১৯৭৫ এর  ১৪-ই অগাস্টের খুনীদের রাত্রিকালীন প্যারেড থেকে ঐদিন দিবাগত রাত্রের অর্থ্যাৎ ১৫-ই অগাস্টের কালো রাতের প্রতিটি ঘটনা যেন এখন আমি ছবির মত আমার সামনে দেখতে পাই। এর একটা কারন বোধকরি রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার নথি-পত্র কিংবা ১৫-ই অগাস্ট নিয়ে প্রচুর বই পত্র পড়বার পর খুব সম্ভবত মগজের ভেতর এক ধরনের সুডো জগৎ তৈরী হয়। নিজের অজান্তেই মনে হতে পারে, ছবির মত সব স্পস্ট দেখতে পাচ্ছি।

মনে হয় এইতো ‘পাপা ব্যাটারির’ সব খুনীরা মাত্র রওয়ানা দিলো, এইতো খুনী ফারুক ট্যাংকের ভেতরে ঢুকে রওয়ানা দিলো। এক স্পস্ট চিত্র আমি দেখতে পাই।

বঙ্গবন্ধুর বাড়ী, সেরনিয়াবাত সাহেবের বাড়ি, শেখ মনি সাহেবে বাড়ী, পেট্রোল পাম্পের হত্যাকান্ড, মোহাম্মদ পুরের ১৪ জনের হত্যাকান্ড এইসবগুলো ঘটনা আপনাকে এক মুহূর্তে অসাড় করে দেবে। আপনার মনে হতে থাকবে এত নিষ্ঠুর হতে পারে মানুষ? এত? ঠিক এতটা?

আপনি হিসেব মেলাতে পারবেন না। বিশ্বাস করেন, হিসেব মেলাতে পারবেন না।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার জেরাতে ১০ নাম্বার সাক্ষী মেজর জেনারেল (অবঃ) আব্দুর রব-এর সাক্ষ্য বা জেরার বিস্তারিত জানলে আপনি বিষ্ময় নিয়ে বসে থাকবেন বেশ কিছুক্ষণ।

এই লোক সেনাবাহিনীর সাপ্লাই এন্ড ট্রান্সপোর্ট ব্যাটিলিয়নের অধিনায়ক ছিলো এবং স্টেশন কমান্ডার লেঃ কর্ণেল আব্দুল হামিদ (ফুটবলার কায়সার হামিদের বাবা) ১৫-ই অগাস্টে রবকে নির্দেশ দেয় বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে থাকা সব লাশ দাফন করতে।

বঙ্গবন্ধুর লাশ হেলিকপ্টারে করে টুঙ্গি পাড়াতে নিয়ে যাওয়া হলেও পরিবারের সকল নিহতদের লাশ এই রব সাহেব-ই বনানী গোরস্থানে দাফন করে।

কিভাবে দাফন করে জানেন?

লাশগুলো ঠিক যেভাবে রক্তমাখা ছিলো, যেভাবে সমস্ত অবহেলায় পড়েছিলো ঠিক সেভাবে জাস্ট কফিনে করে ভরে, ট্রাকের মধ্যে এনে কয়েকটা গর্ত খুড়ে সেখানে লিটারেলি ফেলে মাটিচাপা দেয়া হয়েছিলো।

এই তথ্য আমি বানাইনি। খোদ দায়িত্বরত এই মেজর জেনারেল রব সাহেবের জেরাতে এই পুরো ঘটনা উঠে এসেছে। লাশগুলোর একটির-ও জানাজা পড়ানো হয়নি এবং কোন কবরে কার লাশ এটিও শনাক্ত করে রাখেন নি সেনাবাহিনীর এই অফিসার।

কেন রাখেনি?

তার ভাষায়, তাকে নাকি বলা হয়েছিলো যত দ্রুত পারা যায় লাশ ‘ডিস্পোজ” করতে হবে। এই লোকের ভেতরে সামান্যতম কোনো রিগ্রেট দেখা যায়না, সামান্য রিমোর্সফুল হতে দেখা যায়না জেরাতে। সহজ গলায় সে বলতে থাকে, ‘আমাকে যা নির্দেশ দেয়া হয়েছে আমি তা করেছি’।

অনেকেই হয়ত বলবেন, রব সাহেবের কি দোষ? সে নিজে নির্দেশ পালন করেছে। কিন্তু আমি না কোনোভাবেই এটা মানতে পারিনা। এমনকি আসামী পক্ষের আইনজীবিরা তাকে সরাসরি ধরে বসেছে এই বলে যে আপনাদের সেনাবাহিনীর নিজস্ব মসজিদ ছিলো, মেসের সাদা কাপড় ছিলো কিংবা আরো কত উপায় ছিলো কিন্তু করেন নি কেন?

