অতন্দ্র জাগরণ লিপি

রিতু জাহান ৭ জুন ২০২২, মঙ্গলবার, ১১:১০:৪৮অপরাহ্ন অণুগল্প ১৪ মন্তব্য

ছোটো গল্প

‘অতন্দ্র জাগরণলিপি ‘

দীপেন একদম একা এখন। স্ত্রী ওর গত হয়েছে মাস কয়েক হলো।

দিনের ব্যস্ত সময় পার করে বিকেলটা বড্ড কেমন যেনো লাগে। লাগারই তো কথা! এরকম বিকেল এর আগেও আমি ওর বাড়িতে কয়েকবার এসেছি তখন বৌদি বেঁচে ছিলেন। গল্প আড্ডায় চা পানে আন্তরিকতার কমতি ছিলো না কখনো।

আজও দেখি ও বসে আছে কিন্তু এখন একা। একটা টেবিল দুইটা চেয়ার দুই কাপ চা, দু’জন মানুষ।

এখনো সেই গোটা বিকেল, একটা টেবিল, চেয়ারও আছে সামনে তবে ফাঁকা। চা এখন এক কাপ। কাজের ছেলেটা বোবার মতো বসে থাকে। শুধু কি বাজার লাগবে,  এটা দে ওটা দে। কথা শেষ। আমাকে দেখে নির্বাক চোখে চেয়ে শুধু বসতে বলল।

তর্ক, তাচ্ছিল্য করে আবদার করার মানুষটা আজ আর ওর সামনে নেই।সন্তানদের কথা ভেবে ভেবে হা হুতাশ করে জীবন কাটছে আবার যেনো কাটছে না দীপেনের।

দীপেন একদম একা বসে থাকে এখন। এই একলার অবসরে দু একজন লোক যারা আসে তারা বড় প্রয়োজনের তাগিদেই আসে।

 

বলছিলাম আমার বন্ধু দীপেনের কথা।

নামকরা আইনজীবী। ওর স্ত্রী পেশায় ছিলেন শিক্ষিকা।

সন্তানদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে মানুষ করতে। কতোটা হয়েছে!

ওর দুই ছেলে কাছে থাকে।

সন্তানদের ওরা ওদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে তাদের ক্যারিয়ার গড়তে।

 

কিন্তু সন্তানদের ভাগ্য সেরকম ফলপ্রসূ হয়নি। শিক্ষিত হয়েছে অবশ্যই কিন্তু বর্তমান সমাজ সংসার আদতে ক্যারিয়ার বলতে যা বোঝায় সে রকম আয় রোজগারের ক্যারিয়ার গড়তে পারেনি ওরা।

যদিও আমার কেনো যেনো মনে হয় সন্তানদের ক্যারিয়ার নিয়ে ওর হা হুতাশ   অমূলক।

হয়তো আমি ওর দুঃখটাকে স্পর্শ করতে পারছি না। ওর সন্তানরা তো ওর কাছে আছে। ধন সম্পদ যতোটুকু হলে জীবন বেশ অনায়াসে চলে যায় তার সবই দীপেনের ভরপুর। হয়তো ও ভাবছে ওর অবর্তমানে সন্তানদের কি হবে!

ওর নাতী নাত্নিদের চোখের সামনে ও দেখতে পাচ্ছে। দাদার কাছে নাতীদের আবদার করার সুখও পূরণ করতে পারছে। একটা বয়স শেষ করে এসে এটাইতো জীবনের সুখের সুদ অংশটুকু।

স্বাদেরও মাত্রা আছে কথাটা মনে হয় রক্তের সম্পর্কের সাথে যায় না।

 

আমার দুই মেয়ে দুই ছেলে সবাই বাইরে সেটেল। খুব ভালো আছে আপাতদৃষ্টিতে আয় রোজগার ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে যে ভালো থাকা বোঝায় আর কি।

বাড়ি গাড়ি। নাম ডাক কিন্তু দেশে আসতে পারেনি মায়ের মৃত্যুতে। ঈদ পার্বনে ভাই বোনগুলো একসাথে হতে পারে না।

আমাকে তাদের খরচ টানতে হয় না এ কথা ঠিক। কিন্তু আমারও তো ইচ্ছে হয় আমার নাতী নাত্নীদের কিছু দেই। ওরা আবদার করুক।

