অতিক্রম

রেহানা বীথি ২২ জুন ২০১৯, শনিবার, ০৯:২৬:৩০পূর্বাহ্ন গল্প ২১ মন্তব্য

অতিক্রম
*************
ক্যাঁচচ্… শব্দে ট্রেনটা থেমে গেলো। অবশেষে পৌঁছালো! ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দরজায় এসে মুখ বাড়িয়ে ডানে বাঁয়ে দেখে নিলেন জনাব রায়হান। শীতের বিকেল, এরমধ্যেই কুয়াশার আভাস। পকেট থেকে মোবাইল বের করে সময় দেখলেন। পাঁচটা দশ। যে ক’জন নেমেছিলো ট্রেন থেকে, চলে গেছে যে যার গন্তব্যে। রয়ে গেছেন শুধু তিনি। অখ্যাত এই স্টেশনে কতবছর পরে এলেন! সেই বহুবছর আগে শেষবার যখন এই স্টেশন ছেড়েছিলেন, মনে আছে, তাঁর দু’চোখ ঝাপসা ছিলো। আবছা দৃষ্টিতে হাতড়ে হাতল ধরে উঠে গিয়েছিলেন ট্রেনে। কিন্তু হাতল ধরে দাঁড়িয়েই ছিলেন তিনি। ট্রেন ছাড়লো, চলতে লাগলো ধীরে…ধীরে…তারপর দ্রুত। একসময় চোখের সামনে থেকে আড়াল হয়ে গেলো জনাব রায়হানের মায়ার পৃথিবী। তাঁর ছোট ছোট স্বপ্নগুলো, চেনা চেনা মুখগুলো দূরে… অনেক দূরে চলে গেলো।

এক শীতের বিকেলে তিনি এসে নামলেন পূর্ব পরিচিত, প্রায় বিস্মৃত এই স্টেশনে। ট্রেন থেকে নামার আগে দু’পাশে তাকিয়েছিলেন, কিন্তু কেন? স্মৃতি থেকে প্রায় হারানো এই স্টেশনে কাউকে কি আশা করেছিলেন! এমন কিছু কি চেয়েছিলেন মনে মনে, কেউ এসে জাপটে ধরবে তাঁকে… উচ্ছাসে? আবেগে রুদ্ধ গলায় বলবে, এসেছিস? এসেছিস!!

যেন দেখতে পেলেন তিনি, গায়ে একটা কালো রঙের উলের চাদর, উন্নত নাক আর গ্রীবা, দৃঢ় পদক্ষেপে একজন এগিয়ে আসছে তাঁর দিকেই। জড়িয়ে ধরেনি, অবাক বিস্ময়ে তাকালো। কী একটা ছিলো সেই দৃষ্টিতে। শ্লেষ? মায়া ছিলো না কী? খুঁজলো জনাব রায়হান, অধীর হয়ে….তন্ন তন্ন করে। ঘটাং…ঘট শব্দে ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করলো। চমকে ওঠেন তিনি সেই শব্দে, কেউ নেই। সুনসান স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। যেতে হবে তাঁকে। স্টেশন ছেড়ে যে পথ চলে গেছে, সেপথে। কিন্তু একটা রিক্সাও তো নেই! পাশেই কোনো মসজিদে মাগরিবের আযান শোনা যাচ্ছে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে এলেন। হেঁটেই যেতে হবে কী? পারবেন তো? মনে মনে হেসে ফেললেন, ভয় পাচ্ছেন! অথচ নিত্যদিনের চলার পথ ছিলো এটা তাঁদের। একসময় সরকারি স্কুলে ভর্তি হলেন । এত মেধাবী ছেলেকে গাঁয়ের স্কুলে রাখাটা উচিত নয় মোটেই। গাঁ থেকে তিনমাইল পাঁয়ে হেঁটে শহরের সেই সরকারি স্কুল। অবশ্য স্কুলের পাট চুকিয়ে কলেজে ভর্তির পর বাবা একটা বাইসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। সাইকেল পেয়ে এত আনন্দ হয়েছিলো, যেন হাওয়ায় ভেসেছিলেন কিছুদিন। যাক সেকথা। ভাবনা নেই, হাঁটতে পারবেন। এই আটান্নতেও একটুও ভেঙ্গে পড়েনি তাঁর শরীর। প্রায় ছ’ফুট উচ্চতায় মেদহীন ঝরঝরে একেবারে। চুলে অবশ্য রূপোর ছোঁয়া লেগেছে। সে এমন কিছু নয়। ভীষণ ফর্সা গায়ের রঙের সাথে তা বেশ মানিয়ে যায়। জুবুথুবু নিঃসঙ্গ স্টেশনটা পেছনে রেখে হাঁটতে লাগলেন জনাব রায়হান। সেই মেঠোপথ নেই আর। পিচঢালা পথটা যেন কালো সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে অজানায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে চারিদিক। আঁধারের এক অপার্থিব ঘ্রাণ পাচ্ছেন যেন তিনি।

