ডির্ভোস (পথিকের গল্প)

 লিখেছেন on ডিসেম্বর ৬, ২০১৭ at ১০:৩১ অপরাহ্ন  গল্প  Add comments
ডিসে. ০৬২০১৭
 

হাজার সমস্যার দেশে বেকারত্বই আমাদের দুইজনের একমাত্র সমস্যা, অন্যসব পিছনে রেখে দিয়েছি। গৌধুলির সূর্যও ইদানীং বিরক্তির কারণ হয়ে দাড়াচ্ছে। তবে সমস্যা কেবল আমারই হচ্ছে বেশি কারণ পথিককে এই সব নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবতে আমি দেখিনি, বরং তাকে দেখে মনে হয় এই মুহূর্তে তারচেয়ে সুখি মানুষ সমগ্র পৃথিবীতে দুটো পাওয়া যাবে না। তবে আমার ভাবনা ভুল হতেও পারে, মনে মনে মন কলা খেলে ত আর মুখ দেখে বলে দেওয়া যায় না কি চলছে তার মনে। ইদানীং লক্ষ্য করছি রাত জেগে পত্রিকা পড়া, মাঝে মাঝে অনলাইনে এটা সেটা খুলে খুব মনযোগ দিয়ে পড়ছে। জটিল সব পরিসংখ্যান ঘাটাঘাটি করছে। উদ্দেশ্য বা কারণ জিজ্ঞেস করার মত কিছু হয়নি, শুধু দেখেই যাচ্ছি।
বিকেলের সূর্য ডুবতে যাচ্ছে, বারান্দায় বসে পাশেই নতুন গড়ে উঠা বিল্ডিং এর কর্মযজ্ঞ দেখছি। হাতে একটা পত্রিকা এগিয়ে আসতে আসতে পথিক বলল, ভাবছি ভালো প্রোডাকশন পেলে একটা সিনেমা বানাবো তোমার লেখা গল্পটা দিয়ে। তোমাকেও দিব এক লাখ।
আমি স্কিপ্ট রাইটার নয়। যদি হইতাম তবে প্রফেশনাল লেখালেখি করতাম, কিন্তু সেই সম্ভবনা নেই বলেই এখনো একটা বই প্রকাশ করার চিন্তাও করি নাই। একরাশ বিরক্তি মুখে নিয়েই কথাটা বললাম।
প্রফেশনাল বানানোর জন্য বলি নাই, তোমার গল্পটা কেমন হয়েছে তা বুঝাতে বলেছি, তাছাড়া বই বের না করলেও তোমার গল্পত প্রকাশ হচ্ছেই।
তা হচ্ছে, কিন্তু এক লাখ টাকা দিয়ে কি তুমি গল্পটাকে ভালো হয়নি বুঝাতে চাইছ? আমার জানা মতে স্কিপ্ট রাইটার এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা পেয়ে থাকে।
বিষয়টা এভাবে না ভেবে উল্টো ভাবে ভাবতে পারতে। যাইহোক পত্রিকার নিউজটা দেখ।
পত্রিকাটা হাতে নিয়ে বললাম, গল্পটা কখন পড়লে? কি দেখে মনে হল গল্পটা নিয়ে সিনেমা বানানো যায়?
তোমার ব্যাখাটা সুন্দর হয়েছে, দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাসটা ভালো নয়। কথা শেষ করতে করতেই ঘরে পথিকের ফোনটা বেজে উঠল। ফোন ধরার জন্যই ঘরের দিকে রওনা দিল পথিক। আমিও পত্রিকা উল্টে নিউজটা দেখা শুরু করলাম, ইংরেজি দৈনিকে হেড লাইন দিয়েছে, Divorce doubles, separation triples in one decade, তারপর লেখার প্রথম প্যারায় লাইন দিয়েছে, The rate of people getting divorced and living separately from their spouses almost doubled over the last decade, revealed a recent Bangladesh Bureau of Statistics (BBS) report.
