ভারত ভ্রমণের গল্প-১

 লিখেছেন on আগস্ট ৩, ২০১৭ at ১:৩৫ পূর্বাহ্ন  গল্প  Add comments
আগস্ট ০৩২০১৭
 

রমেশ ও বনিতার শুভ বিবাহের দুইবছর পর দেখা মেলে নতুন অতিথির। তাদের কোলজুড়ে আসে একটি মেয়ে সন্তান। মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রেখেছে অনিতা। কিন্তু তখনো অভাব রমেশের পিছু ছাড়ছে না। রমেশের বেতন মাত্র ১৭০০ টাকা, তার উপরে বাসা ভাড়া, খাওয়া খরচ। তবু চলছে রমেশের অভাবের সংসার, খেয়ে না খেয়ে। কাজ করে নারায়ণগঞ্জের কোনো এক কাপড়ের মিলে। ছোটখাটো কাপড়ের মিলের কাজ হলো সিজন কাজ। যেমন বলা হয়; সিজন আর গড়সিজন। যত্রতত্র কাপড়ের মিল থাকলে, সেই কাজের কি মূল্য থাকে? থাকে না। কষ্টের সাথে যুদ্ধ করে চলতে চলতে কেটে গেল বছর দুয়েক।

রমেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কানাই থাকে ভারতের কোনো এক জেলাশহরে। কানাই কাপড়ের মিলের কাজ ছেড়ে ভারত চলে যায়। কানাই সেখানে গিয়ে স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করে। কানাই ভারত যাওয়ার পর, ওর বাবার মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়েও কানাই এদেশে আর আসেনি। তখন এই যুগের মোবাইল ফোন ছিল না, ছিল চিঠি প্রেরণের দিন। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল ডাক বা পোস্ট। যেটির মাধ্যমে চিঠি আদানপ্রদান করা হতো। কানাইর সাথে যোগাযোগ ছিল শুধু চিঠির মাধ্যমে, মাসে নাহয় বছরে।

রমেশ দিনদিন সংসারের অবনতি দেখে বেশি বেতনে অন্য মিলে কাজ নেয়। কাপড়ের মিলটা হলো ঢাকা সদরঘাটের ওপারে। জাগার নাম কালিগঞ্জ তেলঘাট, মিলের নাম রশিদ স্লিক। বেতন মোটামুটি ভাল, হেল্পার সহ মাসে ৫০০০ টাকা। স্ত্রী বনিতাকে নিয়ে ভাড়া বাসায় কালিগঞ্জই থাকত। এখানে থাকতেই আরেক সন্তানের মা হতে চলল বনিতা। এবার রমেশ বনিতার নতুন মুখ পুত্র সন্তান। রাতদিন কাজ করে যাচ্ছে রমেশ, শুধু সংসারে সুখের জন্য।

একদিন বিকালবেলা হঠাৎ এক লোক রশিদ স্লিকে এসে রমেশের খোঁজ করছে। রমেশ তখন মিলের বাইরে চা’দোকানে। চা’দোকানে বসা থাকতেই, মিলের দারোয়ান রমেশের সামনে উপস্থিত; সাথে আগত লোকটি। লোকটিকে রমেশ প্রথম চিনতেই পারছিলেন না। মিলের দারোয়ান লোকটিকে বলছে, “এইযে, রমেশ বাবু।”
লোকটি রমেশকে দেখেই হাসছে, কিছুই বলছে না। রমেশ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই লোকটি বলছে, “কি রে, কেমন আছিস?”
রমেশ একটু থতমত খেয়ে জবাব দিল, “ভালো আছি! তো আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না।”
লোকটি শুধু হাসছে, হাসতে হাসতে রমেশের সামনে গিয়ে বসলো। রমেশের সামনে বসেই জিজ্ঞেস করছে, “মাসিমা কেমন আছে? শুনেছি তোর মেয়ে হয়েছে! ওরা কেমন আছে?”
এতক্ষণে রমেশের হুশ হয়েছে! রমেশ বলছে, “আ-রে কানাই, তুই! কবে আসলি? আমিতো এতক্ষণ তোকে চিনতেই পারছিলাম না।”
কানাই বলল, “আমি বুঝতে পেরেছি, আমাকে দেখে তোর একটু চিনতে সমস্যা হচ্ছে। তাই আগে পরিচয় না দিয়ে সামনে এসে বসলাম।”
রমেশ জিজ্ঞেস করল, “তোর বাচ্চাকাচ্চা কয়জন? বউকে সাথে নিয়ে এসেছিস?”
প্রত্যুত্তরে কানাই বলল, “আ-রে না, আমি তো এখনো বিয়েই করি নি, বাচ্চা আসবে কোত্থেকে?”
রমেশ হেসে বলল, “বলে কী! তুই এখনো বিয়েই করিছ নি? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। সত্যি করে বল!”
কানাই উত্তর দিল, “সত্যি বলছি! আমি এখনো বিয়ে করিনি।”
রমেশ এবার প্রসঙ্গ পাল্টে দিয়ে বলছে, “বল কবে এসেছিস? আর তুই জলপাইগুড়িতে মাঝেমধ্যে যাছ নাকি? ওখানে আমার বড়দি থাকে।”
কানাই উত্তর দিল, “এইতো, গতকাল সকালে এসে পৌঁছেছি। জলপাইগুড়িতে আমি একবার গিয়েছিলাম, তা-ও একদিনের জন্য। যদি আগে জানতাম, তোর বড়দিদি জলপাইগুড়িতে থাকে; তো অবশ্যই দেখা করতাম। আর হ্যাঁ, আসার পর থেকে তোর কথা ভীষণ মনে পরছে। তাই কোনো দিকে না গিয়ে, সোজা তোর এখানে চলে এলাম।”
রমেশ হেসে বলল, “বেশ করেছিস! আজ আমার এখানেই থাকবি। আমার বাসা সামনেই, এখান থেকে ৫০ গজ দূর হবে!”
রমেশ চা’দোকানদারকে আরও তিন কাপ চা দিতে বললেন। কানাই বলছিল ও-চা পান করবে না। রমেশের চাপের মুখে পড়ে আর না করতে পারে নি। দারোয়ান চাচাও সামনে আছে, হয়ত একটু চায়ের জন্যই উনি অপেক্ষা করছিলেন। তিন কাপ চায়ের কথা শুনে এবার সামনে এসেই বসলেন। দারোয়ান চাচা জিজ্ঞেস করলেন, “বাবু আপনার কী হয়?”
রমেশ বললেন, “আমার ছোটভাই, ভারত থেকে এসেছে চাচা।”
দারোয়ান চাচা দাঁত বিহীন মুখে হাসি দিয়ে বললেন, “আমি ওনার কথা শুনেই বুঝতে পেরেছি, উনি এই দেশের না। কতো সুন্দর ভাষা! এই সুন্দর ভাষা জীবনেও শুনি নাই, বাবু।”

