যেহেতু জীবনের সিংহভাগ সময় কেটেছে নিউইয়র্ক শহরে, তাই জন্মভূমির পরেই এটি আমার দ্বিতীয় ভালোবাসার শহর। এই শহরের প্রতিটি ইট-পাথর, অলি-গলি, জনমানুষের ভিড়, ঝলমলে আলো কিংবা অন্ধকার, সবই ভালোবাসি। কখনো একলা, বন্ধুদের সাথে দলবেঁধে, আবার কখনোবা দেশ থেকে আসা অতিথিদের নিয়ে ম্যানহাঁটন ঘুরে বেড়িয়েছি রাতভর। হৈচৈ করেছি। কখন যে রাতের উজ্জ্বল ঝলমলে আলো ম্লান হয়ে গিয়েছে সকালের উদিত সূর্যের কাছে, টের পাইনি।বহুদিন এমনটি হয়েছে। এখন এই দুর্যোগের সময়ে কেমন আছে আমাদের ভালোবাসার নগরী ? কেমন আছে আলো ঝলমলে ম্যানহাটন শহর ? নিজ চোখে দেখতে ইচ্ছে করছিলো খুব। এক রাতে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিলাম তাই। কুইন্সের এ পথ ও পথ ঘুরে যখন ব্রিজ ধরে ছুটে চলছিল আমাদের গাড়িটি, ততক্ষণে মনটা বড় বেশি বিষণ্ণ হয়ে উঠেছিলো। এ কি দেখছি আমি ! বড় বড় প্রশস্ত সড়কে শাঁশাঁ করে ছুটে চলা অগণিত গাড়ি কোথায় ! কোথায়, কোন গহিন অরণ্যে হারিয়ে গেলো পাশের গাড়ি থেকে উচ্চস্বরে ইংরেজি গান বেজে উঠার শব্দ ! আমি এ কোন অচেনা শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি ! শহরটিকে দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত ঘর মনে হচ্ছিল যেন। যেখানে শুধুই নিরবচ্ছিন্ন এক অন্ধকার ! নেই জীবনের স্পন্দন ! যা আছে, তা শুধুই ধূসর নিরবতা !

ঘড়ির কাঁটা সবে রাত্রি বারোটা পেরিয়েছে। ব্রিজ পার হয়ে একে একে পার্ক এভিনিউ, মেডিসন এভিনিউ, ফিফথ, সিক্সথ, সেভেনথ এভিনিউ ধরে যাচ্ছিলাম আমরা। সড়কের ল্যাম্পপোস্টগুলোতে হলুদ বাতি জ্বলছে আগের মতোই। শুধু আগের মতো নেই অন্যসব দৃশ্য। ঝড়ের গতিতে ছুটে চলা গাড়ি নেই, ফুটপাথ ধরে হেঁটে চলা মানুষ নেই। রাস্তার সবুজ, হলুদ আর লাল বাতিগুলো আগের নিয়মে বিরামহীন জ্বলছে আর নিভছে। ঠিক যেন মানুষের জীবনের মতো। পৃথিবীর কোথাও কিছু মানুষ নতুন করে জীবন ফিরে পাচ্ছে, কোথাও কারো কারো জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। মাঝে কিছু মানুষের জীবন হলুদ বাতির মতোই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেমে আছে। এমন ভাবনার মাঝে আমরা যখন সেভেনথ এভিনিউর সামনে রেড লাইটে এসে থামি, সুনসান নীরব রাস্তায় দু’জন কৃষ্ণাঙ্গ বিশালদেহী মানব-মানবীর চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ শুনতে পাই। নিস্তব্দ শহরটিতে এ যেন কামান দাগার শব্দের ন্যায় মনে হলো! তারা হয় স্বামী-স্ত্রী, নয়তো বন্ধু। মধ্যবয়েসি এই নারী-পুরুষ নিজেদের মধ্যে তুমুল