অতৃপ্ত জীবন…..প্রবাসী০৭

মনির হোসেন মমি ২২ ডিসেম্বর ২০১৩, রবিবার, ০২:১৯:৪১পূর্বাহ্ন বিবিধ ১৭ মন্তব্য

অতৃপ্ত জীবন…প্রবাসী০৬

http://www.sonelablog.com/archives/9661

আমরা মানুষ।আমাদের কারো জীবন হয় পরিপূর্ণ অঙ্গপ্রতঙ্গের আবার কারো জীবন হয় বিকলাঙ্ক।জম্মের দাগ এক সময় সয়ে যায় কিন্তু কৃর্ত্তিম অঙ্গ হানি যাদের হয় তারা বুঝে একটি সচল অঙ্গ কতখানি তার জীবনের জন্য গুরুত্ত্বপূর্ণ।আমার বেলাও তাই, কয় দিন আগেও আমি কি ছিলাম না, জীবনের লক্ষ্যে পৌছতে ট্রেনের মত ছুটে বেরিয়েছি সিঙ্গাপুরের এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্তে।আজ কয়দিন যাবৎ একে বারে অলস জীবন যাপন করছি।হাতে নিয়েছি পঙ্গুত্ত্বের সহয়াতাকারী স্ক্যাচেস অথ্যাৎ দেহ ভড়ের লাঠি যা কখনও কল্পনাও করিনি।তবে ভাগ্যের বিধান খন্ডায় ,সাধ্য কার আছে?যদিও ভাগ্যে আমি বিশ্বাসী নই বিশ্বাস করি পরিশ্রমকে,উদ্দ্যশ্য আর পরিশ্রমই সাফল্যের নীতি -এ ক্ষেত্রে ভাগ্যের কাছে পরাজিত হলাম।প্রথমে চাইনিজ হাড় ভাঙ্গা ডাক্তারকে দেখাতে চেয়েছিলাম তাকে দেখালে ১৫দিনে হয়তো রোগমুক্তি হইত কিন্তু বঞ্চিত হতাম লাইফ ইনসুরেন্স হইতে তাই সিঙ্গাপুরে বহু জনপ্রিয় তান তকসিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিলাম।পায়ের পাতা হতে হাটুর কাছাকাছি বিশাল এক ভ্যান্ডিজ লাগিয়ে দিল ডাক্তার সাহেবেরা।স্ক্র্যাচের উপর ভর দিয়ে এক পায়ে হাটাচলা করতে হয়।আর দিন রাত চব্বিশ ঘন্টাই বাসায় শুয়ে বসে থাকতে হয়।অলস সময় যেন কাটতে চায় না।২০/২৫ দিন অতিবাহিত হবার পর স্ক্র্যাচ ছাড়াই হাটার চেষ্টা করলাম,,এক পা দু’পা করে হাটতে হাটতে চলে গেলাম মোস্তফা প্লাজার সামনে বাঙ্গালীদের আড্ডায় ।আড্ডায় কথা হয় নারায়ন গঞ্জের এক উকিলের সাথে কারন আমার পারমিটের মেয়াদ এ মাসেই শেষ কিন্তু অ্যাকসিডেন্টের ইনসুরেন্স কেইস করায় হয়তো ওয়ার্ক পারমিট আর রিনিউয়েল হবে না তাই কি ভাবে কেইস চালিয়ে সিঙ্গাপুর থাকা যায় সেই আলোচনাই করছিলাম উকিলের সাথে হঠাৎ কোথা হতে যেন পাগলের মত এক বাঙ্গালী উকিলের সামনে এসে কান্না কান্না কন্ঠে কিছু পরামর্শ চায়…

-ভাই আমি এসেছি মাত্র ছয়/সাত মাস হবে,এখনই কোম্পানী বলছে আমাকে দেশে পাঠিয়ে দিবে।আমি এখন কি করব,প্রায় দুই লক্ষ টাকা সুধে এনেছি,কাজও তেমন একটা করতে পারিনি..দেশে পাঠিয়ে দিলে নিশ্চিত আমার ফাসি দেয়া ছাড়া উপায় থাকবেনা…..(কান্না কন্ঠে)ভাই আপনি আমাকে একটা বুদ্ধি দেন….আমি কি ভাবে থাকতে পারি।

উকিল সাহেব অনেকক্ষন ভেবে বলল..