পুরু লেখাটাই মনযোগ দিয়ে পড়লাম তবে লেখাটা ঠিক হজম করতে পারলাম না, দুয়েকজন বিজ্ঞ জ্ঞানীর মতামত উল্লেখ্য করেছে সাথে কয়েকটা সংস্থারও। আর হজম না হওয়ার কারণটাই এখানে।
ভাবনাটা এলোমেলো হয়ে গেলে মুর্হুতে। ঘরে পথিক উচ্চবাক্য করে কথা বলছে, কিছু শব্দ আমার কর্ণগোচর হচ্ছে বটে, তবে স্পষ্ট বুঝতে পারছি না কি নিয়ে কথা বলছে, শুধু এইটুকু বুঝতে পারছি কাউকে ধমকাচ্ছে। অন্যদিকে আমার ভাবনাগুলো শাখা প্রশাখা মেলতে শুরু করেছে।
রাতে খাওয়ার পর বিছনায় শুয়েও যখন ভাবনাটা মাথা থেকে নামাতে পারছি না তখন পথিককে বললাম, বিষয়টা কেমন হল?
পাশ ফিরে শুয়ে ছিল পথিক, আমার কথা শুনে ঘুরে বলল, কোন বিষয়টা?
পেপারে যে লিখল?
কেন জ্ঞানীদের মতামত পড়নি?
কিন্তু হজম করতে পারছি না।
তোমার মত মানুষের ত এমনটা হওয়ার কথাই, অতি সাধারণ বিষয় নিয়েও যারা দীর্ঘ মেয়াদী চিন্তাভাবনা করে তাদের কাছে এটা তো মহাযজ্ঞ ভাবার জন্য।
তোমার কি মনে হয়?
আমার কি মনে হয় তা দিয়ে কি হবে? দেখ আমাদের দেশে আলোচনা করার মত অনেক বিষয় আছে, গবেষণা করার মতও কিন্তু মানুষ করছে টা কি? তোমাদের অর্থনীতির ভাষায় কি যেন বলে? শর্টর্টাম লংর্টাম, আমাদের দেশের বিজ্ঞ মানুষের চিন্তাভাবনাগুলো ছেলে মানুষি ভাবনা হয়ে গেছে, বাচ্চাদের মত পকেটে দুটো চকলেট আছে, একটা এখন খাও তারপর আরেকটা খাও, কাল কি ভাবে সেটা কাল দেখা যাবে।
আমি আর কিছু বললাম না, বুঝতে পারলাম এখন এই বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রশ্নের পর প্রশ্নের বেড়াজালে ফেলবে আমাকে, তারচেয়ে সে যখন নিজে থেকেই কিছু বলবে তখন আর এত ঝামেলা করতে হবে না।
আমার নিরবতা দেখে পথিক বলল, ঘুমাও এবার, কাল সকালে এক জায়গায় যাবো।
আমি বললাম, কাল আমার একটা ইন্টার্ভিউ আছে।
গুরুত্বর্পূূণ কি?
