার্মেসী থেকে ওষুধের রিফিল আনা। পরিবারের সদস্যদের সবার ওষুধের রিফিল আনার সময় ভিন্ন। একমাসের ওষুধ মাস না ফুরালে আনা যায় না জানি। তবুও এই কঠিন সময়ে নিয়ম কানুন কিছুটা শিথিল হলে হতেও পারে, সেই আশায় ফার্মেসীতে ফোন করে অনুরোধ করি। বলি, দেখো বারবার বাইরে যাওয়াটা যেহেতু ঝুঁকিপূর্ণ,তাই তুমি কি আমার ওষুধের সাথে শাশুড়ির আগামী মাসের ওষুধগুলো দিতে পারবে ? মেয়েটি খুব দুঃখিত স্বরে জানায়, এটা সম্ভব নয়। অগত্যা শুধুমাত্র নিজের ওষুধ আনার জন্যে আমাকে বাসার বাইরে যেতে হচ্ছে লকডাউনের দশম দিনে। বাসা থেকে হাঁটা পথের দূরত্বে ফার্মেসী। তবুও নিরব নিস্তব্দ এই পথটুকু যেনো বহুদূরের পথ। দীর্ঘ পথ। গাড়ি নিয়ে বের হই আমরা স্বামী-স্ত্রী দু’জন। করোনা এভিনিউ ধরে কিছুটা পথ যেতেই বর দীর্ঘশ্বাস নিতে নিতে বললেন, ‘ ইস, কী যে ভালো লাগছে!’ ভেবেছিলাম সদা ব্যস্ত কোলাহলমুখর সড়কে কোন যানবাহন নেই বলে ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালাতে ভালো লাগছে তার। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমান করে বললেন, ‘ কতোদিন পর বাইরের আলো বাতাসে বের হলাম, কতোদিন পর খোলা আকাশের নিচে বুক ভরে শ্বাস নিলাম!’ হিসেব করে দেখলাম এক সপ্তাহ পর বাইরে বের হয়েছি আমরা। এই এক সপ্তাহেই আমাদের দম বন্ধ হয়ে যাবার দশা! যাক্‌, ফার্মেসীর ভেতরে গিয়ে ভয় কেটে যায় অনেকটাই। কোন লোকজন নেই। ওষুধ সহ টুকটাক নিত্য ব্যবহার্য জিনিষ নিয়ে ফেরার সময়টাতে আরো দুইজন শ্বেতাঙ্গ ক্রেতা এলো। ছয় ফুট দূরত্বে মেঝেতে হলুদ রং এর ক্রস চিহ্ন আঁকা। দুইজন দুটি ক্রস চিহ্নের উপর লাইনে দাঁড়ালেন। সচেতনতামূলক এই বিষয়টি দেখে মন ভালো হয়ে যায়।
পাশের সুপার শপে যাই পাউরুটি সহ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিষ কিনতে। কিছু পেয়েছি, কিছু পাইনি। ক্যাশ কাউন্টারের সামনে সকলেই কিছুটা দূরত্ব রক্ষা করে লাইনে দাঁড়িয়েছে বিল পরিশোধের উদ্দেশ্যে। ক্যাশ রেজিস্টারের টুট টুট শব্দ ছাড়া বলা চলে একেবারে পিন পতন নিরবতা সেখানে। এমন সুনসান নিস্তব্দতার বুক চিরে আচমকা লাইনে অপেক্ষমান একজন হাঁচি দিলেন। সকলেই ঘাড় ঘুরিয়ে আড় চোখে সেদিকে তাকালেন। মাস্কের আড়ালে ঢাকা মুখগুলোর কপাল কুঁচকে আসে বিরক্তিতে। যেনো হাঁচি দেয়া একটি কঠিন অপরাধ। কেউই আর অন্যসময়ের মতো করে ‘ব্লেস ইউ’ বললেন না। মৃত্যু আতংকে আমরা কী আমাদের স্বাভাবিক ভদ্রতাটুকুও হারাতে বসেছি ? পার্কিং লটের দিকে যেতে যেতে মনে হলো বাইরে যেহেতু এসেছিই, তবে না হয় কিছু ফলমূল, সবজি সহ দরকারি জিনিষ নিয়ে বাড়ি ফিরি। কেননা, এ কয়দিনে অনেক কিছুই ফুরিয়ে এসেছে। তাছাড়া বিভিন্ন নিউজে বারবার সতর্ক করে বলা হচ্ছিল এপ্রিল মাসটা পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে। বাইরে বেরুনোটা বড় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
যেই ভাবা, সেই কাজ। চায়নিজ সুপার শপের পার্কিং লটে ঢুকতেই বাইরে বিশাল লাইন চোখে পড়ে। ভেবেছি গাড়ি ঘুরিয়ে অন্যকোন সুপার শপে যাবো। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে বুঝলাম এটি ভিড়ের জন্যে অপেক্ষমান লাইন নয়। প্রতিটি ক্রেতাকে হ্যান্ড গ্লভস আর মাস্ক দেয়া হচ্ছে বিনামুল্যে। সেইসব পরে তবেই ভেতরে যেতে হচ্ছে সকলকে। আমরাও নিলাম। এক মাস্কের উপরে অন্য মাস্ক, এক গ্লভসের উপর আরেক গ্লভস পরে নিলাম। ডাবল প্রোটেকশন! ভেতরে যেয়ে তাজ্জব বনে গেলাম। কেউই সামাজিক দূরত্ব মানছে না। এতো ভিড়, এতো মানুষ! আমরা কি বেরিয়ে যাবো ? বেরিয়ে যাওয়া উচিত ? