অশান্তির শুরু (পথিকের গল্প)

 লিখেছেন on অক্টোবর ৬, ২০১৭ at ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন  গল্প, বিবিধ, সাহিত্য  Add comments
অক্টো. ০৬২০১৭
 

হঠাৎ করেই পথিকের দেড়শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছা হলো কেন তা বুঝতে পারলাম না। অফিস শেষ করে বের হতে সাতটা বেজে গিয়েছিল, আর বের হতেই সিড়ির মুখ থেকে ছুঁ মেরে টেনে নিয়ে সোজা বাসস্ট্যান্ডে উপস্থিত হলো। পথে কয়েকবার জিজ্ঞেস করেও একটা কথা বের করতে পারলাম না মুখ থেকে, তবে চেহেরা দর্শন করে এইটুকু অনুমান করলাম ঘটনা নিশ্চিয় কিছু আছে, নিরব হয়ে সঙ্গী হইলাম তার।
নতুন চাকুরি নিয়েছি, সকাল সন্ধ্যা অফিস করেই আমার দিন ফুরিয়ে যায়। সময়ের সল্পতা এতটা কখনো হয়নি আগে, ছুটির দিন ব্যতিত ইদানীং পথিকের সাথেও মন খুলে কথা বলার ফুসরত পাই না। পথিকও বেশ কিছুদিন যেন নিস্তেজ হয়ে গেছে, কোন কাজ কর্ম নেই সারাদিন রুমে বসে বইয়ে মুখ গুজে থাকে, আর সময় সময় সিগারেট ফুকেঁ। দিনের আলো এখন তার কাছে যায়, সে আলোর কাছে যায় না, এই অবস্থায় হঠাৎ এমন আচরণে বেশ কিছুটা হচকচিয়ে গিয়েছিলাম বটে কিন্তু তার চরিত্র সম্পর্কে আমার ভালো করেই জানা ছিল তাই সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না।
বাসে উঠতেই যে বিষয়টা প্রথমে চোখে পড়ল তা প্রত্যাশা করি নাই, আর কখনো সমর্থন ও করতে পারি না। শালিনতা বজায় রেখে রাস্তায় চলাটা দিনদিন ভুলেই যাচ্ছে ছেলেমেয়েরা। কিছু বলতে গেলে হিতে বিপরীত হয় অধিকাংশ সময়, তবে পথিকের তাতে কিছু আসে যায় না, সে কোন অসঙ্গতি দেখলেই তার প্রতিবাদ করবে এটা তার অভ্যাস। আর প্রত্যেকটা ঘটনার পরে তার পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করে বিশ্লেষণ করে দিবে। কিন্তু আজ অবাক করে দিয়ে সোজা নিজের সীটে গিয়ে বসে পড়ল। আমাকেও কিছু বলতে দিল না, বরং হাত ধরে নিয়ে গিয়ে বসে পড়ল। নিজেকে আর নিরব রাখতে পারলাম না, কি হয়েছে তোমার? এমন স্বভাব বিরুদ্ধ আচরণ কেন করছ?
আমার কথাটা যেন তার কানে পৌছেও বের হয়ে গেলো, আমার দিকে একবার মুখ তুলে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল জানালার দিকে। আমিও আর কিছু বললাম না, অপেক্ষা করতে থাকলাম বাস ছাড়ার। মনের ভিতরে একটা অস্বস্থি কাজ করা শুরু করল কিন্তু নিজেকে সামলে নিলাম এই ভেবে যে, সময় হলে পথিক নিজেই মুখ খুলবে।