উত্তরে রবের কথা একটি-ই। আমি উপরের নির্দেশ পালন করেছি। সে আবার বলছে আমরা ব্যাক্তিগত ভাবে দোয়া দুরুদ পাঠ করেছি।

রব আবার যুক্তি দিচ্ছে সামরিক আইন জারি ছিলো, কার্ফু ছিলো তাই ইমাম পাওয়া সম্ভব ছিলোনা। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? চাইলেই এই অধিনায়ক সেদিন একজন হুজুরকে যে কোনো এলাকা থেকে ধরে আনতে পারতেন, মৃত লাশগুলোর প্রতি সামান্য সম্মান দেখাতে পারতেন।

সব কিছু যদি বাদও দেই, অন্ততপক্ষে কোন কবরে কে এটির একটা চিহ্ন-ও দিয়ে রাখতে পারত এই মেজর জেনারেল। কিন্তু তিনি কিছুই করেন নি।

আজকের লেখাটা লিখলাম শুধু এটূকু বলতে যে, শুধু খুনীরাই যে খুন করে চলে গেছে তা নয়। এই খুনের সাথে মৌনভাবে জড়িত ছিলো অনেকগুলো মানুষ। যাদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন হয়নি, যারা ভেতরে ভেতরে ঘৃণা পুষে রেখেছিলো বঙ্গবন্ধুর উপর।

এই বাংলাদেশে তারা বহাল তবিয়তে বেঁচে বর্তে মেজর জেনারেল পর্যন্ত হয়েছিলো। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে কোনদিন চার্জ গঠন করেনি। কেন করেনি, আমি জানিনা।

খুনীরাতো এই দেশে একটা বিচারের মধ্যে দিয়ে দুই দশক পর্যন্ত সময় পেয়েছে ন্যায় বিচার চাইবার। হাজতে ডিভিশন পেয়েছে। তিনবেলা আহার পেয়েছে এবং ফাঁসী হবার পর তাদের জানাজা হয়েছে। কোথায় কবর রয়েছে সেই নিশানা পর্যন্ত এই দেশে তাদের হয়েছে।

কিন্তু একবার চিন্তা করেন যারা সে রাতে খুন হলো তাদের কথা।ছোট্ট রাসেল, ছোট্ট সুকান্ত বাবু থেকে শুরু করে সবাই। জানাজা, দোয়া, দুরুদ দূরের কথা। কার কবর কোথায় হয়েছে এটাই আমরা আজও জানিনা। কোনটা কার কবর নিশানা পর্যন্ত নেই।

অথচ এই মামলাতে তাহের উদ্দিন ঠাকুরের আইনজীবি শরফুদ্দিন আহমেদ মুকুল সাক্ষীকে জেরা করে এটি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে মহিতুল ইসলাম যা বলছেন সব মিথ্যে ও বানোয়াট এবং বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সবাই আত্নঘাতি বোমা হামলা করে মরে গেছেন। কেউ তাঁদের খুন করেনি। কেউ সেদিন এই বাসাতে খুন করতে আসেনি।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের নিম্ন আদালতের রায়, হাইকোর্টের রায়, আপীলেট ডিভিশানের রায়, জেরা, জবানবন্দী, যুক্তি-তর্ক, এসব পড়তে পড়তে কেমন যেন ক্লান্ত লাগে। একজন বাংলাদেশী হিসেবে নিজেকে খুব বড় বেশী গ্লানিময় আর অপবিত্র মনে হয়।

যখনই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড নিয়ে পড়ি আর লিখতে বসি তখনই নিজের ভেতরে এক ধরনের সুতীব্র বেদনা ও গ্লানির মিশেল আমাকে একাকার করে দেয়। এই অনুভূতিকে ঠিক কিভাবে লিখলে সেটিকে সঠিক অনুভূতির প্রকাশ বলে অভিহিত করা হবে, আমার সেটি জানা নেই।

এই দেশের জল আর বায়ুতে বড় হওয়া একজন আইনজীবি প্রমাণ করতে চেয়েছিলো বঙ্গবন্ধু খুন হন নি, তিনি নিজে নিজেই গায়ে বোমা বেঁধে মরে গেছেন, তারা প্রমান করতে চেয়েছিলো এই খুন সেদিনের খুনীরা করেনি করেছে অন্য কোনো “তৃতীয় শক্তি”।

তারা বলতে চেয়েছিলো খুনী ফারুক, রশীদ, সুলতান শাহরিয়ার, নাজমুল,আজিজ পাশা, ডালিম, বজলুল, নুর সহ সকলেই নিষ্পাপ।

এই দেশের আমলারা, রাজনীতিবিদেরা, আর্মির অফিসাররা বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার আটাকাবার জন্য অধ্যাদেশ করেছে, সংবিধানে নিজেদের ইচ্ছেমত অনুচ্ছেদ বানিয়েছে, এই খুনীদের সংসদ সদস্য বানিয়েছে, তাদেরকে রাজনৈতিক দল করবার অনুমতি দিয়েছে, রাষ্ট্রদূত বানিয়েছে। ইনফ্যাক্ট এই দেশের মানুষ এদেরকে ভোট দিয়েছে একটা সময়। এই দেশের মানুষ গুজব ছড়িয়েছে বছরের পর বছর এই বলে যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মানুষ নাকি মিষ্টি বিতরন করেছে।

