অগ্নিকুসুম

শফিক নহোর ১১ অক্টোবর ২০১৯, শুক্রবার, ১০:১০:৪০পূর্বাহ্ন গল্প ২২ মন্তব্য

 

১ম

আলতাফ মাস্টারের পাঁচ মেয়ে পাঁচটা নাঙ ধরছে। আলতাফ মাস্টার বাজারে না গেলেও ঘরের ভেতরে বাজার থেকে , তাজামাছ , শুঁটকি মাছ , পুঁইশাকের ডগা , চিংড়িমাছ , কাঁঠালের বিচি ভাজি সব আসে । নাঙ থাকলে মায়া মানুষের কোন কিছুর অভাব হয়না । আলতাফ মাস্টার মেয়ে দিয়ে আড়ত বসাইছে । বড় মেয়ে সারাদিন দেখি বাজারে দোকান নিয়ে অন্ধকার ভূতের ঘর তৈরি করছে , গ্রামের মাগি মানুষের গা লাগছে শহরের ভূতের হাওয়া, কালো ভূত দরজা দিয়ে ঢুকলে শাদা ফর্সা মানুষ বের হয় ।

মেয়ে মানুষ এখন মরদ বেটাগোরে মত বাজারে গিয়ে বিউটি পার্লারের নাম দিয়া বাল ফেলায় ।

খানকী মাগিরে কাজকাম যা তাই করে ,

-নিরাল ভাই, মনি-আপা তোমার সঙ্গে প্রেমের অফার না করছে , দেখে এত ক্ষেপছো ।

-ধুর শালার পুত , তোর মনিআপার চেয়ে ভাল মেয়ে একখান নোট দেখালে কাঠের পুতুলের মত হা করে আমার পিছনে ছুটে আসবে । এ সমাজে কি সত্য কথা বললে কেউ বিশ্বাস করে ,করেনা রে— টিটু , আমার কথা কেউ বিশ্বাস করে না ।

হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের মতো ফাঁকিবাজ , ডেট ওভার ক্রিম লাগিয়ে , সাত সতের করে

বেটি মানুষের মত মুখে মধু লাগাইয়া কত রঙ্গের কথা বলবে । শরীরে যে পোশাক,  বেটা মানুষ না ,পুরুষ মানুষ বোঝার উপায় নাই । মাগি মানুষের ষোলকলার এক কলা, বাজারের সভাপতিকে দেখাচ্ছে । আমাকে দোকান না দিয়া ফটিক ব্যাপারী পান চিবাইতে -চিবাইতে দাঁত কেলিয়ে সামনে দিয়ে গেলে মনে কয় ছিঁড়া জুতা দিয়া মুখে দুইটা বারি দেই । খাচ্ছর হলে কী মানুষ এত খাচ্ছর হয় । জোয়ান মায়া দেখছে , লোভে কত কি করবে নি ব্যাপারী ।

সন্ধ্যা লাগলে সুন্দরীর দোকানের আশেপাশে ঘুরঘুর করবে । দরজার সামনে লেখা, “ বেটা ছাওয়াল রুমে প্রবেশ নিষেধ , গোপনে রুমে বেটা ছাওয়াল ঢুকলে মনে হয় টাকার দেবতা ঢুকছে । ’’

 

‘শরীরের উপর মশা নাই পড়তে রক্ত না খেয়েই মুচি বাড়ির খালে পা পিছলে পড়া যাবার মত অবস্থা । মিনশীর শরীরের যে গঠন দেখলেই মানুষ ডরে থাকবো , কেমন মাটি সাপের মত নুয়ে পড়ল ’’। হারামির বাচ্চা গো এত শক্তি এখন দেখছি মশার চেয়ে কম ।

লোকজন আসবে আপনি দ্রুত এখান থেকে চলে যান , রুমের ভেতরে ফিসফিস শব্দ আমার কানে আসতে লাগল । কিন্তু কেন জানি মনে হল বাতাসে উড়ে আসছে কথা ভূতের আলাপন মনে হলো । তখন তো মিনুর ঘরে ফটিক ব্যাপারী ছিল না ।অবিশ্বাস হয়েছিল নিজের প্রতি , তাই টিটুকে পাঠানো ; ‘‘যে লাউ সেই কদু ”।

 

– ফটিক ভাই , তুমি কি ভেতরে আছো ।

দরজা খুলে সামনে অন্ধকার লোকটাকে ঝাপসা দেখা যাচ্ছে ।

-আপনি জানেন—না ফটিক ব্যাপারী এখানে থাকে না । এইটা লেডিস পার্লার । মেয়ে মানুষের চেহারা না দেখলে , ভেতরে পুড়ে লুচ্চা কোথাকার ?’

