জীবন যুদ্ধ ১৫-তম পর্ব

 লিখেছেন on ডিসেম্বর ১৯, ২০১৭ at ১১:২৯ অপরাহ্ন  গল্প  Add comments
ডিসে. ১৯২০১৭
 

নাবিলের খুব ইচ্ছা এল এল বি করার সেই ভাবেই প্রিপারেশন নিয়েছে যাতে রাজশাহী বা ঢাকা ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগে ভর্তি হতে পারে। স্টাডির একটা বড় গ্যাপ থাকার কারণে ভর্তি হওয়া গেল না! নাবিল আশা ছারেনি ভর্তি হয়ে গেল প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। এদিকে আই ই এল টি এস এর ও রেজাল্ট বের হয়েছে পয়েন্ট ৬। এতে নাবিল খুব খুশি পড়াশুনার পাশাপাশি নাবিল ছোট একটা গরুর ফার্ম করার চিন্তা করে সাথে একটা মাছের পুকুর।বাবাকে বুঝায় কিন্তু প্রথমে রাজি হয় না বাবা। প্রায় ২ বছর কেটে যায় নাবিলের বাবাকে বুঝাতে। পরে বাবা এক শর্তে রাজি হয়। শর্তটা হলো আইন বিভাগ ও প্রফেশন ছাড়তে হবে তাহলেই ব্যবসা করতে দিবে। কারণ নাবিলের বাবার এই প্রফেশন পছন্দ না। কিন্তু নাবিল কোনো ভাবেই রাজি হয় না। অনেক চিন্তা করে নাবিল বাবাকে বলে আচ্ছা বাবা আমি তোমার কথায় ই রাজি কিন্তু ব্যবসার চিন্তা ও করতে হবে না। আমাকে দেশের বাহিরে পাঠিয়ে দাও পড়াশুনার জন্য। হোটেল ম্যানেজম্যান্ট নিয়ে পড়তে চাই। বাবাও বেশ খুশি হয়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে সব রেডি করে ফেললো মাস তিনের মধ্যেই। অতঃপর নাবিল চলে গেল বাংলাদেশের বাহিরে। চিনে না কিছু, রুটিন মাফিক ক্লাস করা, খাওয়া ঘুম ক্লাসের শেষে জব খো জাই দিনকার রুটিন। খুব ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে নাবিল এক ই ইউনিভার্সিটিতে ব্যাচেলর অফ হোটেল ম্যানেজমেন্টের পাশাপাশি ডিপ্লোমা ইন ল তে ও ভর্তি হলো যে করেই হোক আইন বিষয়ে নাবিলের সার্টিফিকেট চাই ই চাই। বাবা অনার্সের টিউশনফি দেয় আর নাবিল নিজের ঠাকা খাওয়ার খরচ সহ ডিপ্লোমার খরচ চালায়। অনেক পরিশ্রম করতে হয় নাবিলের। কোনো একটা গ্রুপ ডিসকাস নিয়ে ছোট্ট আরগুমেন্টের মাধ্যমে পরিচয় হয় অস্ট্রেলিয়ান, মালয়েশিয়ান ও পোলেন্ডের কিছু স্টুডেন্টের সাথে। তাড়াও হোটেল ম্যানেজমেন্টের স্টুডেন্ট! কিন্তু পরিচয়টা অত সুন্দর ছিলো না কারন নাবিল বাংলাদেশি। সবাই এড়িয়ে চলতো। এক সময় সবাই সিধান্ত নিয়ে গ্রুপ লিডারের কাছে লিখিত বক্তব্য দিলো নাবিলকে গ্রুপ থেকে সরানোর জন্য। ওই গ্রুপের লিডার ছিল এক মেয়ে নাম গায়াত্রী (মালয়েশিয়ান)। অনেক শান্ত ও বিচক্ষণ। অন্যসব গ্রুপ মেম্বারদের সাথে অনেক তর্ক-বিতর্কের পর সবাইকে বুঝাতে সক্ষম হলো নাবিল শুধু বাংলাদেশ থেকে এসেছে বলে তাকে গ্রুপ থেকে বহিষ্কার করা যেতে পারে না। বাংলাদেশের সবাই যে খারাপ বা টেরোরিস্ট এমন কিছু কোথাও বলা নেই। সবাই বুঝলো এবং রাজি হলো নাবিল কে সাথে রাখার। এদিকে নাবিলকে গায়াত্রী পড়াশুনা ও এসাইনমেন্টে অনেক সাহায্য করে যাতে ল এর পড়াশুনা পাশাপাশি জব ঠিক মত করতে পারে।