-ঠিক আছে,দেখছি আমি কি করা যায়। কোম্পানীর কাছে কোন বেতনের টাকা পয়সা পাবেন?

-না…সব পরিশোধ।

-তাহলেতো কোম্পানী কেইসও করতে পারবেননা।ঠিক আছে এক সময় আমার অফিসে আসেন…দেখবনে কি করা যায়।

লোকটি নাছোর বান্দা আশারূপ কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে উকিল সাবকে ছাড়বেনা।সে এবার হাউ মাউ করে কেদেঁ দেয়।উকিল সাহেব বিরক্ত হয়ে যায়।

-আরে ভাই আপনি পোলাপাইনের মত শুরু করেছেন,আপনারতো একটা কারন থাকতে হবে যথাযত কারন থাকলে না হয় কেইস চালিয়ে স্পেশাল পাস নিয়ে এখানে থাকতে পারতেন।কারন ছাড়া মেডিক্যাল ছুটির রিপোর্ট ছাড়াতো কেইস দাড়া করাতে পারবনা।

লোকটি এবার আরো দুর্বল হয়ে পড়ে….ভাই যে ভাবে হউক একটা বুদ্ধি দেন।আবার কান্না শুরু করে দেয়,উকিল সাহেব এবার রেগে যায়।

-যান ভাই…যান …যে ভাবে পারেন ১৫দিনের মেডিক্যাল ছুটি নিয়ে আসেন।

লোকটি পাগলের মত ছুটে চলে গেল।আমি উকিল সাহেবকে সালাম দিয়ে আমার কেইস সম্পর্কে অবগত করলাম।

-তোমার যেই কেইস তাতে মনে হয়না কোম্পানী শেষ পর্যন্ত তোমার সাথে ভাল ব্যাবহার করবে,কোম্পানী স্ব-ইচ্ছায় ইনসুরেন্স কেইস করেছে?

-জি,করেছে।

-কিন্তু কোম্পানীতো তোমাকে ঠকিয়ে যা কেইসে ডলার আসবে তা দিয়ে বিদায় করে দিবে।তুমি এক কাজ কর কালকে এক সময় আসো আমার অফিসে তোমার কেইসটা ফাইল করব,তুমি তোমার ইচ্ছে মত যত দিন সিঙ্গাপুর থাকতে চাও থাকবে শুধু প্রতি বার রায়ের কাগজে তোমার মন মতন নয় সাইন করে দিবে বাকীটা আমি সামলাবো।

-ঠিক আছে ভাই তাই হবে।

এর মধ্যে ঐ লোকটি রক্তমাখা হাতে উকিল সাবের কাছে এসে অজ্ঞান হয়ে যায়।সবাই ধরাধরি করে মাথায় নাকে মুখে পানি দিয়ে জ্ঞান ফিরালাম।

-কি রে ভাই আপনার এ অবস্হা কেমন করে হলো?একেবারে দুটো আঙ্গুলই থেতলিয়ে ফেলেছেন ঘটনা কি?উকিল সাহেব বলল।লোকটির সাথের লোক কথার উত্তর দিল।

-ভাই..ও রুমে ঢুকে হঠাৎ হাতুরী নিয়ে আঙ্গুলে আঘাত করে…বলে…. এবার আমার সিঙ্গাপুরে থাকা কেউ আটকাতে পারেনা।

উপস্হিত সবাই  আমরা অবাক হই।আমাদের ঐ আড্ডায় বাংলাদেশ দুতাবাসের লোক ছিল।উকিল সাহেব দুতাবাসের লোকটিকে লক্ষ্য করে কিছু ঝাড় দেন।

-এইতো আপনাদের কাজ…কত বাঙ্গালী যে এমন সমস্যায় আছে তাদের কোন খোজ খবরই আপনারা রাখেননা।ঠিক আছে ওকে হাসপাতাল নিয়ে গিয়ে বেন্ডিজ করাইয়া আনেন আর ছুটির কাগজটা আমার কাছে কাল সকালে নিয়ে আসবেন।

