অতৃপ্ত জীবন…প্রবাসী-১১

মনির হোসেন মমি ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৪, মঙ্গলবার, ০৬:৪৩:৩৫অপরাহ্ন বিবিধ ২২ মন্তব্য

হারানো পাসপোর্ট হাতে পেয়ে মাথার ঝামটা একটু হালকা হল।বিভিন্ন  স্হানে পার্ট টাইম কাজ করতে থাকি।এ দিকে পায়ের অ্যাকসিডেন্টের পর কোম্পানীর নামে ইনসুরেন্স মামলা করেছিলাম আজ সেই মামলার রায় বের হয়েছে।মামলার রায়ে এখন আমি মোটামুটি আশংকামুক্ত তবে ডাক্তার বলেছে এ পায়ের ক্ষত যন্ত্রনা মাঝে মাঝে অনুভব করব তবে ভয়ের কিছু নেই।কারন আঘাতটা ছিল পায়ের কবজিতে এখানকার ভাঙ্গা কখনই একশ ভাগ জোড়া লাগবে না।তাইতো মাঝে মাঝে এখনও অনুভব করি এর সহনীয় যন্ত্রনা।রায়ের কাগজ হাতে নিয়ে চলে গেলাম মেরিনা উকিলের অফিসে।মাত্র দশ মিনিটেই চলে গেলাম চল্লিশ পঞ্চাশ কিলোমিটার।উডল্যান্ড হতে বাসে গেলাম এম আর টি স্টেশনে।মাটির অনেক গভীরে উডল্যান্ড এম আর টি স্টেশন।প্রতি দশ মিনিট অন্তর অন্তর ট্রেন আসে সর্বোচ্চ পাচ মিনিট অপেক্ষা এর পর আর কোন দিকে চাওয়া বা বলার অপেক্ষা রাখেনা। অটো ট্রেনের সমস্হ দরজা একসাথে লক হয়ে ট্রেন চলতে থাকে।ট্রেনের প্রায় সকল চলাচলের রোড মাটির নীচ দিয়েই তবে মাঝে মাঝে আলোর ঝিলিক দেখিয়ে অন্ধকারে তলিয়ে যায় নিমিশেই।সেখানকার রেল লাইনের ব্যাবস্হা ধীরে ধীরে উন্নতর হতে উন্নত হতে থাকে।যদিও অধিকাংশ অন্ধকার মাটির নীচে চলাচল কিন্তু রেলের ভিতর থেকে স্পষ্টই দেখা যার এর গতি পথ।টিকেটের ব্যাবস্হা সিঙ্গাপুরে এখন নাই বললেই চলে সব EZ কার্ড প্রি পেইড সিষ্টেমস হয়ে গেছে।এখানে লোক নিয়োগ দিয়ে গার্ডে গার্ডে চেকিং এর কোন প্রয়োজন হয় না।মেরিনায় নেমে উকিলের অফিসে ঢুকে বাঙ্গালী উকিলের সাথে কথা বললাম।

-তোমার কি মতামত এই রায়ের ব্যাপারে।তোমারতো পারমিটের রি-নিউ হবে না,তুমি যদি আরো যত বছর খুশি থাকতে চাও তবে তোমাকে রায় মানিনা বলে এই কাগজে সই করতে হবে।

পারমিটের মেয়াদ প্রায় শেষ যেহেতু অ্যাকসিডেন্টের মামলা করেছি সে জন্য পারমিট আর রি নিউ হবে না।আমাকে থাকতে হলে স্পেশাল পাস নিয়েই থাকতে হবে।তাছাড়া হাতের অর্থের অবস্হাও তেমন ভাল না আর আগুনে পুড়ে অনেক টাকার মালামাল গচ্ছা গেছে, উপায় নেই থাকতে হবে আরো বেশ কিছু দিন।তাই উকিলের কাগজে সই করে মামলা আবার রানিং করলাম।

উকিল ছিল আমাদের নারায়ণগঞ্জের খান পুরের বাসিন্দা।খুব ভাল লোক অনেক বাঙ্গালী তার কাছ থেকে আইনের বিভিন্ন বিষয়ে সহজেই মতামত পান।বসে আছি উকিলের বরাবর সে সময় টাঙ্গাইলের একজন এসে আমার পিছনে দাড়ানো কথা বলে উকিলের সাথে ।

-কি রে বেটা তোর বউ বাচ্চার খবর কি কেমন দেখছে সিঙ্গাপুর?