– মনি আপা আমি টিটু ।

– আমি বাজারে থাকি, সব টিটুরে চিনেছি;

কোন কথা বলবি না সোজা চলে যা , না হলে তোর বাপের কাছে বিচার দিব কচ্ছি ।’

 

রিক্তা আলতাফ মাস্টারের দ্বিতীয় মেয়ে , সারাদিন মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটি , মাসে দুই তিনবার সালিশ-দরবার হয় তাকে নিয়ে । বিকাশে কোন ছাওয়ালের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে , আর একজন আসছে বরিশাল থেকে ।  তার না-কি ভুলে  রিক্তার বিকাশে টাকা চলে আসছে , রং নাম্বার কী মেয়ে মানুষের হয় শুধু ! কোথাও থেকে কল আসলেও মেয়ে মানুষের মোবাইলে বেশি আসে । মেয়ে মানুষের মতো এরা একপ্রকার বোতিল /রূঢ় । ফাঁকা গুটি মারবে , দুই একটা পাখি পড়লে পড়বে না পড়লে সাধু মুসাফির । গ্রামের কেউ তাঁরে কোন ইন্তেজাম লাগাইতে পারব না । আজ ক’দিন দেখছি কুত্তার লাহান ঘুরঘুর করতেছে ,

 

চেয়ারম্যানের ছাওয়াল একটা লুচ্চা , তার সঙ্গে যোগ হয়েছে , সরকার বাড়ির ছাওয়াল পল । সারাদিন মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরবে , মেয়ে মানুষ দেখলে তো হুস-জ্ঞান কিছু থাকে না , খানকির পুতের ধরতে পারলে ,

গাঁজা ওর জনমের মতো আজ খাওইয়া দিবো । আজ আবার শুনলাম ,  সুবাস পোদ্দারের বাড়ি থেকে নারকেল চুরি করে খাইছে রাতে , আমার কাছে সুবাসের বউ কান্নাকাটি করে বিচার দিলো ।হিন্দু মানুষ কারো কাছে জোর গলায় কিছু বলতে গেলে পরের দিন রাতে ঘরের চালে ঢিল পড়বে ।

 

– বৌদি আমি তোমার মত সাধারণ মানুষ , দেখি ছাওয়াল পলরে পাইলে বুঝিয়ে বলবো।

কোনমতে তাকে বিদায় করে জাহান কলুর দোকানের সামনে বসে চা মুখে নিতেই ,টিটুর সঙ্গে দেখা ।

 

-বেটা , শোনো আমি তোমারে ভাল জানি , তাই বলছি ; চেয়ারম্যানের পরিবার তো ভালো না । ওদের থেকে সব সময় সাবধানে থাকবে । খালেক ভোট না পেয়ে ব্যাপারী হয়ে গেল । বড় নেতার সাথে সম্পর্ক থাকলে কি—না হয় । বেটা এসব তুমি বুঝবে লয় । খালেক এখন বাজারের সভাপতি দোকান পাট ভাড়া দিচ্ছে , দোকান মালিকের কাছ থেকে টাকা খাচ্ছে , বুড়া হয়ে গেছে বিয়ে করেনি । এ ঘর ও ঘর উঁকি মারার অভ্যাস কি ভাল জিনিস ?’

২য়

এসব মানুষ ভাল চোখে দেখে না । বেলা অনেক হয়েছে , বাড়িতে গিয়ে পেটে দানাপানি কিছু দিতে হবে , ‘ টিটু তোমাকে ভালবেসে বললাম এসব কথা আবার কেউরে বলো না ।টিটুর ঠোঁটের কিনারে জবাব আসতেই বেহায়ার মত হাসি দিয়ে চলে গেল শমসের সরকার।

নিরাল ভাইকে একটা খবর দিতেই , চেয়ারম্যানের পুকুর পাড় দিয়ে যাচ্ছিলাম ; আজ চেয়ারম্যানের বাড়ি মিটিং লোকজনের ভিড় দেখে মনে হচ্ছে খয়রাতি খাবার দিচ্ছে । একটু এগিয়ে যেতেই , রিক্তা আপার সঙ্গে দেখা ,

যখন কেস শুরু হয় , দোষ মেয়ে মানুষের থাকলেও মিনশির উপর গিয়ে দোষ পরবে , আর এটাই স্বাভাবিক নিয়ম আমাদের সমাজে ।