একেবারেই অচেনা লাগছে এ পথটি। যেন নতুন কোনো পথে হাঁটছেন তিনি। অন্ধকারেও অনেক আগের চেনাপথের অচেনা রূপ দেখতে পাচ্ছেন। পথের দু’পাশে জঙ্গল আছে, তবে আগের মতো নয়। দূরে বৈদ্যুতিক আলোর খুঁটিগুলোর কোনোটার মাথায় টিমটিমে বাতি তাঁর কাছে কেমন ভৌতিক লাগলো। ভয় নয়, তবু যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি জাগলো মনে। কোথায় যাচ্ছেন? তাঁর চিরচেনা গাঁয়েই তো! যেখানে একসময় কেটেছে তাঁর স্বপ্নময় দিন। দরিদ্র স্কুল মাস্টার বাবা আর সর্বংসহা মায়ের ঘরে দুই ভাই আর এক বোন ছিলো তারা। অভাব ছিলো, কিন্তু অসুখী ছিলো না তো ! বাড়ির সাথে লাগোয়া একটুকরো জমিতে কতরকম সবজী লাগাতো বাবা। গোয়ালে দুধেল গাই, হাঁস মুরগি। বাবা মায়ের যৌথ যত্নে আর ভালোবাসায় সবকিছু নিয়ে বেশ ছিলো তারা। কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি, যেতে হলো রাজধানীতে। কত স্বপ্ন বাবার চোখে, ছেলে বড় হবে…. অনেক অনেক বড়।

টুংটাং আওয়াজ পেলেন পেছনে। চমকে ফিরে তাকালেন। একটা রিক্সা।

— কই যান মিয়াভাই?

নিজের গাঁয়ের নামটা বহুবছর পর উচ্চারণ করলেন জনাব রায়হান।

— ও আল্লাহ্, ওইটা তো আমাগো গেরাম। তা কোন বাড়ি যাবেন আপনি?
— ইদ্রিশ আলী মাস্টারের বাড়ি। চেনো তুমি?
— হায় হায়, কী কন? চিনুম না কেন? হগলেই চেনে। যা ভালা মানুষ আছিলেন! ওঠেন ওঠেন, তাড়াতাড়ি ওঠেন।

স্বস্তি পেলেন জনাব রায়হান। দীর্ঘ অনভ্যাসে তাঁর হাটার শক্তি কমে গেছে, বেশ বুঝতে পারছিলেন। উঠে বসলেন রিক্সায়। চলতে শুরু করলো। চলন্ত রিক্সায় গাঁয়ের এ পথে শীত যেন হুল ফোটাতে লাগলো। সোয়েটার-এ মানছে না। ব্যাগে শাল আছে। বের করে গায়ে জড়ালেন। টের পেলো রিক্সাচালকও।

— গাঁও গেরামের শীত মিয়াভাই, কঠিন শীত। আপনে বুঝি ঢাকায় থাকেন? হুনছি ওইখানে তেমন শীত নাই। সত্য না কী মিয়াভাই?

— তুমি যাওনি কোনোদিন?

— নাহ্, আমার এক ভাই ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাম করতো, হ্যার কাছেই হুনছি।

— করতো কেন বলছো, এখন করে না?