-জি ভাই ভালো,তবে ভাইজান রায়ের পারসেন্টসটা আর একটু বাড়ালে ভাল হতো।

-বলিস কি?আরো থাকতে চাস নাকি?

-না মানে, যদি সম্ভব হয় আর কি!

-অনেক হয়েছে আর করিস না পরকালে কি জবাব দিবি বল?

পরকালের কথা শুনে আমার মনে কেমন যেন খটকা লেগে গেল।এখানে পরকালের কথা এলো কেনো?অ্যাকসিডেন্ট করে মামলার টাকা তুলবে এখানে আবার পরকালের জবাব কথাটিতে কেমন যেন রহস্যে ঘেরা।তাছাড়া টাঙ্গাইলের যে লোকটি,তাকে আমি সিঙ্গাপুরের লেবার হিসাবে এসেছে জানি সে আবার ছেলে মেয়ে বউ নিয়ে সিঙ্গাপুর আছে এ কি করে সম্ভব!ভিতরে স্বভাবতঃ প্রশ্ন জাগে।সেই লোকটি চলে যাবার পর উকিলের কাছে নিজের কৌতুহলটা জানতে চাইলাম।

-তার দেশের বাড়ী টাঙ্গাইলের রাজ বাড়ীর পাশের গ্রাম।সে সিঙ্গাপুর এই প্রথম আসে বাড়ীর সহায় সম্পত্তি সব বিক্রি করে আসে।আসার পর পর প্রায় দুই তিন মাস কাজ করার পর একটু আলসে প্রকৃতির লোক বলে তাকে তেমন একটা কাজ দেয় না কোম্পানী।এক দিন বুকে মেরা একটি সাইটে কাজ করতে গিয়ে মাথায় উপর থেকে বাশ পড়ে আঘাত পেয়ে হাসপাতালে যায়।

-মাথায় সেফটি হেলমেট ছিল না?

-ছিল তবে তা বাশের আঘাতে পড়ে যায়,হেলমেটের জন্য রিয়েলি সে প্রানে বেচে যায় এবং আঘাতটা তেমন একটা লাগেনি শুধু চুলের কিছু অংশ কেটে চামড়ায় দুটো সিলাই করতে হয়….এই মাস খানেক পর সে পুরোপুরি সুস্হ্য হয়ে যায়।

-তাতো বুঝলাম কিন্তু তার ছেলে মেয়ে বউ কেমন করে আনল?

-বলছি…এর পর মামলা করল আমাকে দিয়ে।প্রথম দিনের ডাক্তারী পরীক্ষায়,ডাক্তারের রিপোর্টের উপর নির্ভর করবে মামলাটি কতদিন চলবে আর রায়ে কত পয়েন্ট পেতে পারে,এই পয়েন্টেই বাড়িয়ে দিবে টাকার পরিমাণ ।তাই থাকার জন্য কিছু বুদ্ধি দিলাম আমি যা বলেছিলাম তার চেয়ে বেশী অভিনয় সে করে ফেলে।