মিনিট দশেক পড়েই বাস ছেড়ে দিল, শহরের আলোকময় রাত পিছনে ফেলে অন্ধকারের পথে এগিয়ে যেতে লাগল বাস। ক্লান্তি এসে ভর করল আমার দেহে, চোখ জুড়ে ঘুম নেমে এলো। ঠিক কতক্ষণ পরে অনুমান করতে পারলাম না, পথিকের ধাক্কায় ঘুম ভাঙ্গল। খুব ক্লান্ত লাগছে? বলল পথিক।
কিছুটা।
লেখালেখি করছ না কেন?
সময় কোথায় পাচ্ছি বল?
কথার জবাব না দিয়ে আবার জানালার দিকে তাকালো পথিক, কিছুটা সময় নিয়ে মুখ ও দিকে রেখেই বলল, গল্প শুনবে?
আমি নিরবে সম্মতি দিলাম। পথিকের গল্প যে গল্প নয় সেটা আমি জানি, সত্য একটা ঘটনাকে সে কোন রকমে গল্পের মত করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করবে বা কিছু কথা আমাকে শুনবে কিন্তু তার শতভাগ সত্য ঘটনা। বই থেকে বা শোনা গল্প সে আমাকে কখনো শুনায় না, আর না শুনার কারণটা হচ্ছে যখন কোন গল্প তার ভালো লাগে তাহলে সেটা আমার ভালো না লাগলেও জোর করে হলেও পড়াবে। সত্যি বলতে খারাপ লাগে না, কারণ তার মত খুতঁখুতে মানুষের মন জয় করে নিতে পারে যে গল্প সেই গল্প অন্যের খারাপ লাগবে এটা ভাবা যায় না।
কোন কথা বলছে না দেখে আমি বললাম কি ভাবছ? গল্প তৈরি হচ্ছে না?
আকবর যখন মারা যায় তখন তার বড় ছেলে আসিফের বয়স নয়, মেঝো ছেলে নাফিজের বয়স সাত আর একমাত্র মেয়ে ‍দিনার বয়স দুই । রিক্সাচালক আকবর মারা যাওয়ার সময় সন্তান স্ত্রীর জন্য এমন কিছু রেখে যাননি যা দিয়ে তাদের দিন চলবে, এমনকি থাকার জন্য কোন জায়গাও না। দশবছরের বালক আসিফ পেটের তাগিদে বাবার মৃত্যুর একদিন পরেই বাবার পেশাকেই নিজের পেশা হিসাবে বেছে নেয়, আর মা হয়ে যায় অন্যের বাড়ির কাজের মহিলা।
এইটুকু বলে থামল পথিক, আবার একমিনিট নিরব, তারপর বলল এই ঘটনাগুলো সাধারণ ঘটনা আমাদের দেশে। এই রকম পরিবার তুমি খুজলে হাজারে বিশটা পাবে।
আমি বললাম তারপর কি হলো সেটাই বল, আপাতত খুজাঁখুজি রাখ।
ঘটনাক্রমে ছোট্ট আসিফ সতের বছরেই হয়ে গেলো পাক্কা ব্যবসায়ী। আর নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমে নিজের গড়ে তোলা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বড় করে চলল সে। সংসারের পুরু দ্বায়ীত্ব নিজের কাদেঁ তুলে নিল। ছোট ভাইটা পড়াশোনা করেনি, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে দিনপাত করে সময় নষ্ট করেছে, ভাইয়ের উপার্জিত টাকা খরচ করেছে দুই হাতে। দুই ভাই দুই মেরুর মানুষ বটে কিন্তু একটা জায়গায় দুইজনের খুব মিল আছে। একমাত্র