— সৌদি গ্যাছে গা। হেই দ্যাশে বলে মেলা ট্যাকা? নবী রাসুলের দ্যাশ, থাকবোই তো। কী কন মিয়াভাই!

— হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো।
মনটা কেন যেন হঠাৎ করেই ভালো হয়ে গেলো জনাব রায়হানের রিক্সাওয়ালার সাদাসিধে কথা শুনে। আবছা আলোয় রিক্সাওয়ালার অবয়ব দেখে মনে হয়েছে বছর সাতাশ হবে বয়স। পরনে লুঙ্গি, গায়ে বেশ বড়সড় একটা জ্যাকেট। মাফলারে মাথা এবং মুখের অনেকটাই ঢাকা। রিক্সায় ওঠার আগে একটু তাকিয়েছিলেন ওর মুখের দিকে। চেহারা ভালো বুঝতে পারেননি। তবুও ওর হাসিমুখটা ভালো লেগেছিলো। অদ্ভুত এক সরলতামাখা হাসি। কী নির্মল! গাঁয়ের মতোই।

মিষ্টি গন্ধ পেলেন তিনি, খুব চেনা কোনো ফুলের, নামটা মনে করতে পারলেন না। তাঁদের বাড়ির উঠোনের এক কোণে একটা হাসনাহেনার গাছ ছিলো। তাঁর বোন কোথা থেকে যেন এনে লাগিয়েছিলো। মা বলেছিলেন, এ ফুলের ঘ্রাণে সাপ আসে, তুলে ফেল। কিন্তু না, সে তুলবে না। এই ফুল তার খুব প্রিয়, কারণ তার নামও যে হাসনাহেনা! তাহলে কেন তার এ নাম রাখা হলো, কেঁদেকেটে একাকার। শেষপর্যন্ত গাছটি ফেলে দেয়া হয়নি। উঠোনের ওই অংশটা গাছটির জন্যই বরাদ্দ দেয়া হলো। গাছটিও আহ্লাদিত হয়ে ডালপালা বিস্তার করে ফেললো দেখতে দেখতে। সন্ধ্যায় ভরে যেত ফুলে ফুলে। সুবাস ছড়িয়ে পড়তো চারপাশে। এখনও কি আছে সেই গাছটি? আজ কতবছর পর, কত দীর্ঘ ভুলে থাকার পর…. আবার মনে পড়ছে সেসব অতীতের কথা, সেসব প্রিয়জনদের কথা। প্রিয়জন!! কে বললো? কেমন প্রিয়জন তারা জনাব রায়হানের, এতগুলো বছর একবারও মনে পড়লো না তাদের কথা? একবারও না! লেখাপড়া শেষ করলেন, বিয়ে করলেন তারপর….. তারপর আরও অনেক বড় হওয়ার জন্য চলে গেলেন বিদেশ। প্রথম প্রথম খুব চিঠি লিখতেন তিনি বাবা মাকে। ভাইবোনরা কি করছে, লেখাপড়া ঠিকঠাক করছে কিনা? টাকা পাঠাতেন তাদের জন্য। কিন্তু দেশে আসা হয়ে ওঠেনি। প্রথমে নিজেকে তৈরী করতে, তারপর ওদেশে খাপ খাওয়াতে বেশ কয়েকটা বছর চলে গেলো। তারপর…… খুব বেশি খাপ খাইয়ে ফেললেন। চিঠির সংখ্যা কমতে লাগলো, টাকা পাঠানোরও। কমতে কমতে একসময় নাই হয়ে গেলো। তিনি অনেক বড় হয়ে গেলেন। বড় হলে হয়তো কিছু স্মৃতি ভুলে যেতে হয়। মায়া কেটে যায় হয়তো! তা না হলে, সেই যে বিদেশ যাওয়ার আগে শেষ যেদিন দেখা করতে এসেছিলেন, ফিরে যাওয়ার সময় স্টেশনে বিদায় দিতে যাওয়া সবাইকে রেখে যেতে যে কষ্ট হচ্ছিলো, ধীরে ধীরে তা ভুলে গেলেন কেন? কেন আর মনে পড়লো না সেভাবে?
ঝাপসা হচ্ছে আবার তাঁর দু’চোখ। ঢোক গিলতে পারছেন না। গলার কাছে শক্ত একটা কিছু আটকে আছে যেন, সেটা দূর করতেই রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলেন,