অ-নে-ক-ক-ক কথা হয় দুজনের মধ্যে ! এক সময় তারা অনেক ভাল বন্ধু হয়ে যায়। এই বন্ধুত্বই এক সময় প্রনয়ে গড়াতে চায় কিন্তু কেউ কাউকে বলে না কারণ নাবিল মুসলমান আর গায়াত্রী হিন্দু! কি হবে এদের? পরিবার কি মেনে নিবে? এই কস্টে ভরা নষ্ট পৃথিবী কি মেনে নেবে এই সম্পর্ক? নাবিল বুঝে গায়াত্রীও নাবিল কে খুব ভালোবাসে। আলাদা কেয়ার নেয় সব সময়। কিন্তু নাবিল কিছু ভেবে উঠতে পারে না কি করা উচিৎ! এক দিকে পড়াশুনার প্রচন্ড চাপ সামনে পরীক্ষা। অন্য দিকে জব। নিজেকে শক্ত করে এখন এগুলো নিয়ে ভাবলে চলবে না। সব কিছু বাদ দিয়ে ভাল প্রিপারেশন নিয়ে পরীক্ষা শেষ করে নাবিল।
এখন সেমিস্টার হলিডে চলছে। গায়াত্রীর সাথে তেমন কথা হয় না নাবিলের। ফোনে হায়-হ্যালো করেই কথা শেষে হয়ে যায়। নাবিল ই এড়িয়ে চলছে কিছুদিন। এমনিতে বেশ কয়েকদিন পার্ট টাইম কাজ নেই। সামনের মাসের বাসা ভাড়া নেই। অনেক কাজ করতে হবে ডিপ্লোমার টিউশন ফি প্রায় ১০ হাজার ডলার সেভ করতে হবে। লাস্ট পেমেন্ট এ বছর ই ডিপ্লোমা শেষ হবে আর সামনের বছর অনার্স। নাবিল চায় না বাবার ওপর প্রেশার দিতে। এমনিতেই অনার্সের টিউশন ফির জন্য অনেক টাকা আনা হয়েছে বাড়তি টেনশন দিয়ে লাভ কি! তাছাড়া ছোট একটা ভাই আছে তারও ভবিষ্যতের জন্য বাবাকে আরও সেভিংসের কথা ভাবতে হবে। এই সব চিন্তা করে নাবিলের খুব মন খারাপ। কিন্তু সব কিছুর পরেও নাবিল গায়াত্রীকে চায় বলতে পারে না কিছু। ভাবতে ভাবতে চোখ ঘুমিয়ে পরে নাবিল। হঠাত ফোন বেজে উঠে। স্টেফেন নামের এক ক্লাসমেট কল দিয়ে নতুন জবের অফার করে এক বারের বার টেন্ডারের। কষ্ট বেশি কিন্তু স্যালারি ভাল তাই বেশি কিছু না ভেবেই নাবিল জবটা নিয়ে নেয়। কাজ করে সততার সঙ্গে। খুব অল্প সময়েই নাবিল ক্লাব ৯ এর ম্যানেজার ও সুপার ভাইসারদের কাছে বিশ্বস্ত ও আদরের হয়েছে নাবিল। সবাই নাবিলকে ভালবাসে, সম্মান করে। নাবিল ই এক মাত্র বাংলাদেশি যেকিনা ওই ক্লাবের রেগুলার স্টাফ। ম্যানেজার ও মালিক পক্ষ ভাবছে নাবিলকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে অ্যাপয়েন্ট করতে। আজ নাবিলকে জানালে সেও বেশ খুশি হয়। ফাইনালি টাকার কোনো সমস্যা রইলো না যে। মনে মনে ভাবছে আজ নাবিলের পার্টটাইম জবের শেষ রাত কাল ছুটি। সকালে কিছু চকলেট কিনবে গায়াত্রীর জন্য। অনেক দিন কথাও হয় না মেয়েটার সাথে। কথা বলার সময় হয়েছে ভেবে দু’পেগ ব্ল্যাক লেভেল ঢালে নিজের জন্য। আইস ও কিছু কোক মিশিয়ে গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ফোনটা বের করলো গায়াত্রীকে কল করে কালকে মিট করতে বলবে বলে।