দিনে বা সপ্তাহে একটা দিন ভিডিও কলে কথা বলে দিন চলছে আমার।

আমিও তো ঠিক এটাই চেয়েছিলাম একটা সময়। আমরা বাবা মা হিসেবে আমাদের সন্তানদের বিদেশে সেটেল করতে চেয়েছিলাম উচ্চশিক্ষা দিয়ে। তখন মনে হতো, না থাকুক কাছে দূরে থেকেও ওরা যেনো খুব ভালো থাকে।

আমি এখন একা হা হুতাশ করি আমার একাকিত্বের। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন সবাই উপহাস করে সমাবেদনা জানায় আমাকে। করুনা করে। অথচ এই পাড়া প্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজন একটা সময় আমার সন্তানদের সাফল্যে হিংসা করতো। বলা যায় আদর্শ ছিলো। হিংসা কথাটা আসলে বাজে শব্দ।

আদর্শ মনে করাটাকেও আমরা হিংসে হিসেবে চালিয়ে দেই।

হা হুতাশ থাকলেও আমার কিন্তু আফসোস হয় না বা সন্তানদের দোষ দেই না। কারণ, বিদেশে বাবা মা হিসেবে আমরাই তাদের সেটেল করেছি।

আমার বড় সন্তানকে যখন ওর মা জোর করে ক্যাডেটে পড়তে দিলো তখন সে বলেছিলো, তার মা তার শৈশব নষ্ট করেছে। আজ আমার বড় ছেলে নামকরা প্রতিষ্ঠানের এ্যাডভাইজার।

তার মায়ের সাথে তার এটাচমেন্ট অবশ্য অন্য মা সন্তানদের মতো না। আলাদা। তার মা প্রচন্ড রাগি হলেও বড় ছেলেকে তিনি সমীহ করে চলতেন সব সময়।

কিন্তু সে বড় ছেলে তার মায়ের মুখটা শেষবারও দেখতে পারেনি।

তার মা-ই তাদের শিখিয়েছে জীবন আসলে রেস,,,, গতি মানে জীবন, স্থিতি মানে মৃত্যু। আমার সন্তানেরা রেস এর ঘোড়া। ওরা চলছেই।

 

আজকাল নিজেকেই বড় দোষে দোষী রেখেই সব গাছাড়া দিয়ে জীবন চলছে যেনো দীপেনের।

বয়সকালের সেই হুঙ্কার দেবার স্বভাব বৈশিষ্ট্য তার স্ত্রী প্রজ্ঞা সাথে করেই নিয়ে গেছে পরপারে।

কম কথা বলা মিষ্টিভাষী খুব নরম দীপেনের স্বভাবের বিপরীতেই যেনো প্রজ্ঞার স্বভাব বৈশিষ্ট্য ছিলো।

দীপেন আজকাল প্রজ্ঞা আর তাদের বেডরুমে থাকে না। শিফট হয়েছে অন্যরুমে।

রুম শিফট করতে আলমারির কোনায় এক ডায়রি পেলো। তাতে কম পৃষ্ঠাই লেখা হয়েছে।

দীপেন রুমে বসে ডায়রির পাতা উল্টালেন।

কি সুন্দর লেখা! ডায়রি পড়তে লেগে গেলেন দীপেন। প্রজ্ঞা বরাবর খুব সৌখিন ছিলো। শাড়ি গয়না ঘরের আসবাব থেকে শুরু করে সব ছিলো নিখুঁত গোছানো পরিপাটি।

 

প্রজ্ঞার ডায়রি-

‘চাকরি শেষ করে নিতান্ত সাধারণ গৃহিনী হিসেবে মধ্য বয়সটা বড় বাজে বয়স মনে হয় আজকাল আমার কাছে। কিছু চুলে পাক ধরেছে, মুখে হালকা দাগ হয়েছে ভাজও পড়েছে।

স্কুল যেতে নিজেকে বেশ পরিপাটি করে রাখতে হতো আমাকে। তাই নিজেকে যত্নে রাখাটা যেনো কাজেরই রুটিনের মতো ছিলো। অথচ আজকাল সে সব যত্ন ছেড়ে দিতে হুট করেই যেনো বয়সটা এগিয়ে যাচ্ছে ইন্টারসিটির গতির মতো।

সংসার শুরুর পর থেকে ব্যস্ত সংসার, চাকরি আর কোলের বাচ্চা কোলছাড়া হলে একান্ত অবসর রাতগুলো এখন তন্দ্রা কখনো অতন্দ্র জাগরনে সমস্ত রাত কাটে আমার। স্বামী তার কেস ফাইল নিয়ে ব্যস্ত।

