সামরাফিল (পর্ব-২)

 লিখেছেন on জানুয়ারী ৩, ২০১৮ at ২:৫০ অপরাহ্ন  গল্প, সাহিত্য  Add comments
জানু. ০৩২০১৮
 

আরুশা কে ডেকে দিতে বলেন তারা ।
সে তখন বাগান টা পরিচর্যা করছে , তবে সে জানত না , তার কি রকম ভাবে জীবন টা পরিবর্তিত হয়ে যাবে আজকের পর থেকে ।
তারা এগিয়ে এসে , তার সামনে দাঁড়ালেন , তাদের পিছনে এতিমখানার পরিচালক মালভি সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন
ইমাম সাহেব এর নাম হিশাম , আর তার বউ এর নাম আবিদা , তাকে আবিদা চাচি বলে ডাকত আরুশা ,
“মা , তোমার জন্য কয়েকজন লোক এসেছেন , তারা তোমার সাথে কথা বলতে চান , আমরা সবাই চাই”
“কি কথা চাচি” , নিজের গালে লেগে থাকা মাটি মুছল সে
“সেই কথা , যেটা তোমার জন্মের শুরু থেকেই তোমাকে বলা উচিত ছিল কিন্ত আমরা তোমাকে বলতে পারিনি , সেই কথা , যার জন্য বেডফোরড এ তোমাকে মাদার লরা নিজের বুকে আগলে রেখেছিলেন ১২ বছর বয়স তক’’
তোমার বাবা মা এর পরিচয় , আর তাদের পিছনের কাহিনী ।
আরুশা , এর কাগজপত্র গুলো সেই ব্যক্তি পূরণ করে দিলেন , বললেন তার নানি এর মা এর নিকট থেকে বা তার গ্রেট গ্র্যান্ড মাদার এর কাছ থেকে তিনি এসেছেন , তার নাম জানতে চাইলেও তিনি বললেন না ।
আরুশা কে একটা অত্যন্ত চমৎকার প্যাকেট এনে দিলেন তিনি গাড়ির পিছন থেকে , সেখানে লেখা ডাচেস আরুশা বিনতে যশুয়া ওরসন ।
সেখান থেকে বের হল একটা অসাধারণ গাউন , রাজকন্যা রা পরে অনেকটা এরকম ।
‘’আমার নাম এর সাথে ডাচেস কেন ? “
‘কেননা আপনি একজন ডিউক এর সন্তান’ হিশাম জবাব দিলেন , আপনার পিতার নাম যশুয়া ওরসন , তিনি ওয়েলস এর ডিউক ছিলেন ।
‘তারা কি এখন আর কেউ বেঁচে নেই’ ?
সেটার জবাব আপনি পাবেন সেন্টারউড হাউজে , আমাদের সাথে যেতে হবে আপনাকে ।
‘আপনি যাতে ভয় না পান , সেকারনেই আপনার ইমাম চাচা কে নিয়ে আসা’ বলল সেইলোক । তবে আপনার হিশাম চাচা আমাদেরই একজন ।
“আমি কি এখান থেকে আজকেই চলে যাচ্ছি?’’
জি হ্যাঁ , ডাচেস আপনার বড় মা , মানে আপনার নানীর মা এখনও বেঁচে আছেন , তার তরফ থেকেই আপনাকে নিতে এসেছি আমরা , উনার বয়স হয়ে যাবার কারণে উনি আসতে পারছেন না ।
আরুশা , বিদায় নিল তার ছোট সেসব বন্ধু দের কাছ থেকে , যারা এতকাল তাকে একটু হলেও ভালোবাসা দিত’ তবে সেটা সহজ হল না , এরাই ছিল আরুশার জীবন এর ধুসর মরুর মাঝে এক টুকরো মরুদ্যান এর মত । অশ্রু সজল চোখে তাদের কে বিদায় জানাতে হল আরুশা কে ।
এরপরেই চড়ে বসল বিএমডাব্লিউ তে , তাদের সাথে সাথে চললেন মিঃমালভি ।
সেন্টারউড হাউজ টা বিশাল আকার এর একটা অ্যাবি বা ম্যানশন এর মত ।
সেখানকার , হল বা লিভিং রুম এ গিয়ে বসল আরুশা , তার পরনে তখন সেই গাউন টা , রুপালি রঙ এর কারুকাজ করা , মেরুন রঙ এর উপরে , অসাধারণ দামি , তার মাথার উপরে একটা কারুকার্য করা স্কার্ফ শোভা পাচ্ছে , তাকে মনে হচ্ছে যেন প্রাচ্যের কোন এক রাজকন্যা ।
তার সামনের সোফা তে বসে আছেন একজন অতিবৃদ্ধ ব্যক্তি , তার কোঁচকানো চামড়ার মাঝে যেন আলোর দ্যুতি খেলা করে বেড়াচ্ছে
তিনি একটা সাদা আলখেল্লা পরে আছেন ,
ইমাম হিশাম তাকে গিয়ে শেখ বলে সম্বোধন করলেন , অতি আদব এর সহিত তার হাতে হাত রাখলেন ।
বৃদ্ধ শেখ মুখ খুললেন , “আমার ধারণা ছিল না যে রহমতে সাকিনা তে সিক্ত , এই কন্যার দেখা আমি আমার জীবনে পেয়ে যাব , শেকিনাহ এর দেখা আমি পাব’’
