ভারত ভ্রমণের গল্প-৩

 লিখেছেন on আগস্ট ৬, ২০১৭ at ১২:২৩ পূর্বাহ্ন  গল্প  Add comments
আগস্ট ০৬২০১৭
 

 

যেদিন বর্ডার পাড় হবে, সেদিন বিকালবেলাই জানিয়ে দেয়া হয়েছে; আজ বর্ডার পাড় করা হবে। ঠিক তাই হলো, সন্ধ্যার সময়ই দালালদের তাড়াহুড়ো বেড়ে গেল। সেদিন ঝামেলা একটু কম হয়েছে রমেশদের। কারণ; রমেশ, কানাই আর দুবোন ছাড়া অন্য কোনো ভারত যাবার যাত্রী ছিল না, তাই। মনে হয় বর্ডারে তিনদিন বিরতির মূল কারণ ছিল, যাত্রী সংগ্রহের একটা পন্থা। বর্ডার উত্তপ্ত, লাল সিগনাল, বি.এস.এফ এর কড়া নজরদারি এসব ছিল ভুয়া। বর্ডারে তিনদিনের কষ্টের কথা মনে পড়লেই রমেশে শরীর শিউরে ওঠে। তিনদিন আটকা থাকা অবস্থায়, দালালদের ঘর থেকেও বাইর হতে দেয়নি কাউকে। তিনদিনের থাকা খাওয়ার বাবদ খরচও দেওয়া হয়েছে দালালদের। এছাড়া তাদের কোনো কথার অবাধ্য হওয়া যাবে না; কথার অবাধ্য হলেই মুশকিল। তাদের কথামত সেদিন সন্ধ্যার পর গেল একটা খালপাড়ে।

বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে যখন খালপাড় গেল, তখন খালে কোনো নৌকা ছিল না। রাতের অন্ধকারে খালের পানিতে দেখা যায়, জোৎস্নার ঝিকিমিকি । খালের প্রস্থতা কম হলেও খালটি ছিল দেখতে খুবই সুন্দর। ভারত-বাংলাদেশ বর্ডারে যেমন কাটাতারের বেড়া থাকে; খালপাড় দিয়ে কোনো কাটাতারের বেড়া নাই। খালের এপারওপারে থেকে বর্ডার সীমান্তরক্ষীদের ক্যাম্প। রাত তখন আনুমানিক ৮টা, নিরব নিস্তব্ধ এক জনশূন্য এলাকা। দালালদের একজন মুখ দিয়ে খুব জোরে শীষ দিল। শীষ দেওয়ার সাথে সাথে মাঝি সহ দুইজন লোক একটা নৌকা আসলো। দালালরা বললেন, “তাড়াতাড়ি গিয়ে নৌকায় উঠেন। আর নৌকার মাঝিকে ২০০ টাকা দিয়ে দিবেন। ওপারে যাওয়ার পর, নৌকার মাঝিই সব ব্যবস্থা করে দিবে।”
রমেশ, কানাই আর দুবোনসহ নৌকায় উঠে বসলো, মাঝি নৌকা ছেড়ে দিল। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই দেখা যায় দুইজন লোক দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষায়। নৌকার মাঝি লোক দুইজনকে ভালো করে বলেকয়ে বুঝিয়ে দিলেন। যাওয়ার সময় যেন কোনপ্রকার অসুবিধা না হয়। নৌকার মাঝিকে তার পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে, ওই দুইজন লোকের সাথে রওনা দিল। যাদের সাথে রমেশ, কানাই যাছে, তাদের দিতে হবে ৪০০ টাকা। তাদের কাজ হলো, বনগাঁ যাওয়ার গাড়ীতে উঠিয়ে দেওয়া।

