আগস্ট ০৮২০১৭
 

ঐ লাল শাড়ীরে নিশি রাইতে যায় কোন বনে ঐ লাল শাড়ীরে…সে সময়কার অরবিট ব্যান্ড এর জন প্রিয় একটি গান।কলেজ লাইফের ফাষ্ট ইয়ার।জীবনের এক ছন্দময় অধ্যায়।সে বয়সটায় নিজেকে মনে হতো হিরো হিরো তা ছাড়া ছাত্র বলে নিজেকে বেশ গর্ব করেই বলতাম এ দেশের কর্তাই আমরা।সে সময় অবশ্য এমন বাক্যের বেশ মুল্য ছিলো তখন ছাত্ররা যে পথ দিয়ে হেটে যেত সে পথ যতই বাকা হউক সোজা হতে বাধ্য হতো।

যাই হোক সে সময়কার এই গানটি জয় তার বন্ধুদের নিয়ে গাচ্ছেন,ক্লাশের পিছনে,টেবিল চাপড়িয়ে চাপড়িয়ে।সে কি আনন্দ সে কি উল্লাস যেনো জগতের সব সূখ এখানেই লুকিয়ে আছে।ঠিক সে সময় নাছরিন নামের এক ছাত্রীর ক্লাশে প্রবেশ।তার পড়নে কাচঁ কাটাঁ কাজ বিশিষ্ট লাল সালোয়ার কামিজঁ।গানটি তার কানে পৌছলে সে ফিরে তাকালেন দল বদ্ধ ছেলেদের দিকে,যেন একটু মনে গোস্সা এসে গেলো… ক্লাশের প্রথম দিনে অপমান!।কিছু ক্ষণ পর ক্লাশে স্যার ঢুকেন।দ্রুত সবাই যার যার মতো টেবিলে বসে পড়েন।স্যার ক্লাশে ঢুকার সাথে সাথে ছেলেরা সমচ্চোরে স্যারকে সালাম জানিয়ে অভিবাদন জানালেন।স্যার সবাইকে বসতে বলে নিজের পরিচয় দিয়ে পরিচয় পর্ব শেষ করে তার ক্লাশ আজকের মতো এখানেই শেষ করলেন।

স্যার চলে যাবার পর আবারো দল বন্ধ ভাবে গান শুরু করে দিলেন ছাত্ররা তবে তাদের মধ্যে থেকে জয় বেরিয়ে আসেন কলেজের খোলা মাঠে।সবুজ দুর্বা ঘাস কার্পেটে ঘেরা বিশাল মাঠ।এক পাশে ভাষা শহীদের স্বরণে শহীদ মিনার।মিনারের পাদ দেশে গিয়ে জয় প্রথমে একাই বসলেন।এর কিছু ক্ষণ পর তারই পরিচিত বেশ কয়েক জন এলাকার ছেলেদের সাথে সাক্ষাত হয়।মোটা মোটি বলা যায় প্রথম দিনেই জয় এ কলেজে চেনা অচেনা বহু বন্ধু পেয়ে গেলেন।

কিছু দিনের মধ্যে কলেজে অনুষ্ঠিত হবে ছাত্র ছাত্রী সংসদ বা ভিপি নির্বাচন।এ কলেজে ভিপি নির্বাচন প্রতি বছর হয় তবে বিরোধী পক্ষ তেমন শক্তি শালী না হওয়ায় নির্বাচনে জয়ী সাধারণতঃ আওয়ামীলীগ দলেরই হয়।এবারও তেমনটিই হবে বলে মনে করছেন অত্র কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা।আড্ডা অতপরঃ ক্লাশ শেষ করে জয় বাড়ী যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।