— বাড়িতে কে কে আছে তোমার?
— বুড়া বাপ মা আর ভাইবোন। বউও আছে একখান। গলার স্বরে লজ্জা স্পষ্ট।
— ছেলেপুলে আছে?
— জ্বে না, এহনও হয় নাই।
তা মিয়াভাই কি এই গেরামে পরথম আসলেন? মাস্টারসাব আপনার কে লাগে?
খুবই ভালা মানুষ আছিলেন। তয় শেষ বয়সে খুব কষ্টে কাটছে। ছোট পোলাডা ঠিকমতো লেখাপড়া করে নাই। মাইয়াডা কম বয়সে বিধবা হইলো। আর বড় পোলাডা হুনছি বিদেশ থাকে। কুনু খোঁজখবর করে নাই। কঠিন অসুখে বউটা মরলো। ট্যাকার কষ্ট আছিলো, কিন্তু মনের কষ্ট আছিলো আরও বেশি। আসলে কি জানেন মিয়াভাই, ট্যাকা পয়সা হাতের ময়লা। মনের শান্তিটাই বড় কতা। কেমুন পোলা, বিদেশ গিয়া মা বাপরে ভুইলা যায়? আহারে, অমন শক্ত সমর্থ বাপটা পোলার দুঃখে শ্যাষ হয়্যা গেলো!

ভোঁতা হয়ে গিয়েছিলো কি জনাব রায়হানের বোধশক্তি? এই সহজ কথাগুলো তবে ভাবেননি কেন? বাংলাদেশের অখ্যাত গাঁয়ের এক অশিক্ষিত রিক্সাচালক, সে যা জানে, জনাব রায়হান এত লেখাপড়া শিখেও তা জানেন না? বড় হয়েছেন তিনি? কই? বুকের ভেতরটা দুমড়ে যেতে লাগলো তাঁর। পাঁজরের হাড়গুলো যেন চেপে ধরলো তাঁর শ্বাসযন্ত্র। বড় কষ্ট…. বড় বেশি কষ্ট যে আজ তাঁর বুকের ভেতর! কী করে বলবেন তিনি রিক্সাওয়ালাকে, তিনিই সেই ছেলে, যে বৃদ্ধ বাবা মায়ের খোঁজ নেননি? মরিয়া হয়ে ছুটেও আসেননি বাবা মায়ের মৃত্যুসয্যায়! আজ কেন এসেছেন, কী দেখতে? লেখাপড়া না শিখে বখে যাওয়া ছোট ভাইয়ের সুতীব্র ঘৃণা, নাকি ভিটে আঁকড়ে পড়ে থাকা বিধবা বোনের অসহায়ত্ব! পকেটে থাকা দামি মোবাইলটা বেজে উঠলো। সাতসমুদ্র তেরোনদী পারের কল।

— হ্যালো……..
— হ্যাঁ, কেমন আছো? পৌঁছেছো গ্রামে?
— নাহ্, এখনও পৌঁছাইনি।
— বলো কী! আর কতক্ষণ লাগবে? এজন্যেই বলেছিলাম…….

আর কিছুই যেন শুনতে পেলেন না তিনি। শুধু কানে বাজতে থাকলো, কতক্ষণ……. কতক্ষণ? কী করে জানবেন, কেমন করে মাপবেন জনাব রায়হান, কতটা দূরে আজ তিনি সবকিছু থেকে! গাঢ় সবুজ বন, দীঘির কালো জল, বাঁশের ঝাড়, কোথায়! হিজলতলে বাঁধা ডিঙিটার ওপারে ঘন কুয়াশায় ঢাকা অস্পষ্ট দূরত্ব, অতিক্রম করতে পারবেন কি তিনি? কোনোদিন!!

২৪৯জন ৯০জন
8 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