চারিদিকে শুধু সবজি খেত, মাঝেমধ্যে খালি জায়গা। বাড়িঘর খুব একটা নাই, বর্ডার এলাকায়। আছে কদ্দুর পরপর বি.এস.এফ এর ক্যাম্প। রমেশের খুব ভয় ভয় লাগছে, যদি বি.এস.এফ এর ছোঁড়া গুলি গায়ে এসে লাগে! সেই ভয়ে রমেশ কাঁপছে আর হাটছে। দালালসহ রমেশ, কানাই আর দুবোন যাচ্ছে খুব সাবধানে। প্রায়ই আধাঘণ্টা হাটার পর, শোনা যাচ্ছে গাড়ির শোঁ শোঁ শব্দ। রমেশ তখন প্রভুকে ডাকছে মনে মনে, হে প্রভু! তুমি রক্ষা কর! এভাবেই একসময় একটা পাকা সড়কের সামনে সবাই এসে দাঁড়াল। বনগাঁ যাবার গাড়ি আসার আগেই এপারের দালালদের ৪০০ টাকা বুঝি দেওয়া হল। বনগাঁ যাবার গাড়ি আসতেই দালাল হাত নেড়ে সিগনাল দিল, গাড়ি থামলো। দালাল দুইজন রমেশদের নেওয়া ব্যাগগুলো বাসে উঠিয়ে দিয়ে বিদায় নিল। বাস থেকে সবাই নামল বনগাঁ রেলস্টেশন। রমেশ কানার আর দুবোন যাবে শিয়ালদা, ট্রেন ছাড়বে রাত ১০ টায়। বাস থেকে যখন নামলো, তখন রাত ৯ টা, ট্রেন ছাড়তে একঘণ্টা বাকি।

অনেক পথ হেটে আসার পর বড্ড খিদা পেয়েছে রমেশের। তাই রমেশ কানাইকে বলল, “হে রে কানাই! এখান থেকে কিছু খেয়ে নিলে হয় না? আমার খুব খিদে পেয়েছে রে!”
রমেশের সাথে তাল মিলিয়ে কানাইর দুবোনও বলল, “সত্যি দাদা, খুব খিদা লেগেছে, কিছু খেয়ে নিলে ভালো হয়।”
কানাই বলল, “এখানে কিছু এদিক সেদিক ব্যাপার আছে, সবাই একসাথে যাওয়া যাবে না। সবাই একসাথে গেলেই বিপদে পড়তে হবে, আর নানারকম ঝামেলাও হবে। কারণ, এখানকার মানুষ খুবই চালাক, আমাদের দেখেই বুঝে ফেলবে আমারা বাংলাদেশী। তখন হয়ত পুলিশের ভেজালেও পড়তে পারি।”
কানাইর দুবোন বলল, “তাহলে কী কিছু খাওয়া যাবে না?”
কানাই বলল, “আগে স্টেশনের ভেতরে যাই, পরে দেখা যাবে।”
রমেশ বলল, “চল তাহলে, স্টেশনের ভেতরে যাই!”
সাবাই আস্তেধীরে রেলস্টেশনে দিকে রওনা দিল। ভেতরে গিয়ে নিরিবিলি এক জায়গায় সাথে নেওয়া ব্যাগগুলো রাখলো। এরপর কানাই বলল, “রমেশ তুই ব্যাগগুলোর সামনে একটু দাঁড়া, আমি ওদের নিয়ে হোটেলে যাই। ওদের নিয়ে আসার পর, তোকে নিয়ে আবার বাইরে যাবো।”
রমেশ বলল, “যা আমি আছি এখানে, একটু তাড়াতাড়ি আসবি।”
কানাই স্টেশনের বাইরে যাবার আগে বলল, “কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বুঝে শুনে জবাব দিবি। আর কেউ যদি জিজ্ঞেস করে যে, কোথায় যাবেন? তাহলে বলবি, শিয়ালদা যাবো। যদি জিজ্ঞেস করে কোত্থেকে এসেছেন? তাহলে বলবি, বনগাঁ হাই স্কুলের পূর্বপাড় থেকে এসেছি। বেশি কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলে বলবি, আপনার এতো দরকার কী? উল্টো তাকেই প্রশ্ন করে বসবি যে, আপনার বাড়ি কোথায়? কোথায় যাবেন? এখানে কেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তাহলে দেখবি, প্রশ্নকারী ব্যক্তি তোর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এদেশ হলো শক্তের ভক্ত, নরমের যম, বুঝলি।”

চলবে…যতদূর সম্ভব।

  ৪টি মন্তব্য, “ভারত ভ্রমণের গল্প-৩”

    
  1. যাক ঝামেলামুক্ত বর্ডার পার হলো, দেখা যাক সামনে কি হয়।

  2. 
  3. এভাবে বর্ডার পার হওয়া!
    ভাবতেছিলাম, এই বুঝি বিএসএফ পাকড়াও করলো,

    ভালই লাগছে পড়তে,
    পরের পর্ব দিন।