আইনজীবী হিসেবে তিনি নামকরা। তাকে এই সময়গুলোতে ডেকে এনে বসিয়ে রাখাটাও অন্যায় আবদারই।

আজ মাঝরাতে মনে হলো ঘরের ভিতরটা বড় তেঁতে উঠেছে। ঘরের গুমোট ভাবে ঘুমটা ভেঙে গেছে। মাঝে মাঝে ইদানিং এমন হয়, বিনিদ্র রাত্রির প্রহর গুনতে থাকি। একবার কোনো কারণে ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুম আসতে চায় না। রাতের দ্বিপ্রহরে নির্ঘুম এ সময়টা জীবন পথের কিছু ভুল কদম যা আমার কাছে এই মুহূর্তে ঘুমের কোনো সম্ভাবনাই রেখে যেতে অক্ষম। সে সব ভুল জীবনবোধ এর যন্ত্রণায় অন্তরের উত্তাপের সাথে ঘরেরও যেনো তাপমাত্রা বেড়ে যেতে থাকে।

হয়তো চাকরিটা না করলে বাচ্চারা আমার খুব কাছাকাছি হতো!

হয়তো স্বামীকে আরো বেশি কাছে পেতাম। লাগামছাড়া হতো না অনেক কিছু।

তাকিয়ে দেখলাম আমার ঘরের সমস্ত জানলা বন্ধ। ঘরের সব জানলা বন্ধ করেছি শীত আসাতেই। এটা প্রতিবারই করি। একেবারে বড় আলমারী দিয়ে জানলা বন্ধ করে রাখি। বিশাল বড় বড় দুই আলমারি খাটের দুই পাশে,, দম বন্ধ হবে এমন একটা অবস্থা।

তাড়াতাড়ি বারান্দায় দোলনাতে এসে বসলম।

অনেকখানি জুড়িয়ে গেলো স্নায়ুর তাপ, দেহজুড়ে প্রশান্তি অনুভব করলাম। এখন অনেক রাত।

এ শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে আমার বাসাটা হলেও শেয়ালের ডাক শোনা যায়। সন্ধ্যায় একযোগে চার পাঁচটা শেয়াল ডেকে ওঠে। যদিও এখন একেবারে কোনো শব্দ নেই।

শেয়ালের ডাক আমাকে একদম ভিতরটা শুকিয়ে ফেলে ভয়ে। শেয়াল দেখলে একেবারেই আমার কিছু মনে হয় না অথচ ওর ডাক আমাকে ভীত করে তোলে।

এরও অবশ্য একটা কারণ আছে।

কারণটা হলো- আমার ছোট্টবেলার খেলার সাথী রত্নাদের বাড়িতে আমরা পাড়ার সব ছেলেমেয়েরা খেলতে জড়ো হতাম। ওদের বড় উঠোন, উঠোনের একপাশে ওদের মসজিদ, তারপাশে ওদের পারিবারিক কবরস্থান ছিলো।

খুব ছোটোবেলার স্মৃতি হলেও রত্নার দাদির মুখটা আমার মনে আছে। কি সুন্দর রূপবতী ছিলেন উনি! দুধে আলতা গায়ের উৎকৃষ্ট উদাহরণই মনে হয় উনি।

রত্নার দাদি মারা গেলে কবর দেয়া হলো সেখানে। আগে কবরগুলো বাঁধাই করা হতো না বলে শেয়াল সে কবর খুঁড়ে ফেলতো। সে এক বিভৎস দৃশ্য! ছোটোবেলায় এমন এক দৃশ্য আজও আমাকে ভীত করে তোলে।

 

অনেক দিক থেকে হিসেব করে দেখলাম আমি আদতে একজন ভীত মানুষ। আসলে আমার বয়স যতো বাড়ছে ততো আমি ভীতু হচ্ছি। ছোটোবেলায় দূরন্ত মেয়েটা কবে যে এতোটা ভীতু হলো জানি না। আসলে আমি খুব ভালবাসার মানুষগুলোর দিক থেকে বড় দুর্বল,, সে বলে আমার  আমার নার্ভ দুর্বল।

কালকে ঘরের ডেকোরেশন পাল্টাতে হবে।

কি অদ্ভুত, এমন সব সময়ে স্মৃতিগুলো কোথায় কোথায় যে দৌড়ে চলে!

