নভে. ০২২০১৭
 

কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম, নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ। সেখানে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের একটা অফিস আছে। অফিসটা ঠিক নিতাইগঞ্জ চৌরাস্তার দলদেব জিউর আখড়ার সামনেই। আমি চৌধুরীবাড়ি থেকে একটা ইজিবাইকে চড়ে প্রথমে গেলাম চাষাঢ়া। সেখান থেকে একটা রিকশা নিয়ে যাচ্ছিলাম নিতাইগঞ্জ চৌরাস্তায়। ডিআইটি মার্কেট পাড় হয়ে মণ্ডলপাড়া পুল থেকে রিকশা নামছিল। দুইদিকেই আসাযাওয়ার রাস্তা, এটাকে নাকি বলে, ওয়ান বাই ওয়ান রোড। সামনেই প্রাচীনতম ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল, এরপর সিটি কর্পোরেশনের নগর ভবন। ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল পাড় হয়ে নগর ভবনের সামনে গিয়েই, তাজ্জব বনে গেলাম। এলোপাথাড়ি দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক-পিকাপ আর ঠেলাগাড়ি দেখে।

আমার ভাড়া করা রিকশাটি জ্যামের কারণে আর দোয়েলচত্বর পাড় হতে পাড়ল না। আমি বিরক্ত হয়ে রিকশাওয়ালাকে বিদায় করে দিয়ে মনে মনে ভাবছি। একবার শুনেছিলাম নগর ভবনের সামনে কোনও ট্রাকস্ট্যান্ড নেই। তাহলে রাস্তার এপারে-ওপারে এগুলি কী? শুধু দেখছি সারিবদ্ধভাবে থাকা ট্রাক আর ঠেলাগাড়ি। আমাদের নারায়ণগঞ্জের নগর ভবনটি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নগর ভবনের মতো সুন্দর নয়। সুন্দর না হলেও, সেই প্রাচীন আমলের তৈরি করা মোটামুটি শহর আন্দাজ মানানসই আছে। নগর ভবন যতটুকুই সুন্দর আছে, সেই সৌন্দর্য আর কারও চোখে পড়ে না। কারণ, সমস্ত সৌন্দর্য গ্রাস করে ফেলেছে, মালামাল বহনকারী ছোট-বড় ট্রাকগুলোতে। এসব খালি-ভরা ট্রাকের জন্য নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী নগর ভবনটি যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে।

নগর ভবনের সামনেই একটা চৌরাস্তা, নাম দোয়েলচত্বর। এই দোয়েলচত্বরের সামনেপিছনে, ডানে-বামে শুধু ট্রাক আর ট্রাক। সাথে শতশত ঠেলাগাড়ি, সাথে লোড-আনলোডের শ্রমিক। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পণ্য নিয়ে ট্রাকগুলো আসে, এই নিতাইগঞ্জ। নিয়ে আসা সেই মালামালগুলো ট্রাক থেকে নামানো হয়, নগর ভবনের সামনেই। আবার খালি গাড়িতে যাবতীয় মালামাল ওঠাচ্ছে, এই নগর ভবনেই সামনেই। এভাবে লোড-আনলোডের জন্য সৃষ্টি হয় যানজট। আবার সবসময় রাস্তায় লেগে থাকে গাড়ির দীর্ঘ লাইন।

এসব দৃশ্য আমি হয়ত আচমকা দেখলাম, অনেকদিন পর নারায়ণগঞ্জ শহরে গিয়েছি বলে। হঠাৎ যদি দেশের অন্য কোনও জায়গা থেকে কেউ আসে, তা হলে বুঝে নিবে এটা স্থায়ী ট্রাকস্ট্যান্ড। অথচ এই ট্রাকস্ট্যান্ড বহু আগেই এখান থেকে পঞ্চবটী হস্তান্তর হয়েছিল। হস্তান্তর করেছিল শুধু নগর ভবনের সৌন্দর্য রক্ষার্থে। কিন্তু_কাজের কাজ কিছুই হয়নি, ফল হয়েছে তার বিপরীত। এখন ট্রাক ড্রাইভাররা প্রভাব খাটায় দুই জায়গায়। একবার পঞ্চবটী, একবার নিতাইগঞ্জ নগর ভবনের সামনে। এখন মনে হয় এটা স্থায়ী ট্রাকস্ট্যান্ড হয়ে গেছে। এসব দৃশ্য দেখে নিজে নিজেকে কিছু প্রশ্ন করলাম। প্রশগুলো হলো, এসব কী হচ্ছে? নির্ধারিত স্থানে ট্রাকস্ট্যান্ড থাকতে এখানে কেন? নগর মাতা কি এসব চোখে দেখে না? প্রশাসন ক্যোথায়? কিন্তু প্রশ্নগুলোর কোনও সদুত্তর মেলাতে পারিনি। প্রশ্ন শুধু নিজে নিজেকে করা, উত্তর পাওয়া যায় না।