পথিকের কথাটা আমার পছন্দ হলো না, কারণ এই মুহূর্তে একটা চাকুরি পাওয়াই বড় কথা, সেটা কোথায় কি কাজ তা বড় নয়। মুখে একটা ভাবলেশহীনতা এনে তার মুখের দিকে তাকিয়ে টেবিলের উপর থেকে হাত বাড়িয়ে পানির বোতল নিয়ে পানি খেয়ে কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম।
পরেরদিন সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গল পথিকের ডাকেই,ইন্টার্ভিউ দিয়ে আস আমিও ঘুরে আসি। হ্যা তোমার পকেট থেকে একশো টাকা নিয়েছি আমি বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। অদ্ভত এক খেয়ালে চলা এই মানুষটা আমাকে যখন তখন এই পরিস্থিতে ফেলে ভাবলেশহীন করে দেয়।
টেবিলের উপর সদ্য লেখা গল্পের একটা প্রিন্টেট কপি আর গতকালের সেই পত্রিকাটা দেখলাম। বুঝলাম সত্যিই গল্পটা ভালো লেগেছে পথিকের, নয়ত সে প্রিন্ট দিত না। হাতে নিয়ে দেখলাম পুরু গল্পটা নয় শুধু মাঝের কয়েকটা পেইজ প্রিন্ট দেওয়া, শেষে বড় বড় অক্ষরে লেখা যুক্তিগুলো ভালো লেগেছে কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এগুলো মানবে না বা স্বীকার করবে না।
নিজের লেখাগুলোই বসে বসে পড়া শুরু করলাম। নব্বইয়ের দশকে এই দেশের মানুষেরা বই পড়ত প্রচুর, ক্লাস ফাইব পাশ করা ছোট্ট মেয়েটাও ঘরে পড়ে থাকা বই নিয়ে অবসরে বসে পড়ত পড়ার জন্য। বিনোদন বলতে তাদের কাছে বইটাই ছিল প্রধান। আর এই সময়টাতেই এক শ্রেনীর লেখক তৈরি হয় যারা সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য যা ইচ্ছে তাই লিখে বই প্রকাশ করত। আবার দেখা যেত সংসারে যারা বড় আছে তারা যে বইগুলো কিনত তা অধিকাংশ কিশোরদের জন্য উপযুক্ত নয়। খুব কম পরিবার ছিল যারা তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য বই কিনে দিত পড়ার জন্য। মাধ্যমিকে পড়া ছাত্রছাত্রীরা একে অন্যের কাছে বই ধার নিয়ে পড়ত বা টিফিনের টাকা বাচিঁয়ে বই কিনে পড়ত। আর এই সব মানহীন লেখাগুলো খুব কম দামে পাওয়া যেত বলে এগুলো সহজলভ্যও ছিল বেশি। তখন সেই সব বই পড়ে একটা কাল্পনিক জগৎ তৈরি হত এই সব অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মনে, আর টিনএজ বয়সের সেগুলো ছিল মোহের মত। এই শতাব্দির শুরুতে বিনোদন এর একটা জায়গা দখল করে নেয় টেলিভিশন। আর তখন সপ্তাহান্তে দুটো করে সিনেমা দেখানো হত টেলিভিশনে, যে সব সিনেমার একটা বড় অংশ থাকত প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য, কিন্তু দূরভাগ্য হলেও সত্য যে সেগুলো পরিবারের জন্য সব সদ্যসদের সাথে বসেই উপভোগ করত ছেলেমেয়েরা। রুমান্টিকতার এমন একটা আবহ সিনেমায় তৈরি করা হয় যা দেখলে সবাই মোহগ্রস্থ হয়। অন্যদিকে বই পড়ার একটা অভ্যাস ছিল কম বেশি সবার মাঝে,আর বইয়ের পাতায় একই দৃশ্য পড়ার ফলে একটা ঘোরের মাঝে চলে যেত ছেলেমেয়েগুলো টিনএজ বয়সেই। একটা সময় কিছু ছেলেমেয়ে সেই মোহে আবিশষ্ট হয়ে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে যায়, কিন্তু সংখ্যাটা নেহায়েত কম বলেই তেমন কোন প্রভাব পড়েনি সমাজের উপর, উপরন্তু সমাজের কিছু নিদিষ্ট বেড়াজাল ছিল যা কেউ এড়িয়ে যেতে পারত না।