সে অ্যাকসিডেন্টের পর হতে হাসপাতালে প্রায় পনের দিন এরপর আজ তার মামলার প্রায় দু’বছর যাবৎ সে গোসল করেনি,গোসল করলেও ঘাড় হতে মাথা পর্যন্ত পানিতে ভিজায়নিঁ।চুলগুলোকে নিজের ফেইসটাতে পাগলের মত মেকাপ এনেছে।প্রথম যে দিন ডাক্তারে মূখাপেক্ষী হন তখনই সে ইসকার তিন টাক্কা জিতে নেন।সিঙ্গাপুরের চিকিৎসা আর ডাক্তার,বিশ্বের উন্নত যে কোন দেশের চেয়ে কম আধুনিক নয় সেই চিকিৎসকের যে ডিগ্রীর সার্টিফিকেটের কাগজ তা কেরিং করতেও সে পারবে না অথচ তাকে সে বোকা বানিয়ে নিজেকে সাফল্যের কাছে নিয়ে যায়।ডাক্তার সাহেব তাকে সিটে বসিয়ে বিভিন্ন যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করছে….এমন সময় তার মাথায় আসে দুষ্টু বুদ্ধি, সে হাত বাড়িয়ে পাশে রাখা ছোট কেচি/সিজার হাতে নিয়ে নিজেই নিজের মাথার চুল এলো মেলো করে কাট কাট করছে আর অন্যসব অঙ্গকে নড়িয়ে পাগলের প্রলেপ বকছে ডাক্তার অবাক হয়ে ওয়েটিং রুমে বসা তার সাথে আসা লোককে দৌড়ায়ে ভিতরে ডেকে নিয়ে জানতে চায় সে এমন করছে কেনো?সাথের লোকটি যথাযত উত্তর দেয়…..Sir he become a mad after Accidents.ডাক্তার সাহেব যা বুঝার তা বুঝে গেছেন…মাথায় আঘাতের পর সে সেন্সলেস হয়ে গেছে।ডাক্তারের সকল কষ্ট কর রিপোর্ট তার অভিনয়ের কাছে ম্লান।বাস!যায় আর কোথায় ইন্সুরেন্স কোম্পানী টাকার পাহাড়ার সমান অনায়াসে ধরা দেয় তার হাতে।ডাক্তার সাহেব তার পরিচর্যার জন্য ফ্যামিলি আনতে লিখিত দেয় যার পরিপেক্ষিতে তার বউ বাচ্চা সরকারী ভাবে সিঙ্গাপুর আসে।

-কত পেয়েছে?

-অনেক,এই ধরো কোটির উপরে হবে,কারন শরীরের অঙ্গহানির একটি নিদিষ্ট অংক আছে সেই অনুপাতে এবং জখমের গুরুত্ত্ব পরবর্তীর লাইফের গ্যারান্টি ইত্যাদি বিবেচনা করে রায় হয়।সিঙ্গাপুর গর্ভমেন্ট শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনার ক্ষেত্রে খুবই সচেতন যদি আইনত তুমি বেতন ভাতা পাওনা হও তবে অভিযুক্ত কোম্পানী যদি দেওলিয়াও হয় তবুও তোমার ভয়ের কিছু নেই স্বয়ং সরকার তোমাকে দিতে বাধ্য।

কথা বলতে বলতে অনেক বেলা হয়ে গেল উকিল সাহেব তার প্রাইভেট গাড়ীতে করে আমাকে নিয়ে সিঙ্গাপূর ম্যানপাওয়ার অফিস এম ও এম এ যান।আমি এ অফিসে প্রায়ই আসি এখানে আমার এক মালে বিদেশী অফিসার বন্ধু আছে সে আমার সাথে প্রতিদিন অন্তত ফোনেও হলেও যোগাযোগ করবে যা এখনও মাঝে মাঝে ফোন করেন।সে দিন উকিলের সাথে অফিসে ঢুকে প্রথমে আমি যে বিষয়টি লক্ষ্য তা আমাকে ভাবিয়ে তুলে ওদের নিরলস কর্ম দেখে।

এক দল তামিল,মনে হয় সবে মাত্র কোন কন্সট্রাকসন কাজের সাইট থেকে কোন এক কাজে এ অফিসে এসেছে তাদের পায়ে হলুদ রংয়ের সেভটি বুটে প্রচুর কাদ মাটি ছিল ফ্লোর দিয়ে হেটে যাবার সময় কাদা মাটি স্বচ্ছ আয়নার মত ফ্লোরটাকে ময়লা করে ফেলে যারা এ কাজের লোক তারা একটু টু-শব্দও করলনা বরং সেই কাদা মাটি মোভ দিয়ে পরিষ্কারে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে অন্য এক অভ্যার্থনা অফিসার তাদেরকে বিনয়ের সাথে তাদের সেবার কাউন্টার দেখিয়ে দেন।

সেখানে আর একটি বিষয় খুব ভাল লাগে কারো শরীরের সাথে কারো শরীর সামান্যতম টার্চ লাগলেই সঙ্গে সঙ্গে বলবে…SORRY.

টু বি কন্টিনিউ……

 অতৃপ্ত জীবন…প্রবাসী১০

 

 

১৬৮জন ১৬৮জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য