কলেজ প্রাঙ্গনের পাশে এক গলি দিয়ে জয় মেইন রোডে উঠে বাসে চড়ে তার এলাকায় যাবেন।তার সাথে বেশ কয়েজন সহ পাঠিও ছিলেন যারা পরবর্তী গন্তব্যের গতি পথ বদলাবেন পর্যায়ক্রমে।ওরা কলেজ ড্রেসে এক হাতে ডায়রী নিয়ে হাটছেন।হঠাৎ বিকট শব্দে থমকে দাড়ায় ওরা।একটু লক্ষ্য করে দেখলেন একটি একটু দুরে প্রাইভেট কারকে ঘিরে আছেন দশ বারোজন অস্ত্র হাতে নামধারী ছাত্র।প্রাইভেট কার থেকে একজন নেতা টাইপের লোককে দরজা ভেঙ্গে বের করার চেষ্টায় ঠিক সে সময় জয়ের দল বল, ঐ ধর…বলে দৌড়ে সেখানে যেতেই তাদের দিকে লক্ষ্য করে কয়েকটি মিস ফায়ার করে দৌড়ে পালিয়ে গলিতে ঢুকে পড়েন সন্ত্রাসী দল।জয়ের দল লোকটির কাছে গেলেন।লোকটি ছিলেন স্থানীয় বিরোধী দলীয় সাংসদ তাকে চিনতে পেরে জয় সালাম দিলেন।
-ধন্যবাদ তোমাদের জন্য এ যাত্রায় বেচে গেলাম।
-না না স্যার কি যে কন এটা আমাদের দায়ীত্ব ছিলো।
-হুম বেশ।কি নাম তোমার?
-জয়
-কোন ইয়ারে?
-জি ফাষ্ট ইয়ারে।
-কিছু দিন পরইতো তোমাদের কলেজের নির্বাচন।
-জি,
লোকটি তার মানি ব্যাগ থেকে ভিজিটিং কার্ড বের জয়কে দিয়ে বললেন।
-এই নাও কাল বিকালে আমার অফিসে এসে ঘুরে যেও।দাওয়াত রইল।
-ঠিক আছে…কখন?
-বিকেল ৪টায় আমি থাকবো কেবল তোমাদের জন্য।
-জি স্যার।সালামুআলাইকুম।
জয় বাসায় যেতে যেতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে।মা ফুলী গরুগুলোকে গোয়াল করণ করে ওজুঁ করে মাগরীবের নামাজটা আদায় করলেন।ছেলের অপেক্ষায় ঘরে বসে বসে হাতের কাজ একটি ওলের সুইটার সেলাই করছেন।জয় ঘরে প্রবেশ করে পিছন দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরেন।
-কি রে আজ এতো দেরী হলো যে?
-এইতো একটা গেঞ্জাম হইছিলো।মা মামা কি ফেরেননি আর?
-না,
-কোথায় গেছেন তুমি জানোও না?
-না,তোর খালা মারা যাবার পর হতেই ও কেমন যেনো হয়ে গেছে।
-হ্যা সেই আমার বয়স যখন পাচ ছয় বছর তখন খালাওতো মামার মতোই নিখোজঁ হলেন তার আর কোন খবরই পেলাম না।এখন মামা এই দেখি আবার এই মাস খানেক উদাও।
ফুলীর নয়ন জলে ভাসে।একটা চাপা কষ্ট নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করছে প্রতিনিয়ত।জয়কে বুঝাতে পারছেন তার মায়ের কারনে তার খালা এখন নিখোজঁ।তখন জয় খুব ছোট।জীবন সংগ্রামে ভাসা এক নারী ফুলী যখন পাচাকারীদের হাত হতে ভাগ্যক্রমে নিজ গ্রামে এসে পড়লেন তখন এ গ্রামের মাতবর জাতীয় লোকেরা তাকে এ গ্রামে স্থান দিতে চাননি।তাকে নষ্টা মেয়ে বদনাম দিয়ে এ গ্রাম থেকে বের করে দিতে চেয়েছিলেন।তার মুল কারন জীবন চাকার অন্নের সন্ধ্যানে ফুলী শহরে ছিলেন,গ্রামে ছিলেন তার পিতা,বোন ও ভাইকে নিয়ে।মা তার ছোট ভাইয়ের জন্মের পরই এক অজানা অসুখে মারা যান।তাদের বেশ কিছু জমি ছিলো তা পিতার সুদে আনা টাকার বিনিময়ে নয় ছয় ভাবে গ্রামের মাতাবর তাদের সব জমি হাতিয়ে নেয়।সেই শোকে পিতাও পরপারে গত হন।এক মাত্র ছোট বোন তাকেও পাড়ার এক ছেলের সাথে প্রেম করায় মধ্যযোগীয় কায়দায় বিচারে পাথর নিক্ষেপ করে পাগলনী বানায়।সে এখন কোথায় তাও ফুলী জানেন না।এক মাত্র ছোট ভাই তাকেও মাতবরের মামলায় পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে।এতো সব কষ্টের কথা কি ভাবে জয়কে বলবেন বুঝতে পারছেন না অপেক্ষায় আছেন সত্য যে দিন সামনে এসে পড়বে সে দিনের।মায়ের চোখে জল দেখে জয় মাকে শান্তনা দিয়ে চোখের জল মুছে দিলেন।
-থাক মা আমি আর খালার কথা মামার কথা জানতে চাইবো না।এখন উঠতো ক্ষিদে পেয়েছে ভাত দাও।
চোখের জল কাপড়ের আচলেঁ মুছে ছেলেকে ওয়াস করে এসে খেতে বসতে বললেন ততক্ষণে ফুলী রান্না ঘর থেকে গরম ভাতের পাতিলা আনতে গেলেন।
পরদিন বিকেল বেলা