বোন দিনাকে নিয়েই যত স্বপ্ন তাদের। দুই ভাইয়ের জীবনের শুরুটা যেখানে দুঃখ কষ্ট দিয়ে সেখানে বোনের শুরুটা ঠিক তার উল্টো। বুঝার বয়স হওয়ার পর থেকে বোনের কোন আবদার ফেলেনি আসিফ, এমনও হয়েছে নিজের হাজারটা শখ বিসর্জন দিয়ে বোনের শখ পূরণ করেছে। আর দিনা? সাত ক্লাস পার হতে না হতেই হয়ে উঠল অতি আধুনিক এক মেয়ে। উচ্চবিত্ত বন্ধু বান্ধবীদের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেও তাদের মত হওয়ার চেষ্টা করে গিয়েছে দিনা, আর সেই নৈমিত্তে ভাইদের কাছে যা চেয়েছে তাই পেয়েছে।
গল্প আবার থেমে গিয়ে প্রশ্ন এলো, আজ পত্রিকা পড়েছ?
কেন?
এমন কোন খবর কি পেয়েছো যে, ক্লাস নাইন বা টেনে পড়া কোন মেয়ে কোর্ট ম্যারেজ করে বাড়ি থেকে পালিয়েছে?
সকাল বেলা খবরের কাগজ পড়েছি, এই ধরনের নিউজ খুব একটা হয় না, তবে এমন ঘটনার নিউজ হয় কিন্তু সেগুলো থাকে প্রাপ্ত বয়স্কদের ঘটনা। কিন্তু এটা সত্য যে, এই ধরনের অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মাঝে এই ধরণের ঘটনাগুলো ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, হয়ত পত্রিকার পাতায় ঘটনা আসে না কিন্তু ঘটনা ঠিকই ঘটছে। প্রতিদিন অসংখ্য খবর খবরের পাতায় আসে না কিন্তু ঘটনা কি ঘটছে না?
সময়টা এখন এমন একটা পর্যায়ে চলে গিয়েছে, যেখানে পতিতাবৃত্তিকে পতিতাবৃত্তি বলা হচ্ছে কিন্তু অবৈধ সম্পর্কগুলোকে বলা হচ্ছে স্বাধীনতা বা স্বাভাবিক ঘটনা। নিজেদের প্রয়োজন হয়েছে তাই প্রয়োজন মিটিয়েছে, সেটা বৈধ হোক বা অবৈধ আর এই সব ঘটনার দুয়েকটা আসছে পত্রিকার পাতায়, কিছু যাচ্ছে নিষিদ্ধ ভাচুয়াল জগতে বাকীগুলো আড়ালেই থাকছে, উভয়ের সম্মতিতে যখন হচ্ছে তখন অাড়াল থাকাটা স্বাভাবিক, কিন্তু সেটা যে খুব বেশি দিন থাকছে তা কিন্তু নয়, যার প্রভাব পড়ছে পরবর্তী জীবনে বিশেষ করে বিবাহিত জীবনে। প্রয়োজন মিটানোর তাগিদে যা করছে তাই পরে বিষাক্ত ছোবল হয়ে সংসার ভেঙ্গে দিচ্ছে বা একটা স্থায়ী চির অশান্তির সৃষ্টি করছে।
যার ঘরে একটা মেয়ে আছে সেই বাবা মা দুশ্চিন্তায় ভোগে না এটা বিশ্বাস করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে, আর সচেতন বাবা মা ছেলেদের নিয়েও দুশ্চিন্তায় ভোগে এখন।
