জীবন থেকে নেওয়া

 লিখেছেন on অক্টোবর ৯, ২০১৭ at ১১:৩৮ অপরাহ্ন  একান্ত অনুভূতি  Add comments
অক্টো. ০৯২০১৭
 

রাত আটটা, অফিস থেকে বের হয়ে কাটাবন মোড়ে গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছি। সারাদিনের ক্লান্তি ভর আছে দেহমনে, কখন গাড়ি পাব আর কখন বাসায় ফিরতে পারব সেই দিকেই পূর্ণ মনযোগ তখন। বাসায় ফিরে এক গাদা কাজ করে আবার পরেরদিন অফিস করতে হবে সেই চিন্তাও খানিকটা ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়।
বিচিত্র এই শহরের নানান বৈচিত্র্য দেখেশুনে চোখ কান অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এমন কি ডিজুস মার্কা পোলাপান থেকে শুরু করে যত বিরক্তিকর বিষয় আছে সেগুলোও সহ্য হয়ে গেছে। উন্মাদের উন্মাদনা এক সময় বিরক্তি সৃষ্টি করত এখন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটা দৃশ্যে,আমি নিথর পাথর হয়ে গেলাম, মুখ দিয়ে কোন কথা বের হওয়া বা চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল ক্ষনিকের জন্য।
বয়স ৫০-৫৫ এর এক অন্ধ ভিক্ষা করছে, সাথে তাকে পথ নির্দেশ করে যাচ্ছে ৬-৭ বছরের এক মেয়ে। এই দৃশ্যটাও ঢাকায় একটা সাধারণ ঘটনা, মাঝেমাঝে এর চেয়ে ভয়ংকর আর ভিবৎস ঘটনাও এই শহরে দেখা যায়, বিশেষ করে ফার্মগেট ফুটওভারব্রীজ এর ভিক্ষুকদের দৃশ্য সহ্য করার জন্য শক্ত মানুষিকতার প্রয়োজন হয়।
কিন্তু এই দৃশ্যটা আমার মনে দাগ কেটে যাওয়া দৃশ্যগুলোর মাঝে অন্যতম। বিশেষত ছোট সেই মেয়েটার মায়া ভরা তৃষ্ণার্ত চাহনি আমি অনেক দিন ভুলতে পারব না। এইটুকু একটা মেয়ে যার চোখে হাজার স্বপ্ন থাকার কথা, তার চোখেমুখে বিষাধ, যেই মানুষটাকে সে পথে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার কাছেই অ আ ক খ শিখার কথা ছিল।
দরিদ্রতা আমি দেখেছি,এর শেষ সীমাও আমিও দেখেছি, কতটা তীব্রতর হতে পারে এর যন্ত্রণা তা আমি জানি।
মেয়েটার চোখের,মুখের প্রতিটা ভাষা আমি পড়তে পারছিলাম তখন। যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম আমি, কোথায় যেন আঘাত লাগছিল আমার, কোন একটা অজানা যন্ত্রণা অনূভব করা শুরু করলাম।
ফুতপাতে ফ্লাক্সে করে চা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে এই শহরে অনেক মানুষ, তাদের দেখতেও ভালো লাগে কিছু অসাধু ভিক্ষুকের চেয়ে বা মানুষরূপি কিছু বন্য প্রাণীর চেয়ে অদম প্রাণীদের (ছিনতাই কারী, পকেটমার ইত্যাদি) চেয়ে, এই ভেবে শান্তি যে এরা অন্যের অনিষ্ট করছে না।
মেয়েটা তৃষ্ণার্ত হয়েই তাদের কাছেই এক কাপ (গ্লাস নেই বা থাকে না) পানি চায়। এদের কাছে যে পানি থাকে তা নিরাপদ পানি নয়, তবু সেই পানি খেতে দেয় মেয়েটাকে একজন ফ্লাক্সওয়ালা চা বিক্রেতা। আমি শুধু দেখেই গেলাম।
ক্রমেই মেয়ে এবং বুড়ো মানুষটি আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে, কোলাহলের এই শহরটা আমার কাছে তখন শূণ্য মনে হতে থাকে, রাস্তার উপর দিয়ে চলন্ত গাড়িগুলোও তখন যেন আমি দেখতে পাচ্ছি না। আমার সমস্ত চিন্তা শক্তি আকর্ষণ শুধু ঐ দুটো মানুষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে তখন। পূর্ব থেকেই জানা ছিল আমার কাছে কি পরিমাণ অর্থ আছে তাই আর তা দেখার চেষ্টা ও করলাম না, শুধু দেখতে লাগলাম তারা কি করে।
আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল, চোখে চোখ রেখে, তারপর বৃদ্ধের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা আমার দিক থেকে সরিয়ে দিয়ে অন্যদিকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করল মেয়েটা। কিন্তু পারল না, আমি নিজেই তাদের পথ রোধ করলাম এবার।
ট্রাফিক সিগন্যাল তখন অন্যদিকে, চাইলেও রাস্তা পার হয়ে যেতে পারবে না তারা, এই সুযোগে একটু কথা বলে নেওয়া যায়। জিজ্ঞেস করলাম নাম কি তোমার?
সীমা
বাসা কোথায়?
আরামবাগ।
বৃদ্ধ লোকটি বলল, খাড়াইয়া গেছস ক্যা, যা কইতাছি।
আমি বললাম, একটু অপেক্ষা করুন। মেয়েটাকে আবার প্রশ্ন করলাম, তুমি এত রাতে বাসা চিনতে পারবে?
মেয়েটা এবার একটু দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে গেলো, তার চেহেরায় সেটা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল, তবু বলল চিনতে পারব।
বৃদ্ধকে বললাম, ওকে নিয়ে ভিক্ষা করছেন কেন? ওর বাবা মা কই?
আমার কথায় কিছুটা রাগানিত্ব হলেও বৃদ্ধা জবাব দিল, মা গার্মেন্টস এ কাম করে, বাপ নাই।
নাই মানে? কি হয়েছে?
ওর জন্মের পরেই ওর মারে ফালাইয়া থইয়া গেছেগা।
কিন্তু আপনি ওকে নিয়ে ভিক্ষা করছেন, যদি কোন দূর্ঘটনা ঘটে তখন কি হবে?
কি আর হবে, মইরা যামু এক গলে, না থাকব জীবন না থাকব ঝামেলা।
আমার আর কথা বলার শক্তি রইল না, বাস ভাড়ার জন্য বুক পকেটে আলাদা একটা পাচঁ টাকার নোট ছিল, মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সামনে পা বাড়াইলাম। ট্রাফিক সিগন্যাল পড়েছে, মেয়েটা বৃদ্ধাকে নিয়ে রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে আর আমি হাটছি তার উল্টো দিকে। দৃশ্যটা আমার কাছে অসহনীয় মনে হল, চোখের চশমাটা খুলে ফেললাম, দৃশ্যটা ঝাপসা হয়ে গেলো পরমুহুর্তেই, পাচঁ ফুট দূরত্বের বিষয়বস্তু চশমা ছাড়া দেখতে আমার কষ্ট হয়, ঝাপসা হয়ে আসে সব কিছু। ছোট কদমে হেটে চলি আমি, আমার পিছনে পড়ে যায় জীবন নামের একটা যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়।
আমার ছোট বোনটি পড়াশোনা করতে ভালোলাগে, ৯০+ মার্কস পেলেও শিক্ষক বকা দেয়, পরিবারের অন্যসদ্যসরা বকা দেয়, বৃত্তি পেলেও আনন্দ হয় না যতক্ষণ ৯৯ বা ১০০ না পাচ্ছে ততক্ষণ। সেও দরিদ্রতার সাথে সংগ্রাম করে কিন্তু তাকে পথে নামতে হয় না, কারণ তার উপরে ছায়া আছে, যে ছায়া মুহুর্তের জন্যও তাকে রোদ লাগতে দেয় না বা দিলেও তা এতটাই ক্ষণস্থায়ী যে রোদের কি তীব্রতা তা সে অনুভব করতে পারে না। হয়ত তার ছোট্ট মনটা বিষাদময় হয়ে উঠে কিন্তু সেটাও ক্ষণিকের, কিন্তু রাস্তার এই বাচ্চাগুলোর উপর কি কখনো ছায়া পড়ে? কখনো কি এদের মনের বিষাধের মেঘ কাটে? কখনোই না। পৃথিবীটা অনেক বড়, আর তার বুকে ছোট্ট একটা শহর ঢাকা, যার বুকে ছোট্ট একটি মেয়ে সীমা। সারা দেশে, পৃথিবীতে এমন কত সীমা যে বিষাদের মেঘ বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার খবর কে রাখে এই যান্ত্রিক ব্যস্ততার দুনিয়ায় !!!?