আব্বাস সাহেব এই কেন্দ্রের একজন বিরোধী দলীয় সাংসদ।তার অফিসটি খুজেঁ পেতে জয়দের তেমন কোন অসুবিদাই হলো তবে বাধ সাধলো সেখানকার কেয়ার টেকারের সে তাদের কিছুতেই সাহেবের সাথে দেখা করতে দিবেন না।স্যারের কার্ড দেখানোর পরও ঢুকতে দিতে চাইছেন না।জয়ের বেশ রাখ হলো..শালার এসব লোক নিয়েই হলো যত সব যন্ত্রণা।পকেট থেকে বিশ টাকা বের করে লোকটির হাতে গুজে দিলেন।লোকটি এবার আর কোন বাধা দিলেন না তাদেরকে লিফটের সামনে সোফায় বসিয়ে সাহেবকে জানাতে গেলেন লিফটের তিন তলায়।
-স্যার কিছু ছাত্রের মতো,একজনের নাম বললেন ‘জয়….।
বলো কি!কখন এসেছে?কৈ?
স্যার সোফায় বসে আছেন।সাহেব তাকে দিলেন এক দমক।
-বেক্কেল তাড়াতাড়ি ডাক…।
তড়িগড়ি করে রুম থেকে বের হয়ে তাদের ডাকতে এলেন।লোকটি জয়ের হাতে সেই বিশ টাকা ফেরত দিয়ে অনুনয় বিনয় করলেন।
-ভাই স্যারকে কিছু বলবেন না।আমি ঠিক আপনাদের চিনতে পারিনি।
-ঠিক আছে কিছুই কমু না,তবে এই টাকাটা রাখেন।
-না ভাই মাফ চাই…আপনাগো স্যার যেতে বলেছেন,চলেন।
যথারীতি সালাম দিয়ে সাংসদের রুমে ঢুকলেন।স্বাগতম জানিয়ে তাদেরকে চেয়ারে বসতে বললেন।তারা কেউ আরাম করে কেউ বা উচখুচে চেয়ারে বসলেন।
-তা কেমন আছো তোমরা?সবাই মাথা নাড়িয়ে জি ভালো বললেন।
-কি খাবে?গরম না ঠান্ডা?ওদের মধ্যে এক বাচাল প্রকৃতির যুবক বলেই ফেললেন।
-জি স্যার অনেক গরম ঠান্ডা হলেই ভাল হয়।
স্যার কলিং বেল টিপলেন।পিয়ন আসলেন তাকে কোল ড্রিংস আনতে বললেন।
-তোমরা আসবে আমি ভাবতে পারিনি,যাক এসেছো যখন আমি খুব খুশি হয়েছি।আর এখানে আমার এ অফিসে যখন এসেছো আমি কি ধরে নেব তোমরা আমার হয়ে জন সেবা মুলক কাজ করবে?
-জি স্যার,অবশ্যই আমরা আপনার সম্পর্কে খুব ভাল জানি।এ আসনের পর পর দুই বারের এম পি হয়েছেন।নিশ্চয় আপনি খুব ভাল লোক নতুবা পর পর দুই বাংসদ হতে পারতেন না,তাই আমরাও আপনাকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছি।
জয়ের এমন সুনামময় কথা শুনে সাংসদ মনে মনে খুশিই হলেন।
-সবিই জনগণের ভালবাসা।আমি আজ সাংসদ;জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে বলে।তাই আমার কাছে পুরো দেশ নয় এই আসনের সকল জনগণই আমার সম্পদ সকল জনগণই আমার প্রিয়।তাদের সেবাই যেনো আমার এক মাত্র লক্ষ্য।আমার সেবার কাছে কোন দল নেই,নেই কোন ধর্মের ভিন্নতা।আমি অসাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী।পুরো এলাকার লোকই আমাকে খুব ভালবাসে সর্বত্রই আমার বিচরণ সহজতর কিন্তু একটি স্থান যেখানে এ এলাকার এক মাস্তান গোষ্টি দ্বারা আবৃষ্ট সেটি হচ্ছে তোমাদের কলেজ।তোমাদের কলেজে বর্তমান ভিপি সরকারদলীয়।তারা কলেজ জন্ম হতে এ পর্যন্ত রাজত্য করে যাচ্ছে।কলেজে অন্য কোন দলকেও তেমন ভাবে ঢুকার সুযোগ দেয় না।এমন কি আমার দল বি এন পিকেও।তবে প্রতিবার ইলেকশনে বি এন পি অংশ গ্রহণ করলেও পাশ ওরাই করে।কারন ওদের এলাকায় কলেজটি তাই ওদের জোর একটু বেশী হবে তাই স্বাভাবিক তাছাড়া ক্ষমতাশীল দল।আশা করি আমি কি বুঝাতে চেয়েছি জয় নিশ্চয় বুঝতে পেরেছো।
-ধন্যবাদ স্যার,আমি বুঝতে পেরেছি এবং চিন্তাও করেছি এবার সেখানে বি এন পিই জয় পাবে।কারন কলেজ যদি ওদের মহল্লায় হয় তবে এ মহল্লার থানাই আমরা।
-আমি খুব খুশি তোমাদের তারুণ্যের অহংকার দেখে।তাহলে এবার কাজের কথায় আসি।কালই সেই কলেজে সাবেক মানে আমাদের ব্যার্থ ভিপি তোমার সাথে দেখা করবে।আমি তাকে সব কিছু বলে দেবো।
এর মধ্যে ঠান্ডা এসে যায়।পিয়ন সবাইকে একটি করে স্প্রাইট ক্যান ধরিয়ে দিয়ে বিদায় হলেন।
-তা হলে কথা আজ এ পর্যন্তই।তোমরা তোমাদের মোবাইল নম্বরগুলো একটি কাগছে লিখে দিয়ে যও আর জয় তুমি তোমার নাম্বার বলো আমার মোবাইলে সেভ করে নিচ্ছি।
সাংসদের সাথে কথা বলে ফুরফুরা মেজাজে এলাকায় ফিরে জয় দেখতে পেলেন এক বৃদ্ধ মহিলাকে গাছে বেধে গাছের ডাল দিয়ে পিটাচ্ছেন অনবরত ,এক এলাকার মাতাব্বরের দল।