আল কুরতুবি এর মতে শেকিনাহ শেষ এসেছিল , বনি-ইসরায়েলি দের মধ্যে , যখন তাদের মাঝে কোন রকম এর সংশয় এর উদ্ভব হত সে তাদের সেই সংশয় দূর করত, আর তাদের কে বিজয়ী করত ‘’
আজকে আরও বেশী প্রয়োজন তোমাকে মা ।
এই কারণে আল্লাহ তায়ালা তোমার আত্নাতে এই মহাশান্তি কে আবারও প্রদান করেছেন ।
এই আত্না, যে কোন মহাযুদ্ধ এর আগে আসেন উম্মতে মহাম্মদি এর নিকট ।
সামনের মহাযুদ্ধ তেও তোমার সাথি হতে এসেছে সে ।
তোমাকে এই কারণেই অপবিত্র রক্তের রিচুয়ালে জড়াতে চেষ্টা করেছিল বিভিন্ন সংহারক শক্তি , যাদের কে আমরা শয়তান বলে থাকি আমাদের ভাষাতে ।
এই কারণেই সন্ধ্যা হতেই তুমি এই সমস্ত ভয়াবহ দৃশ্য কে দেখতে পেতে ।
তোমার সব প্রশ্ন এর উত্তর আমার কাছে নেই , তবে তোমার অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর , যা দিতে পারবে , সেটা আমার নিকট আছে ,
এটা বলে তিনি তার জোব্বা থেকে একটা চামড়াতে মোড়ান ডায়েরি বের করলেন ।
সেটা তার সামনের টেবিলে রাখলেন ,
“এটা তোমার জন্যই , তোমার মা সিদরাতুল মুনতাহা , এবং পিতা যশুয়া ওরসন আমাদের কে বলে গিয়েছিলেন যেন আমরা এটাকে না খুলি , তোমার পিতা যশুয়া ওরসন ছিলেন , ডিউক স্পেন্সার ওয়েলস এর সন্তান , যিনি শেষ জীবনে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন , তোমার মা এর সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার জন্য । তার আরও একটি পরিচয় আছে , তিনি মাবুদ আল্লাহর যোদ্ধা , বা ক্যাভেলিয়ার অফ গড স্যামসন বা শামসুন এবং অতিশক্তিশালী মিস্টিক ম্যাক্সিমাস সিরিল এর বংশজ “
এই ডায়েরি টা তুলে দেখ ,
তুলতেই সে দেখল , দুইটি নাম , প্রথমটি কালের ধাক্কায় অস্পষ্ট বা হতে পারে পানিতে পড়ে যাবার কারণে আবছা
দ্বিতীয়টি সিদরাতুল মুনতাহা এর নাম ।
যাকে তার মা বলে অভিহিত করেছেন তিনি ।
“তবে এটা এখানে পড়া ঠিক হবে না” বললেন আবিদা
তাকে একটি রুমে পৌঁছে দিলেন তিনি , বোঝা যাচ্ছে এটা সম্ভবত প্রেয়ার রুম , এখানে সম্ভবত জিকির হয় , নামায পড়া হয় ।
সেখানে একটা গালিচা এর উপরে বসল সে ।
তার বুকের ভেতর টা ঢিবঢিব করছে সে ছোটবেলা থেকেই জানত যে সে মানসিক রোগী , তবে এখন মনে হচ্ছে যে এটা সম্ভবত সঠিক না ।
সে ডায়েরি টা খুলতেই সেটা একটা অদ্ভুত সুগন্ধ চড়াতে শুরু করল , সে প্রতিটা পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটা চক্রের মত চিহ্ন এর কাছে থেমে গেল , সেখানে কিছু একটা লেখা ছিল , তবে সেটা এখন আর নেই ,
সেটার কাছে আসতেই , সেই চিহ্ন টা আলো ছড়াতে শুরু করল ,
সেখান থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে আসল
“মা , আমার”
এর সাথে সাথেই আরুশা এর ভিতরে যেন একটা শীতল ঝরনা ধারা বয়ে গেল ।
সে ঝিরি ঝিরি পানির ধারার মত একটা দুইটা করে যেন স্পেক বা ঝিলিক দেখতে শুরু করল তার সামনে ।
এরপরেই রুপালি একটা চাদর এসে তাকে ঘিরে নিল ,
সেই চাদর এর মাঝে , সেই স্পেক গুলো একত্রিত হয়ে তৈরি করতে শুরু করল ছবি , সেই ছবি এর প্রথমে সে দেখতে পেল , অস্পষ্টভাবে একটা মেয়েকে , তার বয়সী তবে সেটা তার মা , এটা সে বুঝতে পারল , গর্ভযন্ত্রণা তে ছটফট করছে সে, তার আশেপাশে কেউ নেই , একটা পরিত্যাক্ত বাড়ির ঘিঞ্জি একটা রুমে তার মা , তাকে জন্ম দিচ্ছেন ,
একটু পরেই তার জন্ম হল , একরাশ রুপালি আলোর মধ্যে দিয়ে ,