পথিক বলল, এই দিনা মেয়েটা কিছুদিন আগে কোর্ট ম্যারেজ করেছে, আর দুইদিন আগে সেটা প্রকাশ হয়েছে। এই শুনে আসিফ বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ঘটনা তোমাকে সংক্ষিপ্ত করে দিলাম, তুমি সাজিয়ে নিও, যদিও এই ধরণের গল্প মানুষ বাস্তবে দেখেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে, এই গল্প কেউ পড়বে না বলেই মনে হয়।
লিখব না গল্প, সময়ের অভাব, বললাম আমি।
ভালো, আচ্ছা তুমি বলতে পারো এই দুনিয়াটা কোন দিকে যাচ্ছে? বিশ্বাসগুলো কেন অবিশ্বাসে রূপ নিচ্ছে? এত আবেগি মনের এই ছোট ছোট মনগুলো কি বাবা-মা ভাইবোনদের প্রতি আবেগি হয় না? শুধুই একটা অলিক স্বপ্নে এতটা আবেগি হয়ে যায় কি করে যে, এতগুলো মানুষের ভালোবাসাও একজন মানুষের আবেগের কাছে হার মেনে যায়?
এক নিঃশ্বাসে প্রশ্নগুলো করল পথিক। হয়ত দুয়েকটা প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারতাম কিন্তু সেই পথে আমি হাটলাম না, বরং উল্টো পথেই হাটা শুরু করলাম।
এঞ্জেল নামের একজন মেয়ে আছে একটা অফিসের এডমিন পোষ্টে চাকুরি করছে। সাভার থেকে মতিঝিল আসার রাস্তাটা কম নয়, আর ঢাকার মত শহরে এটা বাস্তবিক দূরত্বের চেয়ে তিনগুলো বেশি হয়ে যায়। ঠিক এতটা দূর থেকেই এসে সে প্রতিদিন অফিস করছে,তাও যথা সময়ে উপস্থিত হচ্ছে প্রতিদিন অফিসে। বাবা প্রাক্তন চ্যাটার্ড একাউনটেন্ট, কিন্তু বছর পাচেঁক আগে মারা যায়। মেয়েটা নিজের চেষ্টায় ও লেভেল পাশ করে এই অবস্থায় এসেছে, আর এখন সম্মানের সাথে কাজ করছে। কিছুটা ক্ষোভ তার মনেও আছে তার বাবা কে নিয়ে, মৃত্যুর আগে সে কেন কিছু রেখে যায়নি তার জন্য নয়, নিজের এই অবস্থার জন্যও নয়, বরং রাস্তার যানজট নিয়ে, রাস্তায় বখাটেদের উৎপাত দিয়ে। এত দূরে অফিস করে, সন্ধ্যে সাতটায় অফিস থেকে বের হয়ে সাভার যেতে যেতে কখনো কখনো রাত দশটা বেজে যায়, ভয় নিয়ে রাস্তায় চলে, বখাটেদের উৎপাত সহ্য করে আবার কখনো প্রতিবাদ করে।
কথা থামিয়ে দিয়ে পথিক বলল, এই গল্পটা তুমি আমায় কিছুদিন আগে বললে বলতাম ব্যতিক্রম উদাহরণ নয়,কিন্তু এখন বলব না। বর্তমান সময়ে দিনাও যেমন আছে তেমনি এঞ্জেল ও আছে।
পথিকের কথায় আমার মনযোগ ছিল না, আমি কয়েকদিন ধরেই এই এঞ্জেল এর সাথে কথা বলছি, বাকযন্ত্রে সমস্যার কারণে ঠিক মত কথা বলতে পারে না, কথা বলতে কষ্ট করতে হয় দেখলে মনে হয় যেন কথা বলার জন্য সংগ্রাম করছে সে, অথচ কত হাসিখুশি একটা মানুষ, আধুনিক স্মার্ট, পরিশ্রমী, আর কর্মদক্ষতায় পূর্ণ একটা মানুষ। এই মেয়েটা কি দিনার মত হতে পারত না? পারত কিন্তু সে হয়নি হয়ত তার আবেগ হার মেনেছে পরিবারের ভালোবাসার কাছে।