হোটেলবয় চা এনে দিলেন, তিনজনে চা পান করলেন। দারোয়ান চাচার সিগারেটে অভ্যাস আছে, তা রমেশ আগেই জানত। তাই দারোয়ান চাচাকে একটা পাঁচ টাকার নোট দিয়ে বললেন, “চাচা, এটা দিয়ে আপনি সাদা বাঁশি কিনে নিয়েন।”
দারোয়ান চাচার বুঝতে আর অসুবিধা হলো না যে, সাদা বাঁশি কী এবং কাকে বলে?
দারোয়ান চাচা পাঁচ টাকার নোটখানা নিয়ে হোটেল ত্যাগ করলেন। দারোয়ান চাচা চলে যাবার পর, কানাই রমেশকে জিজ্ঞেস করল, “সাদা বাঁশি কী রে?”
রমেশ উত্তর দিল, “সিগারেট বুঝলি সিগারেট।”
কানাই, “ওহ! আচ্ছা এবার বুঝেছি।”

রমেশ উঠে দাঁড়াল, কানাইকে বলল, “চল মিলে যাই। মিলটা তোকে দেখিয়ে যাবো বাসায়। বাসায় গেলে বাচ্চার মা খুব খুশি হবে। কতদিন পর তুই এলি! তোকে দেখামাত্রই চমকে উঠবে।”
কানাই বলল, “তাহলে যাওয়া যাক! আগে মিলে না বাসায়?”
রমেশ বলল, “আগে মিলে যেতে হবে, মাস্টার বাবু থাকলে ওনার কাছে বলেকয়ে যাবো।”

রমেশ হোটের চায়ের বিল দিয়ে, কানাইকে নিয়ে মিলে গেল। মিলে তখনো মাস্টার বাবু আসেনি, দায়িত্বে আছে ম্যানেজার। কানাই পুরো মিলটা ঘুরেফিরে দেখল। দেখা শেষে বলল, “চল এবার।”
রমেশ ম্যানেজারকে বলে কানাইকে নিয়ে বাসায় রওনা দিল। যেই বাড়িতে রমেশ ভাড়া থাকে, সেই বাড়ির গেইটের সামনে রমেশে স্ত্রী দাঁড়িয়ে আছে। তার কোলে ছিল ছোট ছালেটি, যেটি কয়েকমাস আগে পৃথিবীর আলো দেখেছে। রমেশের স্ত্রী কানাইকে ঠিক চিনেই ফেলেছে। বনিতা জোর গলায়ই বলে ওঠল, “আ-রে কানাইদা, কেমন আছেন? কবে আসলেন? আগে জানান নাই কেন?”
কানাই হেসে বলল, “জানাই নাই তাতে কী হয়েছে বৌদি? খোঁজ নিয়ে তো চলে আসলাম।”
রমেশের স্ত্রী বলল, “আসেন, গরিবের বাসায়।”
কানাই বলল, “সবাই তো গরিব বৌদি।”