চলবে
ছবি:অনলাইন সংগৃহীত।

পড়ুন৴৪নং পর্ব

  ৬টি মন্তব্য, “ঘূণে ধরা সমাজে ফুলীর সন্তানেরা-পর্ব ৫”

    
  1. দেশটি আসলে পচে গিয়েছে, এটি আর ঠিক হবে বলে মনে হয় না।
    সমাজের প্রতিটি স্তরে পচন, সব দল এবং শ্রেনীর একই অবস্থা।

    লেখুন মনির ভাই, লেখা পড়ে দু একজন মানুষও যদি ঠিক হয়, তো লেখা সার্থক।
    শুভ কামনা।

  2. 
  3. অনেকদিন পর সোনেলায় এসে আপনার গল্প পড়ে ভাল লাগছে। একদিন সময় করে শুরু থেকে সবগুলো পর্ব পড়ব। যাই হোক, তবে জয়কে “আপনি” সম্বোধনটা নতুন লাগল। এই যেমন “গেলেন”,”ওঠলেন”, “যাবেন” ইত্যাদি।

  4. 
  5. না, গল্প পড়ে শেষ দৃশ্যে আটকে গেলাম, মন্তব্য করার মত ভাষা নেই, পরের পর্বের অপেক্ষাই রইলাম।

  6. 
  7. জিসান ভাইয়ের সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত, এরপরেও আমাদের কলম বন্ধ রাখা চলবেনা, আমাদের লেখা পড়ে যদি একজনও মোটিভেটেড হয় খারাপ কি?

  8. 
  9. আমরা যতদিন বেঁচে থাকব, মনে হয় এই ঘূণে জাঁতাককের চিপায়ই থাকতে হবে। সমাজ আজ একগুঁয়েমি হয়ে গেছে।