বাস এসে থামতেই নেমে পড়লাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে বললাম তুমি এখন দিনার কাছে যাবে?
না, উত্তর দিল পথিক।
আমি পথিককে যেতে দিতাম না, জানিনা কি করে পথিক সেটা বুঝতে পারল। পূর্বেও এমন ঘটনার মুখমুখি উভয়েই হয়েছি, তাই আর নতুন অভিজ্ঞতা নিতে চাইছি না।
দ্রুত পা চালিয়ে পথিক এগিয়ে চলল, আমাকে ইশারায় তাকে অনুসরণ করতে বলল। আমিও চললাম তার পিছু পিছু। কিছু দূর যাওয়ার পর একটা বদ্ধ করে গিয়ে প্রবেশ করল পথিক, দরজা থাক্কা দিয়ে খুলতেই ধোয়ার কুণ্ডলি বের হয়ে এলো, বুঝতে পারলাম ভিতরে কোন আসর চলছে। আমি আর প্রবেশ করলাম না, অপেক্ষা করতে লাগলাম। মিনিট খানেক পড়েই ঠাস ঠাস শব্দ ‍শুনতে পেলাম, বুঝলাম কেউ কাউকে মারছে, কিন্তু এই নব্য সন্ত্রাস যে পথিক তা বুঝতে সময় লাগল আরো একমিনিট। আসিফকে ঘর থেকে শার্টের কলার ধরে টেনে বের করে আনছে পথিক, এক দেখায় চিনতে পারলাম আসিফকে। বছরখানেক আগে একবার দেখা হয়েছিল ঢাকায়।
বোন ভুল করেছে বলে ‍তুই ভুল করবি কেন? তোর বোন যা করেছে তুই তো তার চেয়ে বেশি করছিস। পথিকের মুখের দিকে হা হয়ে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছিল আসিফ।
তোর বোন সবার ভালোবাসা উপেক্ষা করেছে, একজনের আবেগের কাছে ফেরে গেছে তার ভালোবাসা আর তুই কি করছিস? তুইও তো একজনের আবেগে অন্য মানুষগুলোকে কষ্ট দিচ্ছিস। তোর মা দুইদিন ধরে কিছু খায়নি, সারাদিন তোর জন্য কাদঁছে, তার মেয়ের জন্য নয়।
আমার দিকে ফিরে পথিক বলল, একটা রিক্সা ডেকে দাও। কিছুপথ এগিয়ে গিয়ে একটা রিক্সা নিয়ে যখন ফিরলাম দেখলাম আসিফ কাদঁছে। রিক্সা এসে দাড়াতেই ধাক্কা দিয়ে রিক্সায় তুলে দিল আসিফকে।
আপনি যাবেন না? বলল আসিফ।
না, তুই যা।
চল, বলেই হাটা ‍শুরু করল পথিক,আমিও তার পিছু নিলাম। রিক্সা চলে গেলো বিপরীত দিকে।
হাটতে হাটতে আমি বললাম, তুমি বলছিলে কোর্ট ম্যারেজ করেছে? কিন্তু বয়স প্রমাণ করল কি করে? কাজী অফিস হলে মেনে নেওয়া যেত কিন্তু কোর্ট মেনে নেওয়া কঠিন।
সেই রকম কিছু হয়নি, ওটা মুখের কথা, আসলে ঘটনা ভিন্ন। মেয়েটা গর্ভবতী, আর বাধ্য হয়েই ছেলেটা বিয়ে করেছে কাজী অফিসে, কিন্তু বলেছে কোর্ট ম্যারেজ। গ্রামের মানুষ যা বুঝে তাই বুঝিয়েছে অশিক্ষিত ভাই মা কে।
মিনিট দশেক হাটার পর একটা বাড়ির সামনে হাজির হয়ে দরজায় কড়া নাড়ল পথিক। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় একরাশ বিরক্তি মুখে নিয়ে দরজা খুলে দিল একজন মাঝ বয়সি লোক।