পরবর্তীতে ইন্টারনেট সহজ লভ্য হওয়া শুরু হল, আর ফেইজবুক এলো দেশে। অধিকাংশ বেকার মানুষ তাদের সময় কাটানোর মাধ্যম হিসাবে বেছে নিল এই মাধ্যমটাকে, কিন্তু এখানেও তারা যখন শান্তি পাচ্ছিল না তখন শুরু বিপরীত লিঙ্গের কারো সন্ধান করা শুরু করল এবং পেয়েও গেল। ক্রমেই পবিত্র সম্পর্ক প্রেম সহজলভ্য হয়ে গেল, আর প্রেম হতে যতক্ষণ ভাঙ্গতে তারচেয়ে কম সময় লাগা শুরু হল। কিন্তু ভয়ংকর হল এই মাধ্যমটাকে ব্যবহার করে একশ্রেনীর পশু তাদের পশুত্ব প্রদর্শন শুরু করল। মানুষগুলো ক্রমান্নয়ে নিজের সাথেই নিজের বিছিন্নতা ঘোষনা শুরু করল। যে ছেলেটা আগে বন্ধুদের আড্ডা মাতাতো গল্প বলে বা অন্য কিছু করে সে এখন সবার থেকে আলাদা থাকে বা ফেইজবুকীয় ভাবনায় ডুবে থাকে দিনের অধিকাংশ সময়। এক দিকে কর্ম ঘন্টা নষ্ট হতে লাগল অপর দিকে কিছু মানুষ জড়িয়ে গেল বিকৃত কিছু সম্পর্কে। পরিসংখ্যান ও বের হল এই নিয়ে, বছরে কয়েকশত কোটি টাকার কর্ম ঘন্টা নষ্টের পাশাপাশি আরো কত কি। তবে ভালো দিকও তো আছে প্রত্যেকটা বিষয়ের। ভালো কিছুও হয়েছে এই সময়টাতে।
কিছুদিন আগেই পত্রিকায় একটা রিপোর্ট দেখে পথিক বলেছিল, সময় হয়েছে ভেবে দেখার আমাদের তরুন প্রজন্মকে নিয়ে। নিউজটা ছিল এই রকম, প্রতিদিন শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে একশোর উপরে। গতকালকের নিউজটা অবশ্য এই সব বিষয়ে নয়, বরং বিষয়টা ছিল ডির্ভোস নিয়ে। গত দশকের দ্বিগুন হয়ে গেছে ডির্ভোসের হার।
আশ্চর্য্যজনক হলেও কিছু মানুষ এতে নেগেটিভ কিছু দেখছে না বরং তারা ভালো কিছুই দেখছে। কেউ কেউ দুই হাত এগিয়ে এটা নারীর স্বনির্ভরতা, স্বাধীনতা হিসাবেও দেখা শুরু করেছে। ওরা ওদের জায়গায় ভেবেছে, কিন্তু আমার ভাবনাটা অন্য জায়গায়। যখন কোন ডির্ভোস এর ঘটনা ঘটছে তখন সেটা স্বাভাবকি ভাবেই দেখা উচিৎ সাথে এটাও ভাবা উচিৎ যারা ডির্ভোস এর মত কাজ করছে তারা নিশ্চয় খুব শখ করে এটা করছে না। কিন্তু একটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। যে পরিবারগুলো ডির্ভোস হচ্ছে বা আলাদা থাকছে তাদের ঘরে যদি কোন সন্তান থাকে তবেই ভাবনার শুরুটা হয়। সিঙ্গেল মাদার, গর্ভভাড়া, এই বিষয়গুলো কিছু যৌক্তিক কারণেই আমি বা পথিক মেনে নিতে পারিনি। গর্ভভাড়ার ক্ষেত্রে যে সন্তান জানেনা তার মা কে, যার জন্মই হয় একটা কৃত্রিম উপায়ে সে কি করে এই প্রশ্নের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে। সন্তান বড় করার ক্ষেত্রে মা বাবা উভয়ের অবদান অনস্বীকার্য, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, তাহলে যে সন্তান তার মা কে বা তার বাবা কে তা জানেনা সে কি করে স্বাভাবিক মানুষের মত হতে পারে? যাদের টাকা আছে তাদের কথা ভিন্ন, ইদানীং তো সব কিছুই কৃত্রিম কিনতে পাওয়া যায়, তবে আদর ভালোবাসাও কি কিনতে পাওয়া যায় কিনা তা বলতে পারি না। তবু প্রাকৃতিক আর কৃত্রিম বলে শব্দগুলো আছে,যা অগ্রাহ্য করা যায় না।
বিখ্যাত এক লেখকের লেখায় পড়েছিলাম, রক্তের ধারা বইতে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। তবে এটা বলতে চাইছি না যে গোবরে পদ্ম হয় না, হয় তবে রক্তের ধারাটা কিন্তু থেকেই যায়।
সন্ধ্যার পর পথিক ফিরে এলো, বেশ উসকখুসক অবস্থা, কেমন যেন বির্মষ লাগছে তাকে। ঘরে ঢুকে সোজা বাথরুমে, ফ্রেস হয়ে ফিরে এসেই বলল, খাবার কিছু আছে?
আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে সোজা রান্না ঘরে গিয়ে খাবার খোঁজা শুরু করল, কিন্তু খাবার থাকলে ত খুজে পাবে। রান্না করার ইচ্ছে ছিল না বিন্দুমাত্র তাই রান্না করা হয়নি। ড্রয়ার থেকে বিস্কুট বের করে দিয়ে বললাম চিড়া খাবে? ভিজিয়ে দিব?
দাও
বিস্কুট খেতে থাকো, আমি ভিজিয়ে নিয়ে আসছি।
ভিজানো চিড়া নিয়ে এসে দিলাম তার হাতে কিছুক্ষন পর। আমার দিকে ফিরে বলল, তুমি খাবে না?
আমি বললাম, না তুমি খাও।
পথিক নিজের বিছানার উপর বসে চিড়া খাওয়া শুরু করল, আমি নিজের বিছানায় গিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে আরাম করে বসলাম। জানি কিছু বলতে হবে না, বলার মত কিছু থাকলেও সে নিজে থেকেই বলবে না থাকলেও কিছু বলবে। তবে তার মুখে দেখেই বুঝলাম কিছু হয়েছে।
পরপর দুইবার চিড়া মুখে তুলে নিয়ে বলল, দিনদিন মানুষগুলো খুব জটিল হয়ে যাচ্ছে। এই টুকু বলেই থেমে গেলো।
আমিও চুপ করে রইলাম। ত্রিশ সেকেন্ড, একমিনিট নিরব থেকে বলল, বছর দুই আগে কলাপাড়ায় বিয়ে খেতে গিয়েছিলাম মনে আছে?
আমি মনে করার চেষ্টা করলাম, কলাপাড়ায় বেশ কিছু বিয়ে খাওয়া হয়েছে গত দুই তিন বছরে,কার কথা বলছে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। আমার মস্তিস্ককে ব্যস্ত না করতে দিয়ে পথিক বলল, আরে ভুলে গেলে, নোমানের চাচাত বোনের বিয়ে।
মনে পড়ে গেল, নোমান পথিকের পরিচিত, ওর বন্ধুর অভাব নেই, নোমান তাদের একজন। বললাম, সেখানেই গিয়েছিলে?
হ্যা। নোমানের সেই বোনের ডির্ভোস হয়ে গেছে।
বল কি? বাচ্চা হওয়ার খবর না শুনেছিলাম। বললাম আমি।
হ্যা ঠিকই শুনেছিলাম, আজ দেখেও এলাম বাচ্চা মেয়েটাকে। গুটি গুটি পায়ে হাটে, দেখতে খুব কিউট। সব বাচ্চাদের মতই।
ঘটনা কি বিস্তারিত বল।
বিস্তারিত কি করে বলি বল, যা ঘটে তা কখনো রটে না, যা রটে তা হয় অতিরঞ্জিত বা সংক্ষিপ্ত। তবে যেটুকু বুঝেছি তাতে এটাই একমাত্র কারণ হতে পারে না ডির্ভোস এর জন্য। আমার মনে অন্য বিষয় নিয়ে সন্দেহ ঘুরপাক খাচ্ছে।
বিস্তারিত না বললে বুঝব কি করে?