  ১৪টি মন্তব্য, “জীবন থেকে নেওয়া”

    
  1. এতাই বোধ হয় মানব জীবন!!!
    স্রষ্টার কি অপরূপ সৃষ্টি কি আরাম দায়ক স্রষ্টা। সামনে আছে বলেই পিছনে তাকানো সম্ভব না।

    কষ্ট কষ্ট কষ্ট।
    আমরা ছাগলের \|/ বাচ্চা।

  2. 
  3. এসমস্ত দেশে একজন রেস্টুরেন্টে চাকরি করা কিংবা একজন উচ্চ লেভেলের মানুষের জীবনযাত্রা বাইরে দেখে দেখলে বোঝার উপায় নেই কে কী করে। অথচ আমাদের দেশে আছে দুএকদিন ছুটি পেলেই বিদেশ ছোটা মানুষ, আর একদিকে পথে পথে লাখো ভিখারি। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো কী অভিশপ্ত ভাবেই না জন্ম নিয়েছে! অথচ কেউ কিচ্ছু করছেনা, দেখছেনা। যারা দেখছে তাদের চোখের চশমা খুলে ফেলা ছাড়া কী করবার আছে!

  4. 
  5. দরিদ্রতা আমি দেখেছি,এর শেষ সীমাও আমিও দেখেছি, কতটা তীব্রতর হতে পারে এর যন্ত্রণা তা আমি জানি। (y)
    মনে দাগ কেটে গেল।

  6. 
  7. অফিস ছুটির পরে বাসার জন্য ছুটে চলা মানুষের ভিড় সত্যিই অসহনিয় সেই মানুষগুলোর জন্য। অর্থনৈতিক কষ্ট সেইসব মানুষগুলোর বেশি যারা না পারে কারো কাছে চাইতে না পারে সহ্য করতে। তবে আমি একটা জিনিস ভেবে পাই না, এতো টুকু বাচ্চারা কেনো ঢাকায় এতো রাতে ভিক্ষা করে। গ্রামে কি আসলে কোনো কাজ নেই? নাকি বাস্তবতা আরো কঠিন? আমি যখন ঢাকা ছিলাম, তখন এদের দেখে বিরক্ত হতাম এই ভেবে যে, কেনো ঢাকা থাকতে হবে? এখন এই মফস্বলে বন্যা কবলিত এলাকায় এসে বুঝি আসলে বাস্তবতা আরো কঠিন।
    তবু এদের জন্য বুক পকেট থেকে এই কটা টাকাই বা ক’জনে দেয়! যার অনেক আছে সে থাকে দামি গাড়িতে। বছর শেষে যৎসামান্য লোক দেখানো কিছু যাকাত।
    চমৎকার উপস্থাপন। মনটা একটু ভারি হলো আর কি। ভালো থেকো ভাই। অনেক ভালবাসা ও দোয়া রইলো।

  8. 
  9. আপনার লিখা অনেক দিন পড়া হয় না,আজ পড়তে গিয়ে চমকে উঠেছি,স্ক্রোল করে উপড়ে গিয়ে নাম দেখে নিলাম।এটা আনিস ভাই-ই তো।লিখা দারুণ,আপ্নার আগের লিখাও ভাল হতো কিন্তু এই লিখা সেই লেখা থেকে অনেক আলাদা।
    এবার আসি প্রসংগে,আমি ভাই আবেগি মানুষ,এই ব্যাপার গুলো আমারো খুব কষ্ট দেয়,সাথে সাথে নিজের সাথে তুলনা করে ফেলি।শিশুরা ভবিষ্যৎ,শিশুদের পেছনে সরকার থেকে শুরু করে সমাজের দায়বদ্ধতা আছে।মন টা খুব খারাপ হলো তবুও সান্তনা আপনাদের মত মানুষও তো আছে।

  10. 
  11. পথে পথে দেখার কত কিছু আছে,
    আছে দেখা থেকে শেখার, অন্তরের পারদ কতটুকু উঠানামা করে তার হিসেব করা,
    আমি অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছি এই ঘটনা দেখে তোমার মাঝে জীবন সম্পর্কে টানা পোড়ন দেখে।

    এভাবেই দেখো চলার মাঝে,