নাবিল ভাবছে কল করবে নাকি করবে না এমন সময় নাবিলের ফোন বেজে উঠলো গায়াত্রীর কল। নাবিলের হাত কখনো কাঁপেনি কিন্ত এখন কাপছে অজানা এক উত্তেজনায়। রিং হতে হতে রিসিভ করার আগেই কেটে গেলো। নাবিল ভাবছে হঠাত গায়াত্রী কল করলো কেন? কোনো সমস্যা নাকি শুধু কথা বলারর জন্য ই কল করেছে? নাবিল কল ব্যাক করে দেখলো ফোন বিজি। একটু পরে গায়াত্রী আবার কল দিলো
– নাবিল ফ্রি আছো?
– হুম কাজে আছি বাট সমস্যা নেই বল?
– না এমনি কল করলাম অনেক দিন কথা হয় না তাই।
– তোমার মন খারাপ গায়া?
– নাহ মন খারাপ হবে কেন? ভাল আছি।
– কন্ঠে মনে হচ্ছে মন খারাপ তাই জিজ্ঞাসা করলাম।
– হুম ডিনার করেছো?
– হুম তুমি?
– এখনো করিনী তোমার প্রিয় চিকেন স্যান্ডুয়িস বানালাম মাত্র। মনে পরলো তোমার কথা তাই কল দিলাম। এখন খেয়ে ঘুমাবো। কাল অফ ডে আমার। তাই দেরি করেই সব কিছু করলাম।
– ওয়াও গ্রেট।
– কিছু বললে নাবিল?
– নাহ এমনি কিছু না। কাল তো ফ্রি আছ তাহলে দেখা করবা?
– হুম করা যায় বিকেলে দেখা করো তাহলে। ক্যাম্পাসে এসো। আমি অপেক্ষা করবো।
– আচ্ছা তাহলে রাখছি এখন। কাল দেখা হবে।
সকালে কাজ শেষে নাবিল গায়াত্রীর ফেভাফেট ফেরারো রোসার চকলেট কিনে বাসায় যায়। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে ঘুম দেয়।
দুপুর দু’টার দিকে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ফ্রিজ থেকে পিজ্জা বের করে ওভেনে দিয়ে ল্যাপটপ অন করলো। সেকেন হ্যান্ড বাইকের অ্যাড দেখার জন্য। অনেক দিনের সখ রয়েল ইনফিল্ডের একটা বাইক কিনবে নাবিল কিন্তু অনেক দাম প্রায় ৪হাজার ডলার নতুন বাইক তাই কেনা হয় নি। এখন যেহেতু পার্মানেন্ট জব হচ্ছে সেকেন্ড হ্যান্ড কেনাই যায় ১০০০/১২০০ ডলারের মধ্যে।
খাওয়া দাওয়া করতে করতে নাবিলের একটা বাইক পছন্দ হলো দাম ৯৮০ ডলার। কার্টে রেখে ল্যাপটপ অফ করে রেডি হলো ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে। রেডি হয়ে গায়াত্রীকে কল দিলো একটা রিং হতেই রিসিভ করে বললো নাবিল আমি ১০ মিনিটের মধ্যেই ক্যাম্পাসে পৌছাবো তুমি কোথায়?
– আমি বাসায় রেডি হচ্ছি।
– আচ্ছা আসো আমিও আসছি।
– আচ্ছা ৫ মিনিটেই আমি পৌছাবো। আমার বাসাতো এখন ক্যাম্পাসের পাশেই।
ফোন কেটে দিয়ে ব্ল্যাক শার্ট, ব্ল্যাক প্যান্ট আর জুতা পরে নাবিল বের হলো চকলেট বক্স নিয়ে।

গল্পের সকল স্থান, নাম ও চরিত্র কাল্পনিক কিন্তু গ্রাম-বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে অতি সাধারণ ঘটনা, কারো সাথে মিলে গেলে নিজ গুণে ক্ষমা করবেন”
চলবে…

  ৭টি মন্তব্য, “জীবন যুদ্ধ ১৫-তম পর্ব”

    
  1. 
  2. রেজয়ান ভাই খুব ভাল লাগলো। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

  3. 
  4. সহজ সরল জীবনের গল্প, যেন আমাদের কত পরিচিত।
    ভাল লাগছে ছোট ভাই।