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ভেতরে। কিছু কিছু সময় মানুষের মস্তিস্ক সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বিপদজনক জেনেও জনমানুষের ভিড় ঠেলে দ্রুতই প্রয়োজনীয় জিনিষ ঝুড়িতে নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে যাচ্ছিলাম। এরই মাঝে একাধিকবার চায়নিজদের সাথে ধাক্কা লেগে যায়। বিল পরিশোধ করে কোনমতে বাইরে বেরিয়ে আসি। এবার নিজের মনের সাথে যুদ্ধ চলে অবিরাম। বারবারই মনে হচ্ছিল, কেন এখানে এলাম ? এখানে না এলে কী এমন অসুবিধা হতো ? বাসায় যা-ই ছিল তা দিয়ে এপ্রিল মাসটা চালিয়ে নেয়া যেতো না ? কত মানুষই তো আছে আমার দেশে, যারা কোনমতে খেয়ে না খেয়ে গোটা একটা জীবন পার করে দেয়! কয়টা দিন সেইসব সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মতো করে আধাবেলা খেয়ে দিন কাটালে কী এমন ক্ষতি হতো ? নিজেকে কোনভাবেই প্রবোধ দিতে পারি না।
এলমারস্ট হাসপাতালের পাশ দিয়ে ফিরছিলাম। তিনটি এ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজাতে বাজাতে ইমারজেন্সি গেটের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। আরো নতুন রোগী নিয়ে এসেছে হয়তো। মনটা বিষণ্ণ হলো। বিশাল এই হাসপাতাল আমার বাসা থেকে হাঁটা পথের দূরত্ব। কতো দিন রাত এ পথে হেঁটে গেছি। কিন্তু এবারের অনুভূতি অন্যবারের মতো নয়। অন্যসময় এই হাসপাতালে সেবা দানকারি ডাক্তার, নার্সদের মাঝে বাংলাদেশিও আছে বলে, কিংবা হাসপাতালের বাইরে অন্যদেশের পতাকার সাথে বাংলাদেশের পতাকা পতপত করে উড়তে দেখে গর্বে বুক ভরে উঠত। এবার কেবলই মনে হচ্ছিল, বিশাল এই বিল্ডিং এ একদল মানুষ একফোঁটা অক্সিজেনের জন্যে, বেঁচে থাকার জন্যে লড়াই করছে প্রাণপণ, অন্যদল তাদের বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়ছে আপ্রাণ। একদল পৃথিবী ছেড়ে যেতে চাইছে না, অন্যদল তাদের যেতে দিতে চাইছে না। কী অদ্ভুত মায়ার খেলা!
ফেরার সময় পুরো পথটুকু লক্ষ্য করি। সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে নিভু নিভু করে জ্বলছে ল্যাম্পপোস্টের কমলা আলো। সড়কের দুইপাশের দোকানগুলো থেকে ঝলমলে আলো ঠিকরে এসে পুরো এলাকাটি যে রাতেরবেলায়ও মধ্যদুপুরের ন্যায় উজ্জ্বল আলো ছড়াতো, তা যেনো আজ ইতিহাস। বাড়ি ফিরে ব্যবহৃত পোশাক নিচতলায় বেলকণির পাশে রেখে সবকিছু গুছিয়ে গোসল সেরে নেই। ছোট ছেলে সিঁড়ি ভেঙ্গে দৌড়ে কাছে এসে জড়িয়ে ধরতে চায়। দূর থেকে চিৎকার করে ওকে থামিয়ে দেই। বলি, দুই সপ্তাহ কাছে আসা যাবে না। সে ছলছল চোখে কিছুক্ষণ করুণ চাহনিতে তাকিয়ে থাকে। দুই গাল বেয়ে ঝরঝর করে অশ্রু ঝরে। যুক্তি দেখায়, ‘ তুমি তো গোসল করেছো, সব জীবাণু চলে গেছে।’ তাকে সান্ত্বনা দেই, বোঝাই। মাত্র নয় বছরের এতোটুকুন মানুষটা! বড় মায়া হয়, বুক ভেঙ্গে যায় যখন দেখি দূরে দাঁড়িয়ে আমায় ফ্লাইয়িং কিস দেয়! পাঁজরভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাসে আমি তাকে এড়িয়ে চলি। রাত বাড়লে সে ভারী কম্বলের উপর দিয়ে আমার পা জড়িয়ে ধরে বসে থাকে ক্ষণিক। আমি চোখ কটমট করে তাকাই। সে দৃঢ় স্বরে বলে উঠে, ‘ দেখো আম্মু, আমি তোমাকে স্পর্শ করি নাই, দূর থেকে কম্বলের উপর দিয়ে ধরেছি, আমার ঘুম আসে না।’ আবারো ছলছল চোখে দূর থেকে ফ্লাইং কিস দিয়ে অন্য রুমে চলে যায়। আনমনে স্রষ্টাকে বলি, ‘ এমন হাহাকার করা নির্ঘুম রাত কোন সন্তানের জীবনে না আসুক। এমন বেদনা ভারাক্রান্ত সময় কোন মায়ের জীবনে না আসুক।’ দুইদিনের অন্ধকারাচ্ছন্ন শহরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শেষে যে ঝলমলে রোদ উঠেছে, মূলত এমন আকাশ আঁধার করে বৃষ্টি শেষে ধরণিতে ঝকঝকে নীলাকাশ দেখার জন্যেই আমরা বেঁচে থাকি।
১৪৯জন ৫০জন
40 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য