বিয়ের পর সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল, একমাত্র মেয়ে তাই বাপের বাড়িতে মেয়ে আর মেয়ের জামাই উভয়ের সমাদর কখনোই কমে নাই বরং উতরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে, তারউপরে মেয়ের প্রথম সন্তান হয়েছে এই খুশিতে উভয় পরিবারেই সুখ ছিল। ইন্টারে পড়া একটা মেয়ে এক সন্তানের মা হলেও তার রঙ্গিনস্বপ্নগুলোতে কোন বাধা পড়েনি, বরং এই বয়সে যে স্বপ্নগুলো ছিল তার সবকিছুই পূরণ হচ্ছিল।
ওদের ভাষ্যমতে মেয়ে জামাই নাকি মাস ‍দুয়েক আগে স্ত্রীর সাথে রসিকতা করতে গিয়ে বলে, সে বিয়ের আগে এক গরিব মেয়ের সাথে প্রেম করত। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে সে প্রেম করেছে কিনা বিয়ে আগে? বোকা মেয়ে কিছু না ভেবেই নোমানের কথা বলে দেয়, সে নাকি নোমানের সাথে প্রেম করত। চালাক চতুর বর সেই দিনই মেয়েকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। তারপর থেকেই শুরু হয় অশান্তি, প্রথমে সন্দেহ পরে দোষারূপ। অন্যদিকে নোমান আর সেই মেয়ে চাচাতো ভাইবোন আর বাড়িও এক সাথে তাই তাদের মাঝে স্বাভাবিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। বরের সাথে এই সম্পর্কের কথা জানত কেবল মেয়ের ভাই, মা আর বাবা মানে নোমানের চাচা,চাচি আর চাচাত ভাই। নোমানও এই বিষয়ে অবগত ছিল না। হুট করে একদিন ছেলে ডির্ভোস লেটার পাঠিয়ে দেয় মেয়ের নামে, আর তখনই জানতে পারে নোমান এই ঘটনা। ঘটনার শুরু এখানেই,প্রথমে সবাই মিলে ধরে মেয়ের বরকে, কিন্তু বর দোষারূপ করে নোমান আর মেয়েকে। এই নিয়ে শুরু হয় উভয় পরিবারের মাঝে ঝগড়া বিবাদ। নোমানের চাচা নোমানকে বলে তার মেয়েকে বিয়ে করতে, কিন্তু নোমান কিছুতেই রাজী নয়। এই নিয়ে বিবাধ আরো চরম পর্যায়ে যায়। অন্যদিকে ঐ মেয়ে মানুষিক আঘাতে আঘাতে নিজের জীবনের প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে, শেষোক্ত মরার পরিকল্পনাই করে বসে, এবং তার দিনক্ষনও নির্ধারণ করে ফেলে গতকাল। কিন্তু গল্পের শেষদৃশ্যে নায়কের ভূমিকায় আবার সেই নোমান, আর তাতেই ঘাটের মড়া ঘাড়ে এসে বসে নোমানের। সে কিছুতেই বিয়ে করবে না, কারণ সে অন্য আরেকজনকে পছন্দ করে, তারচেয়ে বড় কথা এই মেয়েকে সে নিজের বোনের চেয়ে বেশি কিছু ভাবতেই পারে না। অন্যদিকে নোমানের বাবা মা কেউ রাজী নয় এই বিয়ে নিয়ে।
কথা থামাল পথিক, আমি বললাম মেয়ে বেচেঁ আছে ত?
সে বেচেঁ আছে কিন্তু আমার ভাবনা হল ওর বাচ্চাটাকে নিয়ে। দুইদিন পর আরেকটা ঝামেলা পাকাবে, মেয়ের অভিবাবকত্ব নিয়ে। আজব একটা সিস্টেম দেখ এখন, বাচ্চা মেয়ে যার বয়স এক বছর এখন কেউ তার দ্বায়ীত্ব নিতে চাইছে না, বাধ্য হয়েই মেয়ের মাকেই নিতে হচ্ছে বাচ্চার দ্বায়ীত্ব, কিছুদিন মেয়ের বাবা বলবে মেয়ে আমার আর তখন শুরু হবে ঝামেলা।
তো সমাধান কি হলো? বললাম আমি।
কোন সমাধান নেই, ওরা যা ভালো মনে করবে তাই করবে, আমি তো আর নোমানকে বলে বিয়ে করিয়ে দিতে পারি না, তাতে নোমানের স্বপ্ন নষ্ট হবে, সাথে আরো কিছু মানুষের। আর এর ফলাফল ভালো হবে না, অন্যদিকে যে স্বামী তাকে ডির্ভোস দিয়েছে তার ঘরেও ফিরে যাওয়ার সম্ভবনা বা সুযোগ নেই, আর এর ফলাফলও ভালো হবে না। কেন হবে না তাও আমি তোমাকে কাল বলে দিতে পারব, আজ শুধু সন্দেহ এর কথাটা বলতে পারি।
বুঝতে পেরেছি, ঐ ছেলে অন্য কারো সাথে সম্পর্ক রাখে, তাই এই মেয়েকে ডির্ভোস করা প্রয়োজন ছিল তার। যতদূর দেখেছিলাম মনে পড়ে ঐ ছেলে আমাদের চেয়েও বয়সে ছোট হবে। রক্ত গরম ছেলে, বাপের টাকায় বিয়ে করে স্বপ্নের রঙ্গিন ‍দুনিয়া দিয়ে বাস্তব দুনিয়া রাঙ্গাতে চেয়েছিল। কিন্তু মন ভরছি না, তাই মন ভরাতে অন্য চাকে মধুর জন্য ভ্রমণ করেছে। বললাম আমি।
ঠিক তাই। কিন্তু আমার ভাবনাটা হচ্ছে কোথায় জান?