কি বলব এইসব কষ্টের কথা…

আমরা অনেক সময় খুব গর্ব করি এই দেশ নিয়ে, দেশ ক্রিকেটে জিতে গেলে গর্ব করি, কেউ ভালো কাজ করলে গর্ব করি, কেউ অনেক উপরে উঠে বিশ্ব সীমানায় পৌঁছে গেলে সেটি নিয়ে গর্ব করি, আমরা নানা রকমের সুযোগের অপেক্ষায় থাকি এই দেশ নিয়ে গর্ব করবার জন্য।

কিন্তু, বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবার, তাঁর আত্নীয় স্বজনকে হত্যা করবার পুরো অধ্যায়টি পড়বার পর এই দেশের প্রতি আমার এক ধরনের প্রবল অনীহা তৈরী হয়। আমার ভয়ংকর এক ধরনের বেদনা হয়। মনে হয় লজ্জায় আর অপমানে মিশে যাচ্ছি একাকার হয়ে।

নিজেকে একজন চরম বেঈমান জাতির প্রতিনিধি মনে হয়।

২০৮জন ৫৪জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

  • জিসান শা ইকরাম

    পাষণ্ড রব, হামিদ এর বিরুদ্ধে রাস্টের চার্জ গঠন করা উচিৎ ছিলো।
    ৭৫ এর ১৫ আগস্ট হতেই দেশটি উল্টো পথে যাত্রা শুরু করেছে। যা আর থামেনি।
    এরাই আবার প্রমোশন পেয়ে জেনারেল হয়েছে। কতটা পাষণ্ড হলে এমন ভাবে জানাজা ছাড়া, গোছল ছাড়া মাটি চাপা দিতে পারে তা ধারণা করতে পারিনা। এই সমস্ত জেনারেলরা আবার ইসলামের ঝান্ডা উড়ায়।

    অনেক দিন পরে লেখা দিলেন সোনেলায়।
    নিয়মিত লেখা চাই নিঝুম ভাই।
    শুভ কামনা।

  • আরেফিন রাসেল

    এই ইতিহাস জানা ছিলো না। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ইতিহাসে বিরল। জাতির পিতা একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীন করে গিয়েছেন।
    আপনার লেখা আমি নিয়মিত পড়ি। আপনি যেভাবে বিভিন্ন তথ্য উপাত্তনির্ভর লেখা উপস্থাপন করেন, তেমন আমি খুবই কম দেখেছি। প্রচুর লেখেন আপনি। কিছু লেখা এই সোনেলা ব্লগেও দিন।

  • মুক্তা ইসলাম

    সালাম এবং অনেক শুভেচ্ছা নিবেন ভাইয়া। আপনার মত গুণী একজন লেখক সোনেলা পরিবারে আছেন অথচ আমি জানিনা! সোনেলা পরিবারে আপনাকে স্বাগতম। ভাইয়া আপনার মত আমারও একই অভিযোগ। শুধু অভিযোগ বললে ভুল হবে অভিমানও অনেক। এক বুক অভিমান নিয়ে বলতে চাই যে মানুষ আমাদের বাঙ্গালী জাতিকে গোটা একটা স্বাধীন দেশ উপহার দিলো, বাঙ্গালী জাতিকে মাথা উচু করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সাহস এবং অনুপ্রেরণা দিলো অথচ তার এবং তার পরিবারের সাথে এই দেশের মানুষ কি আচরণটাই না করলো। কি বেইমান এই দেশের মানুষ। আপনি সঠিক বলেছেন, শুধু খুনীরাই যে খুন করে চলে গেছে তা নয়। সত্যিই এই খুনের সাথে মৌনভাবে জড়িত ছিলো আরো অনেক অনেক মানুষ। যাদের বিরুদ্ধে কোন চার্জ গঠন করা হয়নি, যারা ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড ঘৃণা পুষে রেখেছিলো বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের উপর। অথচ, এই বাংলাদেশে তারা বহাল তবিয়তে বেঁচে ছিলো এবং শেষ পর্যন্ত মেজর জেনারেল পর্যন্ত হয়েছিলো। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে কোনদিন চার্জ গঠন করেনি। কেন করেনি, তার যথাযথ কারণ জানতে চাই। একজন বাঙ্গালী হিসেবে।

  • হালিমা আক্তার

    অসাধারণ একটি লেখা পড়লাম। রাসেলের মায়া ভরা চেহারা দেখলে, অন্তর আত্মা কেঁপে উঠে। এই শিশু টির বুকে কিভাবে গুলি চালায়। মানুষ এতো নিকৃষ্ট জানোয়ার হতে পারে। বাঙালি জাতি কে না দেখলে বিশ্বাস করা যেতো না। নিজের প্রতি নিজের অনুযোগ হয়। সবচেয়ে অবাক লাগে, এতো গুলো মানুষের হত্যাকাণ্ডের বিচার করা যাবে না,আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো।এ কোন দেশে বাস করছি আমরা। তারা আবার গনতন্ত্রের বুলি আওড়ায়। শুভ কামনা রইলো।

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