কে আপনি কি চাই?
আপনার ছোট ছেলে মাসুদকে একটু ডেকে দিবেন? বলল পথিক।
এত রাতে তাকে কেন?
আপনার সামনেই দুটো কথা বলে চলে যাবো।
লোকটা ঘরে ঢুকে মিনিট পাচেঁক পরে ফিরে এলো, পিছনে পিছনে এলো মাসুদ। দেখে মনে হল,বয়স খুব বেশি হলে বিশ হবে। আমাদের দেখেই বলল, কে আপনারা ? কি চান?
যা ঘটল তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না, লোকটার পিছন থেকে ছেলেটাকে টেনে এনে এলোপাথাড়ি চড় থাপ্পড় মারতে থাকল পথিক, এমন ঘটনার জন্য লোকটাও প্রস্তুত ছিল না, নিজের চোখের সামনে নিজের ছেলেকে কেউ এভাবে মারছে এটা দেখেও কিছু বুঝে উঠতে না পারায় কিছু বলতেও পারছে না কিছু করতেও পারছে না। যতক্ষনে আমাদের এই হতম্ভবতা কেটেছে ততক্ষণে ছেলেটার মুখ মেরে লাল করে দিয়েছে পথিক। আমি নিজেই পিছন থেকে পথিকে জড়িয়ে ধরে বললাম কি করছ পথিক, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেলো নাকি?
দেখলাম বাপ বেটা এবার দুইজন তেড়ে আসছে আমাদের দিকে, পথিক বলে উঠল মারার আগে কথাটা শুনে নিন, তারপর যা খুশি করুন।
লোকটা মারে মারে করেও থেমে গেলো, রাগানিত্ব স্বরে বলল কি ?
পথিক সব কিছু খুলে বলল। তারপর বলল, এবার আপনি ঠিক করবেন আপনি কি করবেন, আমাদের মারবেন নাকি নিজে ছেলেকে। তবে একটা কথা আমি বলে যাচ্ছি, যে অন্যায় সে করেছে তার শাস্তি তাকে সারাজীবন ভোগতে হবে, যদি আপনি সাথে থাকেন তবে আপনাকে ভোগতে হবে। দিনার সামান্য একটু অসম্মান যদি হয়েছে এই বাড়িতে তাহলে যেমন করে কোর্ট ম্যারেজ করেছে ঠিক সেই ভাবেই কোর্টে দাড়াঁতে হবে। চলি……..
চলে এলাম আমরা, পিছনে অকথ্য ভাষায় নিজের সন্তানকে গালির সাথে মার দেওয়ার আওয়াজ শুনলাম কিছুক্ষণ।
নিঘুর্ম একটা রাত কাটিয়ে সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরে লিখতে বসেছিলাম, পাশেই একটা বই নিয়ে মুখ গুজে পড়েছিল পথিক। লেখার সমাপ্তি করলে কি করে? বলল পথিক।
কোন সমাপ্তি নেই, এটা অশান্তির একটা শুরু, তোমার কি মনে হয় দিনাকে এরা সুখে রাখবে?
মোটেও না, আমি তো শুধু ভয় দেখিয়েছি যেন কয়েকটা দিন অন্তত ভালো কাটে, কিন্তু অশান্তির যে বীজ তারা বুনেছে তার ফল ত ভোগ করতেই হবে। শুনেছি আজ সকালে দিনাকে ঘরে তুলেছে, আরো একটা মেয়ের জীবনে কালো অধ্যায় রচনার সূচনা রচিত হয়েছে। বাদ দাও, সিগারেট দাও।
মাঝে মাঝে বড় অদ্ভুত লাগে জীবন।