যাই হোক, নিতাইগঞ্জ সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস অফিসের কাজ সারলাম। এবার বাসায় ফেরার পালা, আসবো ফলপট্টি হয়ে কালির বাজার। আসার সময়ও যানজটের কারণে একইরকম বিড়ম্বনা। অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ডের কারণে যানজট শুধু নিতাইগঞ্জ-ই নয়। যানজট সৃষ্টি ১নং রেল গেইট সংলগ্ন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের জন্য। শহরের প্রাণকেন্দ্রে এই বাসস্ট্যান্ড, এখন নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লঞ্চঘাট সম্মুখে এই বাসস্ট্যান্ডেটি বহু পুরাতন। যখন এই বাসস্ট্যান্ড আবির্ভাব হয়েছিল, তখন নারায়ণগঞ্জে জনবসতিও কম ছিল। লোকসংখ্যা কম ছিল, যানবাহন কম ছিল। তখন হাতে গোনা কয়েকটা মড়ির টিন নামের বাস ছিল। ওইগুলোর সার্ভিস ছিল, নারায়ণগঞ্জ টু সদরঘাট। আর ছিল কিছুসংখ্যক সুপিরিয়র কোচ। ওইগুলো নারায়ণগঞ্জ থেকে যাতায়াত করত, গুলিস্তান। তাই যখনকারটা তখনকার জন্য ছিল উত্তম, এখনকার জন্য নয়। এখন শহরের প্রাণকেন্দ্রে এই বাসস্ট্যান্ড হলো মরনব্যধি বাসস্ট্যান্ড।

কারণ, নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রবেশদ্বার পাঁচটি। সেগুলো হলো: নারায়ণগঞ্জ টু চিটাগাং রোড, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড, নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা রোড, নারায়ণগঞ্জ-মোক্তারপুর রোড। আরেকটি হলো, নারায়ণগঞ্জ থেকে বাবুরাইল হয়ে ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ রোড। এসব রোডগুলোর মধ্যে তিনটে রোডই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফতুল্লা রোড, লিংক রোড, আর চিটাগাং রোড। যাত্রী সেবায় নিয়োজিত এসব পরিবহনগুলো যখন সরাসরি শহরের প্রাণকেন্দ্রে ঢুকে পড়ে, তখনি শুরু হয় যানজট। যাত্রীবাহী সব বাসগুলো ঢোকে নিউ মেট্রো সিনেমাহল দিয়ে। যায় কালি বাজার হয়ে ১ নং রেল গেইট, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড। বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসগুলো ছেড়ে ২নং রেল গেইট হয়ে চাষাঢ়া, সেখান থেকে ঢাকা। শহরের মাঝখান দিয়ে শখানেক বাস আসাযাওয়ার ফলে, যখনতখন লেগে থাকে যানজট। নিতাইগঞ্জ থেকে আসার সময়ও যানজটের কারণে, ফলপট্টি আর আসতে পারিনি। চেম্বার রোডের মাঝপথেই রিকশা বিদায় করে দিলাম।

তারপর পায়ে হেটে ফলপট্টি হয়ে কালি বাজার আসলাম। সেদিন বুঝলাম কেন এই মহা যানজট। আর দেখলাম যানজট কাকে বলে। এই যানজট হলো শহরের প্রাণকেন্দ্রে মরনব্যধি বাসস্ট্যান্ড আর ট্রাকস্ট্যান্ডের জন্য। আরও আছে প্রাচীন আমলের একটা রেলস্টেশন, তাও শহরের মধ্যখানেই। দিনদিন মানুষ বাড়ছে, গাড়িও বাড়ছে। বাড়ছে না কোনও রাস্তার বিকল্প রাস্তা। আবার নেই কোনও ফুটওভারব্রিজ। মানুষ রাস্তা পারাপার হয়, এই যানজটে ভেতর দিয়েই। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ শহর হলো উন্নয়নের মডেল। কিন্তু এই যানজটের কারণে সব উন্নয়নকে ম্লান করে দিচ্ছে। এখন আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করে, “এই যানজট থেকে নারায়ণগঞ্জবাসীকে মুক্ত করতে হলে কী করতে হবে?” আমি সোজা কথায় উত্তর দিবো, “আগে শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে মরনব্যধি স্ট্যান্ড দুটি সরিয়ে অন্য জায়গায় নিতে হবে। তা হলেই নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে যানজট চিরতরে বিদায় নিবে।” তবে এই দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিবে কে? প্রশাসন না-কি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র? এই প্রশ্নের উত্তর কার কাছে পাবো? মনে হয় পাবো না। আপনাদের কাছে এর উত্তর আছে কি?

  ৬টি মন্তব্য, “নারায়ণগঞ্জ শহর যানজট মুক্ত করতে হলে, কী করতে হবে?”

    
  1. সকল মনে শৃঙ্খলা আসলে কাজে আসবে নইলে না।

  2. 
  3. শহরের মধ্যে স্ট্যান্ড!! অবাক হলাম জেনে।
    শহরের প্রানকেন্দ্রে স্ট্যান্ড থাকলে যানজট কখনোই কমবে না।

  4. 
  5. নারায়নগঞ্জ কখনো যাওয়া হয়নি। শহরের ভেতর স্ট্যান্ড শুনে অবাক হলাম।