‘ ছাওয়াল মানুষ যেনে খুশি সেখানে যাবি , তাই কি যায় ? সবারি তো মা বোন আছে , তাই নারে টিটু। সারাদিন দেখি ,  মেয়ে দেখলে আষাঢ় মাসের কুত্তার লাহান পিছন পিছন ঘুরিস । আমার সামনে আসছিস ,ভদ্রতা দেখাতে হারামি । তুই আমার দেবর হলে তোরে ন্যাংটা করে দেখতাম তুই সত্যিকার মনশি না-কি মাগি মানুষ ।

কোন কথা কচ্ছিস না ক্যারে মিনশি , শরম পাইছিস ছাওয়াল মানুষের লজ্জা , তলেতলে ঠিকই চলে সব উপরে সাধু সাজাচ্ছিস আমাকে দেখে  শয়তান , কোথাকার । সন্ধ্যার সময় কচ্ছি আসিস একসঙ্গে টিভি দেখেতে যাবো ।টিটিু জোয়ান মরদ বেটা ছাওয়াল , রিক্তা যে ভাবে বলে ইঙ্গিত দেয় টিটু সাধু পুরুষের মত ভদ্রতা দেখিয়ে গেল । অন্য কেউ হলে বিনা সুদে লোন দিতো ।

দিনদিন কত কথা ভেসে আসছে , প্রাইভেট পড়তে গিয়ে মাস্টারের মেয়ে মজিদ স্যারের প্রেমে ডুব সাঁতারে তলিয়ে যাবার উপক্রম ।

-ব্যাপারী , তোমার কাছে আবার এ খবর কে দিলো , এত পাখি ধরো , এ পাখিটা খাঁচায় নিলে না । বড়টারে পোষ মানাতে পারছি না উরুত ফুরত করছে ; আমি বিয়ে করলে তার ছোট বোনরে বিয়ে করবো ।

মাস্টারের সংসার তোমার টাকায় চলে , যেখানে সেখানে মাথা দাও । বয়স হয়েছে , দুই একজন লোকজন সম্মান ও করে , মাস্টারের বড় মেয়ের সঙ্গে তোমার খায় খাতির, বিয়ের প্রস্তাবটা কি আমি দিব । শমসের সরকার কথায় একটু বিক্ষুব্ধ চোখে তাকালো , ফটিক ব্যাপারী

মুখে সিগারেট ধরিয়ে বলল,

শমসের সরকার , তুমি আমার বন্ধু মানুষ । তোমার কাছে সত্যি বলতে আমার কোন লজ্জা নেই।

মাস্টারের মেয়েটার চরিত্র ভাল । আমি জানি সবাই মেয়েটাকে খারাপ ভাবে , আমার সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক কথাটা মিথ্যে । এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে না জানি। তুমিও করবে না । তার অনেক কারণ আছে , সবাই চোখ দিয়ে সবকিছু দেখতে পায় না ।  অনেকেই ভয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে ভয় পায় ।মাস্টার মানুষ তার মেয়েকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি হবে কি ?’

 

তুমি এত করে বলছো , যদিও আমার আর মনির গোপনে প্রেম চলে গ্রামের মানুষজন বলা কওয়া করে ,

ব্যাপারী প্রেম না সবি চলে , পাপ কাজকাম বাদ দিয়ে ঘরে তুলে নাও ।

 

বন্ধু এমন অপবাদ দিও না ।না জেনে না শুনে , না দেখে , মানুষের কথায় কান  দিয়ে , তা বিশ্বাস করো না । কখনো কখনো নিজের চোখে দেখা অনেক জিনিস ও ভুল দেখায় ।তখন নিজেকে বোকা মনে হয়। তোমার অবস্থা দেখছি ঠিক তেমন । তোমাকে বুঝিয়ে কি হবে,অন্ধের কাছে হাতি দেখা গল্প বলার মত ।