আঘাত প্রাপ্রাপ্ত লোকটি এবার যেন শান্তি পেলেন সে উকিল সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে যায়।এর মধ্যে আমার মোবাইলে একটি অপরিচিত নাম্বারে ফোন আসে আমি হ্যালো বলতেই কানে ভেসে আসে একটি দুর্ঘটনার খবর।আমাদের হাউসে অথাৎ আমাদের থাকার ফ্লাটে আগুন লেগেছে।আমি হিতহিত জ্ঞান ভুলে লেংরা পায়ে ছুটে গেলাম সেখানে।দেখছি আমার ফ্লোরেই আগুনের শিখা বেশী।মুহুর্তের মধ্যে হুসিয়াল দিয়ে ছুটে আসল ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট ।পুলিশ ঘটনাস্হলের চারদিকে সাথে সাথে নিরাপত্তা ফিতে বেড়িক্যাট দিয়ে নিরাপত্তার বাহিনীর আওতায় নিয়ে আসে।ফায়ার সার্ভিস আপ্রান চেষ্টা করছে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনতে।চারদিকে দেশী বিদেশী লোকে লোকারন্য।আমার মত আরো অনেকে ভিতরে ঢুকার চেষ্টা করে পুলিশের বাধার মুখে ব্যার্থ হন।পুলিশ আমাদের শান্তনা দিল আমাদের সমস্হ ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।আমি শুধু তীর্থের কাকের মত চেয়ে রইলাম ধ্বংষাজ্ঞ আগুনের দিকে,চেয়ে চেয়ে দেখছি আমার আড়াই বছরের তিল তিল করে সংগ্রহ করা জিনিসপত্র কি ভাবে ধ্বংস হচ্ছে।প্রায় পাচ ভরি স্বর্ণা লংকার হাজার ডলারের কাপড়চোপড়,বিয়োগকৃত পিতার সুন্দর করে অনেক দাম দিয়ে বাধানো ছবি….সব কিছু চোখের সামনে ধ্বংস হচ্ছে মন যেন মানতে চায় না তাইতো মনের ঘরে কালো মেঘের আনাগোনা জল হয়ে চোখের কুন দিয়ে গাল বেয়ে পড়ছে……..ভুলে গেলাম আমার পায়ের আঘাতের কথা,সুস্হ পায়ের মতন স্ট্রিট এক বার এ দিক যাচ্ছি আবার ঐ দিক যাচ্ছি।প্রায় ঘন্টা দুই চলল আগুনের দাউ দাউ খেলা এর পর এলো স্বষানের নীরবতা অনুমতি পেলাম ভিতরে ঢুকার।সবাই যে যেভাবে পারে ক্ষতিগ্রস্হ সিটের দিকে ছুটছে।ভিতরে ঢুকে আমি কোন তাল খুজে পেলামনা কোনটা আমার রুম,কোনটা আমার থাকার সিট সব যেন পুড়ে একাকার হয়ে এক ফ্লাটে পরিনত হয়েছে।অবশেষে পেলাম সিটের চিহৃ কিন্তু কিছুই আর অবশিষ্ট পেলাম না লোহার সিট সহ আগুনের ত্যাজে পুড়ে আঙ্গার।আঙ্গারের ভিতরে দু’হাত দিয়ে স্বর্ণগুলো খুজারঁ ব্যার্থ চেষ্টা করলাম কিছুক্ষন ।আমার সাথে থাকত এক ডলার ব্যাবসায়ী তার ডলার কালেকসনে আলমারীতে ছিল প্রায় দু লক্ষ্য ডলার সব পুড়ে ছাই হয়ে বাতাসে আকাশে উড়ছে।হঠাৎ আমার চোখ পড়ে বস্তু পুড়ে যাওয়া ছাইয়ের স্তুবের উপর,হাত দিয়ে ছাইগুলো সরিয়ে, চকচক করছে দেখতে পেলাম একটি মোটামোটি বড় স্টিলের প্লেট তার ঊপর সিটের লোহার ভগ্নাংশ।লোহার গুড়াগুলো সরায়ে স্টিলের প্লেটটি আলগা করতে চোখে পড়ে কিছুদিন আগে বাধানো পরলোক গমন বাবার অর্ধেক পুড়ে যাওয়া ছবিটি।ছবিটি দু’হাত দিয়ে পরিস্কার করে হাতে নিয়ে চেয়ে রইলাম পিতার মুখের দিকে “বাবা যেন আমাকে শান্তনা দিয়ে বলছে…..কাদছিসঁ কেনো আমিতো তোর পাশে সব সময়ই আছি,থাকব…মনে সাহস আর আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখিস দেখবি সব অন্ধকার ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে….

“মনের অজান্তে চোখ দিয়ে জল ছবিটির উপড় গড়িয়ে পড়ল……….

(চলবে)

 

 

 

২১২জন ২১২জন
0 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য