কোথায়?
এই যে পিচ্চি মেয়েটা, সে কি শিখবে? কি জানবে?
আমি চুপ করে রইলাম। পথিক আবার বলা শুরু করল, এই মেয়ে বড় হবে তার প্রতিটি পদে পদে বাধার সম্মুখীন হবে। আর সবগুলো বাধাই মানুষিক। খেলার সাথী থেকে শুরু করে সবাই বলবে এর বাবা-মা আলাদা থাকে, মেয়ে বাবা বা মা একজনের সম্পুর্ণ ভালোবাসা, আদর,স্নেহ বঞ্চিত হবে আর অন্যজনের কাছে যা পাবে তাও পূর্ণ নয়। তারপর ধীরে ধীরে সে বড় হতে শুরু করবে আর নিজের জ্ঞান দিয়েই সে উপলব্দি শুরু করবে তার বাবা মা স্বার্থপর, নিজেদের স্বার্থের জন্য নিজের মেয়ের জীবনের একটা অধ্যায় অন্ধকার করে দিয়েছে। আরো বড় হবে, তখন আরো বড় বড় ধাক্কা খাবে মানুষিক ভাবে, বাবা-মায়ের এই সম্পর্কের কারণে বন্ধু-বান্ধব মহলে সে স্বীকার হবে করুণা বা সহমর্মীতার। অনেকেই তার দিকে তাকাবে অন্য দৃষ্টিতে। তারপর…………
পথিককে থামিয়ে দিয়ে বললাম বাদ দাও এতসুদূর চিন্তা করে লাভ নেই, ভিন্ন কিছু হতে পারে।
সম্ভবনা কম, হলেও আরো ভয়ংকর কিছু হতে পারে, বাবার রক্তের বা মায়ের রক্তের দ্বারা তার মাঝেও প্রবাহিত, হয়ত সেও একই ঘটনার পূর্ণরাভিত্তি ঘটাবে।
মানে?
ডির্ভোস………………..

— সমাপ্তি——

  একটি মন্তব্য।, “ডির্ভোস (পথিকের গল্প)”

    
  1. লেখাটা পড়লাম অর্ধের বেশি। খুব ভাল লাগলো। তবে কেউ বুঝতেও চাই না কোনটা কোথায় কিভাবে চলতে/ চালাতে হবে। কার কোনটা উপযুক্ত বুঝেও ব্যাবসা করে চলে। কাটুকনা নেজের নাক তবুও ব্যাবসা আগে।নিজের ঘর ভাঙ্গুক না তবুও চাই ব্যাবসার সফলতা।
    তাই আজ ঘরে ঘরে ইন্ডিয়ান চ্যানেল ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা মা-বাবা এক্সংগে দেখে। এতেই বাচ্চারা নষ্ট হয়। আর দোষ দিই আমরা যে আজকের ছেলে-মেয়ে খারাপ কিন্তু খারাপ কে অভিভাবক না!!!।