মাষ্টার মানুষ সারাজীবন সৎ ভাবে চলেছে , চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরে                                                                                                                                                                                                                                                                                                   প্যারালাইসিস হয়ে ঘরে পড়ে আছে । পেনশনের টাকা বউয়ের স্তন ক্যানসারে পিছনে সব গেছে । ছেলে সন্তান না থাকলে আমাদের সমাজে যা হয় । মেয়েদের দিকে মানুষ এখনো ভাল দৃষ্টিতে তাকায় না । দেশে এনজিও , নারী আন্দোলন ,সামাজিক ভাবে অনেক প্রচার হয়েছে ; মেয়েদের অধিকার নিয়ে । মেয়েরা আজ বড় বড় পোস্টে চাকরি করলেও পুরুষের চোখ সেই কামুক চাহনি আগের চেয়ে বেড়েছে , ভদ্রতার একটা লেবাস ধরে আছে মানুষ সমাজে । ‘‘দেখে মনে হবে মক্কার খেজুর, ভেতরে মাকাল ফল ’’। মাস্টার কিন্তু আমার ও শিক্ষিক, আমি আড়াল থেকে স্যারকে হেল্প করছি ; আমার কথা জানলে কখনো সে গ্রহণ করতো না । মাস্টার মানুষ হচ্ছে দেবতার মত ।

 

টিটু শুনলাম , ফটিক ব্যাপারী নাকি মাস্টারের মেয়েকে বিয়ে করবে , আমিও তাই শুনলাম । এতকাল পিরিত করছে  বড়টার সঙ্গে এখন বিয়ে করবে মেঝটার । ফটিক ব্যাপারী চরিত্রহীন মানুষ । হালে টাকাপয়সা হয়েছে , ভয়ে কেউ কিছু বলে—না।

মনি-আপরে যে যাই বলুক , পরিবারের জন্য নিজের জীবনটা বাজী রেখে ছোট বোনদের মানুষ করছে ।  শুনলাম , রিক্তা না-কি রাজী হয়েছ বিয়েতে ।

 

রাসেল , তোমার তো দেখছি মনেমনে কলা খাওয়ার মত অবস্থা ।মেয়েদেরকে এত বিশ্বাস করতে নেই । সংসার স্বামী ফেলে নাঙের হাত ধরে কতজন চলে যাচ্ছে । মেয়ে মানুষ খাবারের কষ্ট সহ্য করে ও সংসার করে , শাড়ির কষ্ট সহ্য করে , হাজার অশান্তি সহ্য করেও মেয়েরা সংসার করে তবে , একটা জায়গায় পরাজিত হলেই বুকে পা ঠেলে তোমাকে সরিয়ে চলে যাবে এখানে অবাক হবার কিছু নাই ! কেউ-কেউ ভিন্ন হয় হাতের পাঁচ আঙুল তো আর এক হয়না । আমরা যতই সাতপাঁচ ভাবি , আমাদের ভাবনা সত্য নাও হতে পারে । তবে মনি, আপা ভাল একটা মেয়ে । সবাই যখন একজনকে খারাপ বলে , আমি তা বলি—না । মনি আপার ভেতরে কিছু ভাল জিনিস আছে , এই গ্রামে কুটিল সমাজে একটা মেয়ে মেম্বারের সঙ্গে তার যে সম্পর্ক থাকুক না কেন ?’ একটা পরিবারকে সে টিকিয়ে রাখছে ,তার সাহসিকতার তারিফ করতে হয় সত্যি । তবে ব্যাপারী সম্পর্কে আমরা তেমন কিছুই জানতে পারলাম না । গভীর জলের মাছ ।

এ জীবনে চলার পথে কে, কখন পল্টি নিবে কেউ জানে না । সময়  মানুষকে সবকিছু শিখিয়ে দেয় ।

রিক্তা ব্যাপারীকে বিয়ে করে ঠিকই সংসার করছে , মনি আপা গ্রাম ছেড়ে শহরে জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়তো….!

আপন মানুষের কাছে পরাজিত হলে কেউ কেউ অন্য পথ বেছে নেয় । মণিআপা বেঁচে  আছে ঠিক আমাদের বড়ই গাছটার মতো , দেখে মনে হচ্ছে মরা , উপরের ডালের দিকে তাকালে দেখা যায় কচি-কচি চিকন পাতা সদ্য গজাচ্ছে ডালে ।

‘নিরাল ভাই ,তুমি এত চুপচাপ কেন আজ ?’ সত্যি রে টিটু  না দেখে, না শুনে,  না বুঝে, ফটিক ব্যাপারীকে কত অপবাদ দিলাম । মনির জন্য খুব খুব কষ্ট হচ্ছে , চোখের কিনার দিয়ে জলপ্রবাহ , আমি ভেসে যাচ্ছি অপরাধী হিসাবে সপ্তম আসমান ছেদ করে অজানা ঠিকানায় ।

 

 

 

 

 

২৯৫জন ১৭৬জন
3 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য