বিবাদে লিপ্ত। দু’জন পুলিশ অফিসার তাদের জোর করে একটি হলুদ ক্যাবে তুলে দেয় এই বলে যে, ঝগড়া-বিবাদ যা-ই করো, বাড়ি গিয়ে করো। আমাদের গাড়িটি এগিয়ে যায় আলো ঝলমলে টাইমস স্কয়ারের দিকে। বড় বড় টিভি স্ক্রিনে বিজ্ঞাপন চলছে অবিরত। উজ্জ্বল রঙিন আলো, সেও জ্বলছে প্রতিবার যেমন দেখেছি ঠিক তেমন। শুধু তেমনটি নেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুখরিত অগনিত পর্যটকের প্রাণের স্পন্দন। খাঁ খাঁ শুন্যতা চারিদিকে। একজন গৃহহীন মানুষ এগিয়ে এলো। ডলার চাইলো। দু’জন পুলিশ অফিসার একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ভাবলাম এমন নিস্তব্দ নিথর টাইমস স্কয়ারে আমাদের যুগল ছবি তুলে রাখি স্মৃতি ধরে রাখার জন্যে। খানিক এগিয়ে যাই। কিন্তু তাদের চোখে মুখে অনাগ্রহের ছাপ স্পষ্ট।
মাঝে মাঝে দুই একটি হলুদক্যাব ধিরে সুস্থে চলে যেতে দেখি। যেন কোন তাড়া নেই তাদের। অথচ এই তো ক’দিন আগেও একজন যাত্রি দেখলে একযোগে ৩/৪টি ক্যাবকে ছুটে যেতে দেখেছি। কার আগে কে নেবে যাত্রি। অফিস ছুটির সময়ে বাড়িফেরা মানুষদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতো তারা। যাত্রিদের কেউ কেউ অফিস শেষে বাড়ি ফিরে ফ্রেস হয়ে আবার বেরিয়ে পড়তো রেস্তোরাঁর উদ্দেশ্যে রাতের খাবার খেতে। কেউবা দলবেঁধে পানশালায় যেতো। কেউ এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। রাত বাড়লে পানশালা কিংবা রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া মানুষদের বাড়ি ফেরার পালা হতো। এমন এক চক্রাকারে শহরের ক্যাবগুলো সচল থাকতো রাতভর। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। পেন স্টেশন, গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল, এয়ারপোর্ট প্রতিটি স্থান যাত্রিশুন্য। যে ব্যস্ততম অফিস বিল্ডিং এ হাজার হাজার মানুষ ঘড়ির সময় ধরে চাকুরি করেছে, সেইসব এখন তালাবদ্ধ। রেস্তোরাঁ, পানশালা এড়িয়ে বাসাবাড়িতে স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে সময় পার করছে মানুষ। দীর্ঘ বিরতিতে যে দুটি বাস চলে গেলো পাশ কেটে, সে-ও যাত্রিশুন্য।বাড়ির পাশ দিয়ে যে দূরপাল্লার ট্রেন ছুটে যেতো হিসহিস শব্দে, আজকাল তাও আর শোনা যায় না। কী ভীষণ এক নৈঃশব্দ্য! অথচ আমাদের শহরে বসন্ত এসে গেছে। রাস্তার দুইপাশে, সেন্ট্রাল পার্কে, বোটানিক্যাল গার্ডেনে, বাড়ির উঠোনের গাছে গাছে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। পাখিরা ডাকছে। এমন দিনে এইসব নৈঃশব্দ্য একেবারেই বেনানান!