যদিও স্মৃতি মনে আছে কিন্তু সেই হাফপ্যান্ট পরা অবস্থায় খেলার সাথী অনেকের নাম মনে নেই আমার। মুখটাও মনে নেই।

কখনো কখনো খুব মনে হয়ে, এরা কোথায় আছে? কেমন আছে? দেখতে কেমন হয়েছে?

বউ বাচ্চা, স্বামী সন্তান! কেমন জীবন কাটছে?

মানুষ মাত্রই আসলে কৌতুহল প্রবণ। কতো কিছু যে জানার দেখার ইচ্ছে!

বসন্ত ছুঁয়েছে জানলার পর্দায়ও,,  হিমালয়ের অচলশিখর ভেদ করে আসা উত্তরের হাঁড় হিম করা বাতাস বন্ধ হয়েছে।

জানলার পর্দায় বিরতিহীন খেলা করছে বসন্তের এ বর্বর বায়ু।

আমার কাছে মনে হয়, বসন্তের এ বায়ু বর্বরই। মন উদাস করে ফেলে। দুঃখবিলাসী করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টায় উড়ে উড়ে চলে।

জীবনের সব দিকে পরিপূর্ণ মানুষটাও যেনো কিছুই অনুমান করতে না পারা  অদেখা অভাবে ভুগতে থাকে। নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি আসলেই পরিপূর্ণ?

 

আমার বেডরুমের পাশে বিশাল বড় বারান্দা। আমার দৃষ্টির সীমানা পর্যন্ত এই একচিলতে আকাশ যথেষ্টই মনে হয় আমার কাছে। কি দরকার পুরো আকাশটা চাওয়ার?

তেমনি আমি দেখলাম একজন মাুনষকে পুরোটা চাওয়ার চেয়ে তার ভগ্নাংশই বরং মধুর।

সমস্ত দায়িত্ব শেষ করে বীনা কোনো কৈফিয়ত বিনা কোনো অভিযোগে নিজ ইচ্ছায় কাছে আসা সে ভগ্নাংশ সময়টুকুই যেনো কুমারি মুহূর্ত লাগে আমার কাছে। কোনো শব্দ দূষন নেই, সংসারের মলিন খাতা খুলে বসার তাড়া নেই৷

সেখানে টেনে নেয়া যায় এক বুক নিঃশ্বাস।

সংসার জীবনে অনেক কিছুই সেজে চলে মানুষ,, সেখানে অনেক কথাই আওড়ে যেতে হয় মুখস্ত করা পাট যার অনেকটা মুখের কথা। মনের কথা নয়।

নাট্যমঞ্চ আর সংসার জীবনের পার্থক্য হলো- নাট্যমঞ্চে সামনের দর্শকরা মনে করে তা নিতান্তই অভিনয় কিন্তু সংসারের মানুষগুলো মনে করে তা সত্যি। তাই সত্যি মিথ্যে যাইহোক ভালো আর লাভের তাগিদে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে মিথ্যে সে অভিনয়টাকে আমার অপরাধ বলে মনে হয় না।’

 

আমরা দুই বন্ধু ঠিক করেছি ভারতবর্ষ ট্যুর দিয়ে এসে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাব।

সংসারের জটিল জিনিস মনে হয় এই রান্না বাজার, কাজের মানুষ মেইনটেইন করা।

এই একটা বয়সে এসে আমার আর দীপেনের মতো মানুষদের দুই বেলা ঠিকমতো আহার জুটবে সে যেনো অনিশ্চিত। ব্যাংকে টাকা থাকলেও যেনো আহারটা আমাদের যুৎসই যোগান হচ্ছে না। তাই বৃদ্ধাশ্রম কনসেপ্টটা মন্দ না আসলে।

 

জীবনকে দোষারোপ করে তিল তিল মরার চেয়ে বাকি সময়টা প্রকৃতি ও মানুষের খুব কাছে থাকার এটাই মনে হয় সবচেয়ে উত্তম চিন্তা।

 

দুই বন্ধুর জীবন মিলিয়ে দেখলাম –

সংসারে নয় গো কেউ পুরো সুখি, অতৃপ্তির আলোড়ন যেনো চারপাশ জুড়ে।

 

,,রিতু জাহান,, রংপুর।

 

১৯২জন ২৬জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন



লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য




ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