——
ভুল ক্রটি ক্ষমার চোখে দেখবেন। ধন্যবাদ

  ৮টি মন্তব্য, “অশান্তির শুরু (পথিকের গল্প)”

    
  1. সাভার কিছু এলাকা তো সন্ধ্যা সাতটা বাজলেই ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যায়।
    আসলে জীবনে সুখটা কিসে! একটা মেয়ে ভুল করলে পুরো পরিবারই কিন্তুু এর মাশুল গুনতে থাকে। আমার এক বান্ধবী ছিলো। ওর দুইভাই আর ও একাই বোন। ওর নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিলো বেকার ছেলেকে। আজও আমার সেই বান্ধবীটা ভালো নেই। ওর এই শোকে বড় ভাইটা ও বাপটা খুব তাড়াতাড়িই মারা গেলো। খুবই আদর করতো ভাইজান ওকে। আমাকে বিয়ের পরে একদিন দেখে হাউমাউ করে কেঁদে দিলো। মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করলো। আমরা ছোটোবেলা থেকেই একসংগে বড় হয়েছি।
    সত্যিই জীবন বড় অদ্ভুদ লাগে।
    অনেকদিন পর ভাইটুর লেখা পড়লাম। বরাবরের মতোই সাবলিল।

      
    • এই ধরণের আচরণ করা মানুষগুলোর মাঝে আমি যৌক্তিক বা আবেগীয় কোন ব্যাখাই খুজেঁ পাই না। চারিপাশে অহরহ এই ধরণের ঘটনা ঘটছে, অসংখ্য উদাহরণ আছে এই ধরণের ঘটনার, ঘটনার আগে যদি বলা হয় তুমি কি শিখলে এর থেকে তাহলে হাজারটা শিক্ষণীয় দিক দেখাবে কিন্তু নিজের বেলায় গিয়ে ঠিকই সেই একই ভুল করে বসছে।

      সরি আপু, আমি এখন আর সময় দিতে পারি না, তাই লেখাও হয় না আর পড়ারও সুযোগ পাই না। সকাল বিকাল দৌড়াতে হয়। তবে সুযোগ পেলে পড়ার চেষ্টা করি। দোয়া করিও যেন এই অবস্থা থেকে তারাতারি উত্তীর্ণ হতে পারি।

  2. 
  3. বেশি আহ্লাদ দেয়াই উচিৎ না, তা ছেলে হোক বা মেয়ে হোক। এরা আহ্লাদ পেয়ে ভাবে এটিই তার অধিকার, নিয়ম। যেকারনে উচ্ছনে যেতে মোটেই সময় নেয় না এরা। দিনাও তেমন একজন।শ্রেনী অতিক্রম করে সে উচ্চ শ্রেনীর সাথে মিশে গিয়েছে, যার পরিনাম একে ভোগ করতেই হবে।

    ভাল হয়েছে গল্প।

  4. 
  5. আসিফের বয়স এক জায়গায় নয় আরেক জায়গায় দশ হয়েছে, ঠিক করে দিও।
    প্রেমের জন্য সম্পর্ক আর পতিতাবৃত্তি কে এক করে দেখা মানতে পারলাম না। দৃষ্টিকটু লেগেছে।
    চাইলেই সবকিছু দিয়ে দেয়া আর টেক কেয়ার করা এক কথা নয়। আমরা সম্পদ তো দিচ্ছি কিন্তু সময় দিচ্ছি না।
    আবেগের কাছে পরিবারের সবার ভালোবাসা হেরে গেলে মেয়েটির শিক্ষাতে সমস্যা। আর এটাই সবচাইতে বড় সমস্যা এখনকার।
    গল্পের শুরুটা বেশি ভালো হয়েছে আনিছ ভাইয়া।

      
    • ধন্যবাদ আপু। ব্যস্ততার ধরুন দেরিতে উত্তর দিতে হচ্ছে, আশা করি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে।
      প্রেমের সম্পর্ক আর পতিতাবৃত্তিকে এক করে দেখার কোন কারণ নেই, তবে প্রেম যদি পতিতাবৃত্তিতে চলে যায় তখন তাকে প্রেম বলা যায় না। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, আমার পূর্বপরিচিত একজন মেয়ে আমাকে বলছিল, জীবনে আটদশটা প্রেম করতে না পারলে জীবনটাই পানসে লাগে, জীবনকে কি উপভোগ করলাম তাহলে যদি এক ডজন প্রেম করতে না পারি।

      সব সমস্যার একটা মূল রয়েছে, হতাশা, সময়, দারিদ্রতা এগুলোও জড়িত এই সব ভুল পথে পরিচালিত হওয়া ছেলেমেদের ভুল সিদ্ধান্তগুলোতে।

  6. 
  7. পথিকের গল্প একটু অন্য রকম বাস্তব মুখীতো হবেই।দারুণ লাগল। -{@