গত সপ্তাহে এলিমেন্টারি স্কুলে পড়ুয়া ছোট পুত্রকে বেশ উদ্বেগের সাথে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমাদের স্কুল বন্ধ দিচ্ছে না কেন ? সে বেশ দৃঢ়তার সাথে জানায়, শিক্ষক মিস সুয়ারেজ বলেছেন শেষ মুহূর্তে বন্ধ দিবে। এখনই স্কুল বন্ধ করে দিলে কিছু সমস্যা সামনে এসে দাঁড়াবে। শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় ক্ষতি হবে, অভিভাবকরা কাজে গেলে বাড়িতে এইসব শিশুদের দেখে রাখার কেউ নেই, এবং স্কুলে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে পায়। সে আরো জানায়, করোনাভাইরাস বিষয়ে তাদের একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। করোনাভাইরাস কী, কীভাবে ছড়ায়, এবং সচেতনতা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া হয় এতে। শেষে এ সম্পর্কিত ১০ টি প্রশ্নের কুইজ দেয়া হয়। বিষয়টি ভালো লাগলো এই ভেবে যে, আমাদের শিশুরা সঠিকভাবে সংকটজনক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানলো, এবং নিজেরাই সচেতন হতে পারলো। দুইদিন না পেরোতেই স্কুল থেকে ইমেইলে জানানো হয় স্কুল এক মাসের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বড়ছেলের হাইস্কুল থেকে ইমেইল পাঠানো হয় জানিয়ে যে, প্যারেন্ট টিচার কনফারেন্স হবে ফোনে। এবং স্কুল লকারে শিক্ষার্থীদের জরুরি কোন জিনিষ থাকলে যেন নিয়ে আসে। সব মিলিয়ে কেমন যেন এক বিষণ্ণ বিচ্ছেদের সুর বেজে উঠে। হয়তো একদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। আমাদের সন্তানরা আবার ফিরে যাবে প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু সকলেই কি ফিরে যেতে পারবে ? চারিদিকে অজানা এক শঙ্কা! তবুও সকলের তরে সকলের সর্বান্তকরণে প্রার্থনা থাকুক।
ডাক্তারের অফিসে গিয়েছিলাম জরুরি প্রয়োজনে। যে অফিসটিতে রোগীদের ভিড় লেগে থাকতো, সেখানে শুন্য চেয়ার, শুন্য রুম। ভেতরে ঢুকতেই রিসেপশনের মেয়েগুলো এমনভাবে তাকালো, যেন কোন অদ্ভুত ভুতুরে কেউ এসেছে! দূর থেকেই জানতে চাইলেন জ্বর আছে কিনা। অন্যসময় আমরা স্বামী-স্ত্রী দুইজন একসঙ্গে ভেতরে যেতাম। কিন্তু এবার শুধু রোগীকে একা যেতে হবে, জানালেন। ভেতরের রুমে ডাক্তারের মুখোমুখি বসার রোগীর চেয়ার বেশ দূরত্বে দেয়ালের গা ঘেঁসে রাখা। ডাক্তারের সেই সহজ স্বাভাবিক অভিব্যক্তি নেই। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লভস। কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ। আমাদের পারিবারিক বন্ধু ডাক্তার, খুব কাছের জন। তবুও এই দূরত্বটুকু, অভিব্যক্তিটুকু মন খারাপ করালো। মনে করিয়ে দিলো এই দুর্দিনে, দুঃসময়ে আমরা আসলে কেউ কারো নিকটজন নই। শুধু ডাক্তারের কথা বলছি কেন, আমি নিজেও তো আজকাল আমার সন্তানদের কাছ থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকছি। ছোট ছেলে যখন তখন এসে জড়িয়ে ধরে , গালে গাল লাগিয়ে আদর দিতে চায়। কিন্তু আমাকে যে জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বেরুতে হয় প্রায়ই! আমি নিজেই যে করোনাভাইরাসের বাহক নই, সে নিশ্চয়তা কে দিবে ? মানুষ তার আপনজনদের সঙ্গ এড়িয়ে চলার এইসব দিন বড় বেশি ভাবায় আমাদের। যেন অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ!

 

রিমি রুম্মান
২৬৭জন ১৭০জন
14 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য