তাকে কোলে নিল , তখন সে তাকে দেখতে সক্ষম হল বাদামি চুল এর অবিন্যাস্ত চেহারার একটা মেয়েকে , এটাই তার জন্মদাত্রী সিদরাতুল মুনতাহা , এরপরেই সে বলতে শুরু করল ,
“মা আমার , তোকে আমি কিছুই দিয়ে যেতে পারছিনা , তবে জেনে রাখ , তোকে আমি আমার সবকিছুর থেকে বেশী ভালোবাসতাম , চোখের জল ফেলল সে দুইফোঁটা , এই ডায়েরি তে আমার সমস্ত স্মৃতি আছে , যেটা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আলো আর আঁধার এর যোদ্ধা দের সংগ্রাম এর সাথে একাকার হয়ে আছে ,এটা আমি তোর জন্য রেখে গেলাম , তবে হয়ত সবটুকু ঠিকভাবে রেখে যেতে পারছি না , আমি যদিও বা বেঁচে থাকব না আর খুব বেশী সময় , কিন্ত তুই আমার কথাগুলো কে মনে রাখিস , এই প্রতিটা কথা শেকিনাহ হবার কারণে তোর জানা জরুরী।“

এই ডায়েরি তে যা আছে , তার প্রতিটা চিত্র তোর সামনে একঝলক করে করে আসতে থাকবে , আমার এই শিক্ষা আমার এই স্মৃতি আমি তোর জন্য রেখে গেলাম , এই ডায়েরি যেন নিজের কাজ সম্পাদন করে , যার জন্য আমার বাবা মা প্রাণ দিয়েছে , আমার স্বামীকে হারিয়েছি , কিন্ত এরপরেও এই কাজ যেন সে পূরণ করে ,
এখন তুই দেখতে পারবি , সেই গাথা এর সূচনা থেকে যা আমি জানি , আর জানেন , এই ডায়েরীর প্রথম রচয়িতা ম্যাক্সিমাস সিরিল

এরপরেই আলোর বন্যাতে সমসত ঘর ভেসে যেতে শুরু করল , সেই আলোর মাঝেই সে যেন তার মা এর আত্না এর সাথে একাত্ন হয়ে গেল

“এবার তুই সেই ইতিহাস দেখবি , যা আমি দেখেছি” তার অন্তর এর মাঝে ফিসফিস করে যেন বলে উঠল তার মা ।
একরাশ আলোর মাঝে ফুটে উঠল এক বনভূমি এর চিহ্ন , প্রথমে না চিনলেও একটু পরেই সে একাত্ন হয়ে গেল এর সাথে , এর পরেই যে কাহিনী শুরু হল টা এরূপ ………

  ৩টি মন্তব্য, “সামরাফিল (পর্ব-২)”

    
  1. জীবন জিবনই চলে একে বেকে থামে যেখানে গিয়ে।