কানাই সহ সবাই বাসার ভেতরে গেল। রমেশ কোনোরকমভাবে ছোট একটা বাসায় থাকে। যেই বেতন পায়, তাতে হেল্পার সহ সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়। শুধু হেল্পার, সংসার কেন? সাথে দুটি বাচ্চাও আছে। ওদের জন্য দুধ আর ঔষধে কী কম খরচ হয়? বুড়োদের চেয়ে বেশি খরচ হয় শিশুদের খরচ। তাই খুব কষ্টের মধ্যেই রমেশের সংসার চলছে। কানাই সংসারের সব বিত্তান্ত রমেশের স্ত্রীর কাছ থেকে শুনলো। বাসার অবস্থা দেখে কানাই বুঝতে পেরেছে রমেশ কষ্টে আছে। কানাইকে চা’বিস্কুট দিয়ে রাতের খাবের প্রস্তুতি নিচ্ছিল রমেশের স্ত্রী। কানাই সেটা টের পেয়ে বলল, “বৌদি কষ্ট করে কিছু করার দরকার নাই, আমাকে নারায়ণগঞ্জ যেতে হবে। মায়ের কাছে বলে আসিনি।”
কানাইর কথা শুনে রমেশের স্ত্রী বলল, তা কী হয় দাদা? এতদিন পরে এলেন, অথচ কিছু খাবেন না, তা হয় না। অন্তত রাতের খাবারটা সেরেই যাতে হবে।”
কানাই বলল, “না বৌদি আজ নয়, অন্যদিন আবার আসবো। সেদিন সবাই মিলেমিশে দুপুরে একসাথে খাবো। আর হ্যাঁ, আমি ভারতে থাকি, ওখানে কাপড়ের মিলের অভাব নাই। আমার ইচ্ছা, রমেশকে আমার সাথে ভারতে নিয়ে যাবো। রমেশ ওখানে মাসেক ছয়মাস থাকলেই, একটা লাইন করে নিতে পারবে। তার জন্য তোমাকে মাসেক ছয়মাস একটু কষ্ট করতে হবে।”
কানাইর কথা শুনে রমেশের স্ত্রী বলল, “কানাইদা, কষ্টে আছি সেই বিয়ের পর থেকেই। আপনি যখন বলছেন, তাতে নাহয় আর একটু কষ্টই করি!”
রমেশের স্ত্রীর কথা শুনে কানাই বলল, “হ্যাঁ বৌদি, একবার একটু কষ্ট করলেই হলো। তবে এবার এসেছি যখন, রমেশকে আমি সাথে নিয়েই যাবো। তুমি রমেশকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলো, আমি আর ১৫ দিন আছি।”

এই কথা বলেই কানাই রমেশের বাসা থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় নারায়ণগঞ্জ। রমেশ তার স্ত্রীকে বলল, “কানাই যে ভারত যাওয়ার কথা বলে গেল, এখন তোমার অভিমত কী?”
রমেশের স্ত্রী বলল, “তুমি যদি ভারত যাও, তবে তো চাকরি, বাসা দুটোই ছাড়তে হবে।”
রমেশ বলল, হ্যাঁ তাতো ছাড়তেই হবে, তুমি মাসেক ছয়মাসের জন্য বাপের বাড়িতে থাকবে। ওখানে একটা ব্যবস্থা করে নিতে আমার বেশ একটা সময় লাগবে না। আমি মাসেক তিনমাস পর এসে তোমাকে নিয়ে যাবো।”

অবলা নারী, স্বামীর কথায় বিশ্বাসী, তাই স্বামীর কথায় অমত করেনি। স্বামী যেভাবে বলছে, তাই মেনে নিচ্ছে। কথা হয়ে গেল পাকাপাকি, চলছে বাসা ছড়ার প্রস্তুতি আর চাকরি ছাড়ার ঘোষণা। যেই কথা সেই কাজ, এখন শুধু ভারত যাবার পালা। কাজের অবসরে নিয়মিত কানাইর সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে রমেশ। পাসপোর্ট নাই, কানাই বলেছে সমস্যা হবে না। কানাইও পাসপোর্ট ছাড়াই দেশে এসেছে, কোনো সমস্যা হয় নাই। কানাইর সাথে ওর বিয়ের উপযুক্ত দুই বোনও যাবে। কারণ; এখানে বাবা নাই, ভাই একটা আছে; সেও পরের চাকরি করে খায়। তাই দুই বোনকে সাথে নিয়ে যাবে, বিয়ে সাদি ভারতেই দিবে। ওখানে বাংলাদেশী মেয়েদের জন্য বরের অভাব হয় না, যা কানাইর মুখের কথা।

চলবে… যতদূর সম্ভব ।

  ৯টি মন্তব্য, “ভারত ভ্রমণের গল্প-১”

    
  1. জীবন কাহীনি পড়লাম কস্টের আর দুঃখের সামনের পর্বের জন্য অপেক্ষায় রইলাম। -{@

  2. 
  3. দাদা, যা বুঝলাম এইটা গল্প যা খুব ভালোভাবেই লিখছেন, কিন্তু এ ভ্রমণ হবে কেন, গল্প সিলেক্ট করে দেবেন, আরো পর্ব পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।

  4. 
  5. ভাল লাগল, চালিয়ে চান।